স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী হলেও আমরা এখনও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত

১৯৭১ সালে ১০ এপ্রিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণে একটি সরকার গঠিত হয় যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। এই সরকার ১৯৭১ সালে ১৭ই এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন। এই দিনই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করা হয়়।‌ বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের মূূল লক্ষ্য ছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এই দেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। এটাই ছিল স্বাধীনতা সংগ্ৰামের মূল ‌প্রতিশ্রুতি । তাই ১৯৭১ সালে কৃষক,শ্রমিক,ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সকল শ্রেণী ও পেশাজীবীর মানুষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ও ৩০ লাখ শহীদের এবং ২ লাখ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে। এই দেশের জনগণ ভেবেছিল হয়তোবা এই সংগ্ৰামের মধ্য দিয়েই ফিরে পাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং গড়ে তোলবে বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত একটি স্বাধীন ভূখণ্ড। তাই ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণি ও পেশাজীবীর মানুষ মুক্তিযুদ্ধে চাপিয়ে পড়েছিল। তারাও ব্যর্থ হয়নি চিনিয়ে এনেছিল একটি লাল সবুজের পতাকা।এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে এতো ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে অর্জিত হলো আমাদের স্বাধীনতা,এর ফল কি এখনও সাধারণ মানুষ ভোগ করছে? ত চলুন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা বিশ্লেষণ করা যাক। আমাদের দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। মূলত দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই তিন দলই নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই তিন দলের শাসনামলে তারা কি ৩০ লক্ষ শহীদের মর্যাদা দিতে পেরেছে? তারা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরে ঐ দলগুলোর রাজনৈতিক কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করলে তেমন কিছু দৃশ্যমান হয় না। তবে এটা সত্য তারা অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক অধিকার জনগণকে কতটুকু দিয়েছেন এই প্রশ্নটি থেকেই যায়! এখনও রয়েছে প্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে অনেক অপ্রাপ্তি।

একটি বিষয় লক্ষণীয় স্বাধীনতা পরে যখনই যে দল ক্ষমতা গিয়েছে তারাই পাকিস্তান আমলের তৎকালীন সামরিক শাসকদের মতো স্বৈরাচারী মনোভাব পোষণ করেছে যা আমাদের দেশের সংবিধান এবং স্বাধীনতা চেতনার সম্পূর্ণ বিরোধী। এমনও অভিযোগ রয়েছে তারা সংবিধানকে শুধু নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্যই বিভিন্ন সময়ে সংবিধানের সংশোধনী এনেছে।

এমনকি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের দ্বারা বিভিন্ন ধরণের অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতিমুলক কাজ করা হয়। সদ্য স্বাধীন দেশটিতেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শাসনামলে বঙ্গবন্ধু ও কিছু ত্যাগী নেতাকর্মী ব্যতিত অনেকেই দুুর্নীতি , স্বজনপ্রীতি ও লুটপাটে নিমজ্জিত ছিল। একটু বিষয় লক্ষ্য করুন যেখানে যুদ্ধে ভঙ্গুর একটি দেশ,যেখানে দেশের মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্টা করার জন্য ভাবার কথা,যেখানে ভঙ্গুর রাষ্ট্রের মানুষকে মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ, ঠিক সেই মুহূর্তে স্বাধীনতার পরপরই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অনেক লোভী নেতাকর্মী এদেশে, দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতির রাজনীতি শুরু করেছিল। বঙ্গবন্ধু শত চেষ্টা করেও তাদের দমাতে পারে নাই। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পৃষ্টপোষকতায় বঙ্গবন্ধু হত্যা করার মতো অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগটি স্পষ্ট বার্তা দেয় সদ্য স্বাধীন হওয়ার পর এই দেশের রাজনীতিবিদরা নোংরা রাজনীতির খেলায় মেতে উঠেছিল।

আচ্ছা, ভাবতে পারেন কতটুকু লোভী হলে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর, সদ্য স্বাধীন দেশে এই রকম বিবেকহীন কর্মকাণ্ড করতে পারে! অবাক হলেও এটাই সত্য ছিল। যেখানে সরকার সদ্য স্বাধীন দেশে মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোতেই হিমশিম খাচ্ছে, যুদ্ধের কারণে শিল্প ও কৃষিতে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজমান করছে, গরীব মানুষের পেটে ভাত পড়ছে না, বলতে গেলে বিশাল আকারের এক অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে কতটুকু পাষন্ড ও লোভী হলে হলে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা দুর্নীতি , লুটপাট ও স্বজনপ্রীতিতে জড়িয়ে পড়তে পারে? স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ইতিহাস পড়ে যে কেউ দুুুু:খ ও কষ্টের অনূভুতির জায়গা থেকে বল্লে বলতেও পারে, তাহলে কি আমাদের দেশের রাজনৈতিক কর্মীরা প্রিয়জন্মভূমিতে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, লুটপাট, রাহাজানী,দূর্ষণ ও স্বজনপ্রীতির করার জন্য দেশটি স্বাধীন করেছিল?

বঙ্গবন্ধু বিশেষ আইন জারির মাধ্যমে দেশকে একটা স্থিতিশীল পরিবেশ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এই আইনেও আওয়ামী লীগ কিছু নেতাকর্মীরা অন্য মতাদর্শের ব্যক্তিদের হয়রানির চেষ্টা করেছে এবং এমন কি এই আইনকে অপব্যবহার করেছে তখনকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আর এদিকে সকল দোষ পড়েছে বঙ্গবন্ধুর উপরে।

বঙ্গবন্ধু ভাবলেন সদ্য স্বাধীন দেশে যেহেতু সেনাবাহিনী সুসংগঠিত হয় নাই, তাই বঙ্গবন্ধু রক্ষী বাহিনী গঠন করেন।এই বাহিনীও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কারণে সরকার দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। এদিকে রক্ষীবাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর কথাগুলো পরোয়া না করে করে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়ারও অভিযোগ রয়েছে।যে কারও এমনও মনে হতে পারে যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরেই আওয়ামী লীগ লোভী নেতাকর্মীরা ভুলেই গিয়েছিল তারা স্বাধীন দেশের নেতৃত্বের আসনে ছিল! এমনটিই ইতিহাস থেকে জানা যায়।
আচ্ছা,বলুন ত সাধারণ মানুষ এই জন্যই কি তাদের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হোক মেনে নিয়েছিল? এই জন্যই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল? উত্তরটি হবে অবশ্যই না। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ভাষণে দেশপ্রেম ব্যতিত কোন অসভ্য কার্যক্রমের ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে? উত্তর অবশ্যই নাবোধক হবে। তবে কেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে জনগণের কাছে প্রদানকৃত প্রতিশ্রুতি ভাঙ্গতে শুরু করে?

আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চারটি বছর যেতে না যেতেই ১৯৯৫ সালে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল সদস্য সামরিক অভ্যুত্থান সংগঠিত করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডির ৩২ এর বাসভবনে সপরিবারে হত্যা করে। পরে ১৫ আগস্ট ১৯৯৫ থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৯৫ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক আহমদ অঘোষিতভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার আমলেই জাতীয় চার নেতাকে কারাগারে হত্যা করা হয়।মোশতাক আহমেদ ১৯৯৫ সালের ৫ নভেম্বর সেনাবিদ্রোহের দ্বারা অপসারিত হন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছনে বিশ্লেষকরা দুইটি কারণ উপস্থাপন করেন। এক হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এবং অতিরিক্ত ভারত নীতি অবলম্বন করার কারণে মোশতাক আহমদ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে মোশতাক আহমদ ক্ষমতা লিপ্সু হয়ে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা করে। আবার কেউ কেউ মনে করেন বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে ভারতের পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ রয়েছে। মাঝেমধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগ কিছু নেতাকর্মীরা মনে করেন মেজর জিয়াউর রহমানও পরোক্ষভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের খুনের সাথে জড়িত ছিল। মোস্তাক আহমদ আহমেদে আওয়ামী লীগের অন্যতম একজন নেতা ছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য শেখ মুজিবুর রহমান মোস্তাক আহমদকে ত্যাগী নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এমনকি বাকশালের অন্যতম নেতা ছিলেন। তাই স্বাভাবিকভাবে এখনো সাধারণ মানুষের মাঝে এই প্রশ্নটি ঘোরপাক খায়, তাহলে কেন তিনি (মোস্তাক আহমেদ ) পরিকল্পনা করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেন। আচ্ছা, বলেন ত এই রকম কর্মকান্ডর জন্যই কি দেশটা স্বাধীন করা হয়েছিল?

এখন মেজর জিয়াউর রহমানের কথা বলা যাক। আমরা জানি উনিও দেশের স্বাধীনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে তার পক্ষ থেকে সাহসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তার বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এদেশের আপামর জনতা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সুতরাং তার অবদান ভুলে যাবার নয়।এমনকি ভুলে যাওয়াও উচিত নয়। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তিনি দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার কতটুকু দিয়েছেন,এই প্রশ্নটি থেকেই যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের মানুষ প্রত্যাশা করেছিল তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে তার চৌকস কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু হায় হায়! তিনি করলেন! তিনিও ক্ষমতার জন্য পাগল হয়ে গেলেন। তিনিও অনেকটা মোস্তাক আহমদকে অনুসরণ করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েম হটিয়ে ক্ষমতা আসলেন। তিনি সামরিক আইন প্রশাসক হওয়ার পর গড়ে তোলেন তার রাজনৈতিক দল বিএনপি।পান স্বপ্নের লালায়িত ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি পদ।১৯৮১ সালের ৩০ মে আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন ওনার ক্ষমতা দখলের পদ্ধতি সম্পূর্ন অগণতান্ত্রিক। দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকারকে বিলুপ্ত করে একক আধিপত্য বিস্তার করে ক্ষমতায় এসেছিল। আচ্ছা, ভাবতে পারেন যারা দেশের জন্য সংগ্ৰাম করেছে,তারা কিভাবে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করতে পারে? খুব লজ্জার বিষয় তাই না! তবে এটাই সত্য ইতিহাস।

এখন জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের কথাই বলা যাক। জিয়াউর রহমান নিহতের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৭২ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থাকলেও নেপথ্যে ছিলেন সেনাপ্রধান হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ।তাই ২৪ মার্চ সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতায় দখল করেন এরশাদ। তিনি ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন।এইচএম এরশাদ সেনাপ্রধানের পদ ছেড়ে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি এরশাদ জাতীয় পার্টি গঠন করেন।ওই বছর নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন।তিনি গণআন্দোলনে মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পতনের আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি পদে বহাল ছিলেন। তিনি অগণতান্ত্রিকভাবে ৯ বছর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। সকল রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একমত যে হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেন এবং সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনা করেন। তাহলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছে ৩০ লক্ষ শহীদের মর্যাদা কোথায় রইলো? ওনি কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পর্কে অবগত ছিলেন না?এহেন রাজনৈতিক কর্ম কি স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতির বিরোধী নয়?

ত বুঝতেই পারছেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতাকর্মীরা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে কতটুকু রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতে দিয়েছি। এক বাক্যে বললে বলা যায় ওরাও তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের মতো এই দেশের তিন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দল তখনকার সময়ের পাকিস্তানের প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের মতোই সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছে। আরও কঠিনভাবে বলতে গেলে বলা যায় তারা ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের সাথে প্রতারণা করেছে। তারা সম্পূর্ণভাবে স্বাধীনতা চেতনা বিরোধী কাজ করেছে।

একটু শর্ট করে বলে যাচ্ছি এই যে আজকে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে ফেনাযুক্ত করে তারাও ১৯৯৬ সালে অবৈধভাবে ক্ষমতায় থাকার পাঁয়তারা করেছিল! কিন্তু সকল রাজনৈতিক দলের একতাবদ্ধ আন্দোলনে তাড়া ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়।‌ অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারের রহমান বিরুদ্ধেও রয়়েছে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে বড় বড় অভিযোগগুলো হচ্ছে দশ ট্রাক অবৈধ অস্ত্র ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী উলফার কাছে পাচার , বসুুন্ধরা গ্ৰূপের‌ ‌প্রকোশলীর সাব্বির হত্যার পরোক্ষভাবে মদদদাতা, বিদ্যুৎ সেক্টর থেকে বিশ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, সিঙ্গাপুর ও সৌদি আরবে কোটি কোটি টাকা পাচার ইত্যাদি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলে থাকেন বিএনপি আমলে বিশেষকরে ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত তারেক রহমান বিএনপি দলে ও সরকারের কার্যক্রমে এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করেন। এমনটি বলে হয়ে থাকে যে হাওয়া ভবন থেকেই সংসদ ভবন পরিচালিত হতো।

বিএনপি সম্পর্কে ত জানলেন। আবার আরেকবার কয়েক লাইনে দশম জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা যাক। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।এ নির্বাচনে নবম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ প্রায় সকল দল আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। এই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা বিজয়ী হয়। এই নির্বাচনের ফলাফল ও নির্বাচনের দিনে আওয়ামী লীগ কর্তৃক যেভাবে কারচুপি করেছে এটাকে ভোটডাকাতি ছাড়া কিছুই বলা যাবে না। ২০১৪ সালের নির্বাচনের দিকে তাকালে মনে হয়, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলে গেছে, সংবিধানে উল্লেখিত জনগণের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। এইভাবেই আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক জনগণের রাজনৈতিক ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়া মানে দেশের অর্ধেক মানুষ ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়া। আর ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে রাজনৈতিক অধিকার হারানো। রাজনৈতিক অধিকার হারোনোর অর্থ হচ্ছে জনগণ রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। আর কোন দল যখন রাজনৈতিক অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করে তার অর্থটা দাঁড়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী কাজে লিপ্ত হওয়া।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে দেশের জনগণ ১৫৩ আসনে প্রার্থী হলো না কেন? একটাই উত্তর তা হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি এই দেশের অর্ধেক জনগণ কোন আস্থা ছিল না। ১৫৩টি আসনে কোন প্রার্থী থাকলেও মেনে নেওয়া যেতো, সেটা যে দলের হোক কিংবা স্বতন্ত্র কোন প্রার্থী। কিন্তু যেখানে প্রার্থীই নেই,সেই নির্বাচনকে গ্ৰহণযোগ্য নির্বাচন বলা কোন বিবেকবান মানুষের হতে পারে না।এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক মুক্তির চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। অথচ এই দলই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নেতৃত্বের আসনে ছিল! কি অবাক কান্ড তাই না! তবে এটাই তো সত্য।

এখন আসা যাক ২০১৮ সালের নির্বাচনের কথা আমি হলফ করে বলতে পারবো। এটা কোন নির্বাচন ছিল না। এটা এক প্রকার দিনে দুপুরে ভোট ডাকাতি ছিল বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক। আমি নিজের চোখে দেখেছি কিভাবে তারা‌ সাধারণ মানুষের কাছ মহাজোটে থাকা বর্তমান সরকার সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। এই ২০১৮ সালের নির্বাচনে আমার কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া ছিল।আর এই অভিযোগ শুধু তাড়াইল উপজেলার একার নয়।এই অভিযোগ সারা বাংলাদেশের জনগণের। এটাই বুঝি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা?

মোটকথা বর্তমানের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোন দলই এই দোষ থেকে মুক্ত নয়।বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা মনে হয় ভুলে গেছে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্ৰামে কথা! তারা মনে হয় ভুলে গেছে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি কথা! তারা মনে হয় ভুলে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা কথা!

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত লুটপাট, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ধর্ষণ ও মদ এবং জুয়ার আসর,কোন কিছুই থেকেই আমরা এখনও মুক্তি পাই নাই। কোটি কোটি টাকা রাজনৈতিক দলের নেতারা দেশের বাইরে পাচার করছে। আগে এই কাজটি করত মুসলিম লীগের কতিপয় নেতারা।এখন করছে সোনার বাংলার রাজনৈতিক নেতারা!পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে ত বঞ্চিত করা হচ্ছেই! এটার জন্যই বুঝি আমাদের ভাই ও বোনেরা তাদের শরীরের তাজা রক্ত দেশের জন্য বিলিয়ে দিয়েছিল? আসল কথা হচ্ছে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী হলেও বাংলাদেশের জনগণ এখনও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত! শুধু ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ও ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসে স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেই দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায় না।বরং নিজে সৎ পথে অবস্থান করে সকল প্রকার দুর্নীতি, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মাধ্যমে দেশপ্রেম একজন দেশের নাগরিকর মধ্যে ফুটে ওঠে। ত চলুন যার যার অবস্থান থেকে দেশপ্রেমে গর্জে উঠি।

শেখ সাখাওয়াত হোসেন
সহ প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক
বাংলাদেশে ছাত্র অধিকার, কিশোরগঞ্জ জেলা