
আর্থিক সকটের কারণে , মানসিক ভারসাম্যহীন দুই ছেলে-মেয়ে সহ খেয়ে না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় দিন অতিবাহিত করছেন হাতিয়ার বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সলিম উল্যাহ্। বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রামে ট্রেনিং করেছিলেন ইন্ডিয়ান আসাম রাজ্যের হাফলং গেরিলা ক্যাম্পে। বয়স ছিল তখন ২২-২৩ বছর, তৎকালীন সময়ে পারিবারিক অবস্থাও ছিল বেশ ভালো। প্রয়াত বাবা আফলাতুন হোসেন কলকাতা থেকে ল’ পাস করে এ প্রান্তে তখন ওকালতি পেশায় যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী ৩০ বছর ভালভাবে কাটছিল মুক্তিযোদ্ধা সলিম উল্লাহ’র জীবন-সংসার। তবে দুঃখ-দুর্দশা শুরু হয় ২০০১ সালে জীবন সঙ্গিনী শাহেদা খাতুনের মৃত্যুর পর থেকে। স্ত্রী মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে স্ট্রোক করে প্যারালাইজড আক্রান্ত হয়ে যান তিনি। তার চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে নসরত উল্যাহ তসলিম (৫০) জন্মগতভাবে মানসিক প্রতিবন্ধী, ছোট মেয়ে ফাতেমা ইসরাত ২০০৯ সালে এসএসসি’র টেস্ট পরীক্ষার পরই হঠাৎ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।জীবন-মরণযুদ্ধে ২২টি বছর দুঃখ-কষ্ট, অসুখে-বিসুখে বিছানায় শুয়ে-বসে কাটছে এ বীর মুক্তিযোদ্ধার। শুধু অর্থের অভাবেই যথা সময়ে চিকিৎসা নিতে পারেননি রোগে ভোগা এ হতভাগা পরিবারটি।
সলিম উল্লাহর বাড়ি নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার চানন্দি ইউনিয়নের মাইশ্চরা গ্রামে, পরে নলচিরা ইউনিয়নের ভূইয়া গ্রামে বসবাস শুরু করেন তারা। নিজের ধন সম্পত্তি নদী ভাঙ্গনে বিলীন হওয়ায় বর্তমানে সোনাদিয়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড পূর্ব সোনাদিয়া গ্রামে মৃত স্ত্রীর পৈত্রিক সম্পত্তিতে সন্তান-সন্ততি নিয়ে বসবাস করছেন এ মুক্তিযোদ্ধা।
বৃহস্পতিবার দুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে স্থানীয়দের থেকে জানা যায়- সলিম উল্যাহ্ তার বড় মেয়ে শাহেনা আক্তারকে পাশের এলাকার ওমর ফারুক থেকে(ঘরজামাই হিসেবে) বিয়ে দিয়ে তাদের ওপর সংসারের দেখা শোনার দায়িত্ব দেন। তার মেঝো ছেলে জাফর উল্যাহ্ হাতিয়ার বাইরে কাজকাম করেন, পরিবারের খরচপাতি সেও কিছুটা বহন করেন। মুক্তিযোদ্ধার সরকারি যে ২০ হাজার টাকা ভাতা পান- তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্ট হয়, অসুস্থদের ঔষধ চালানো তো দুঃসাধ্য। সরকারি বীর নিবাস নামে যে ঘর পেয়েছেন, তার কাজ এখনো সমাপ্ত হয়নি তাই পাশের ভাঙ্গা ঝুপড়ি ঘরে থাকেন সবাই।
এর পূর্বে অবশ্য সরকার থেকে যেটুকু জমি পেয়েছিলেন তা বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ চালিয়েছেন বলে জানান মুক্তিযোদ্ধা সলিম উল্যাহ্ । তিনি জানান হাতিয়ার সাহসী সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা কচি মিয়ার হাত ধরে আমরা ইন্ডিয়ায় ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। কাঁদু কাঁদু হয়ে তিনি বলেন এখন নিজেই অক্ষম, সাথে এক ছেলে এক মেয়েও প্রতিবন্ধী। এ অবস্থায় সরকার যদি কিছু চিকিৎসা সহায়তা দিতো তবে উপকার হতো। তার সরকারি গ্যাজেট নম্বার ০২০৯০৬০০৭৪ এবং মুক্তিযুদ্ধা পরিচিতি নম্বর ০১৭৫০০০৫৯৩২।
স্থানীয়রা জানান, মুক্তিযোদ্ধা সলিম উল্যাহ’র ছোট মেয়ে ফাতেমা ইসরাত মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ার পর থেকে ঘরের মধ্যে শিকল বেঁধে রাখে । এ পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করতে চাইলে প্রতিবেদককে দেখাতে অস্বীকৃতি জানান সলিম উল্যাহ্’র বড় মেয়ে শাহেনা আক্তার। শাহেনার স্বামী ওমর ফারুক জানান, তাকে ছেড়ে দিলে হারিয়ে যায়,চোখে চোখে রাখতে হয় তাই রুমের মধ্যে আঁটকে রাখছি। তিনি আরো জানান, আমার শ্বশুর ভাতা ছাড়া সরকারি আর কোনো সুবিধা পায়না। মাত্র ২ মাস আগে আমার বড় শালার প্রতিবন্ধি কার্ড করেছি। কিন্তু শালির প্রতিবন্ধী কার্ড এখনো করা যায়নি। সরকারিভাবে যদি এদের ৩ জনের জন্য অন্তত চিকিৎসা সুবিধা পেতাম তবে আমাদের জন্য সাপোর্ট হতো।
স্থানীয় হাসান,সোহরাব, তাজুল ইসলাম সহ অনেকে জানান দুস্থ, প্রতিবন্ধী এবং অসহায়দের জন্য সরকার বহুরকমের সুবিধা দেয়। মুক্তিযোদ্ধা সলিম উল্যাহ্’র অসহায় পরিবারের জন্য আমরা সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।
এদিকে স্থানীয় মেম্বার আলতাফ হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, মুক্তিযোদ্ধার মেয়েটি যে অসুস্থ তা আমার জানা নাই, আমি আপনার থেকেই বিস্তারিত জেনেছি। তো ঠিক আছে, আমি এদের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ খবর রাখবো।
বর্তমানে হাতিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল না থাকায় এর দায়িত্বভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে। ফলতঃ ইউএনও সুরাইয়া আক্তার লাকী জানান, সমাজসেবা দপ্তরের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা সলিম উল্যাহ্’র অসহায় পরিবারের জন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো