
রাজধানীর উত্তরখানে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির অভিযোগে মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন নামের এক শিক্ষকের পদত্যাগের পর ফের যোগদানের কারণে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল অবস্থায় পরিণত হয়েছে বিদ্যালয়।
উত্তরখানের আটিপাড়ার রাজাবাড়ির বেলায়েত হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় ও আশপাশের সড়কে রবিবার (২৪ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল পর্যন্ত বিকেল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির প্রাঙ্গণে ও আশেপাশের সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে সন্ধ্যায় থানা পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতা কর্মীদের সমঝোতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন প্রত্যাহার করে।
বিক্ষোভ মিছিলে শিক্ষার্থীরা শ্লোগানে শ্লোগানে বলেন, ‘বৈষম্যহীন বাংলায় দুশ্চরিত্রের ঠাই নাই,’ ‘আপষ না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘বিচার চাই বিচার চাই, ধর্ষক শাহাবুদ্দিনের বিচার চাই’, ‘এক দুই তিন চার, এই মূহুর্তে বাংলা ছাড়’সহ নানান শ্লোগান দেন।’
এছাড়াও শিক্ষার্থীরা তাদের হাতে ‘ধর্ষক শাহাবুদ্দিন কাকে কাকে ঘুষ দিলি, বলে যা বলে যা’, ‘শাহাবুদ্দিনের পুনঃরায় স্কুলে প্রবেশ কারীদের বিচার চাই বিচার চাই’, ‘আমার সাথে পাশের রুমে আসো, পরিক্ষায় ভালো রেজাল্ট হবে’, ‘স্কুলের কম্পিউটারে পর্ণগ্রাফি ভিডিও কেন, জানতে চাই জানতে চাই’, ‘যৌন হয়রানিকারী শাহাবুদ্দিনের বিচার চাই’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’সহ নানান প্লাকার্ড ছিল।’
বিক্ষোভ মিছিলে প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ শতাধিক বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউর রহমান’সহ পুলিশের একাধিক টিম উপস্থিত ছিলেন।
অভিযুক্ত শাহাবুদ্দিন বিদ্যালয়টিতে সিনিয়র শিক্ষক হিসাবে কর্মরত রয়েছেন। যদিও আন্দোলনের সময় তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। পদত্যাগের পরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগাদানের স্বাক্ষর রয়েছে হাজিরা খাতায়।
এসময় আন্দোলন শিক্ষার্থীরা উচ্চ বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষিকা সুরাইয়া বেগম, সহকারী প্রধান শিক্ষিকা লুবনা ও অভিযুক্ত শিক্ষক শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ এবং পদত্যাগের পর যাদের মাধ্যমে শাহাবুদ্দিন যোগদান করেছে, তাদের বিচারের দাবি জানান। তারা বলেন, ধর্ষক শাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু স্থানীয় বিএনপির মাসুম শিকদার, মারুফ খান, সাইফুলদের সহযোগীতায় শাহাবুদ্দিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফের যোগদান করে।’ তারা বলেন, ‘এ বিষয়ে থেকে সরিয়ে যাওয়ার জন্য শাহাবুদ্দিন স্যার আমাদেরকে পাঁচ লাখ টাকা অফার করেছিল। কিন্তু ম্যানেজ করতে না পেরে বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে ম্যানেজ করে এসেছে।’
অধ্যায়নরত ভুক্তভোগী একাধিক ছাত্রী বলেন, ‘শাহাবুদ্দিন স্যার আমাদেরকে বাজে প্রস্তাব দেন। ক্লাসের ভেতর তিনি আমাদেরকে নোংরা ভিডিও দেখেন। খারাপ খারাপ গান শোনান। আমাদেরকে দিয়ে তার হাত পা টিপান। সেই সাথে আমাদের শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দেন।’
তারা অভিযোগ করে আরো বলেন, ‘তার কাছে প্রাইভেট না পড়লে ক্লাসরুমে অযথাই মারধর করেন। আবার শাহাবুদ্দিন স্যারের বাসায় পড়তে গেলে বুকে হাত দেয়, আবার বেঞ্চের নিচ দিয়ে কোমড়ের নিচে হাত দেয়। তাছাড়াও স্কুলের মেয়েদের টয়লেটে গিয়েও ছাত্রীদেরকে হয়রানি করেন।’
প্রতিষ্ঠানটি সাবেক দুই ছাত্রী বলেন, ‘শাহাবুদ্দিন স্যার তার সঙ্গে শারিরীক সম্পর্কের প্রস্তাব দিতেন। তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করলে তিনি বেশি বেশি মার্ক দিবেন বলে জানাতেন। এছাড়াও সময় সুযোগ পেলে আপত্তিকরভাবে শরীরে হাত দিতেন।’
প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এক ছাত্র বলেন, ‘২০১৪ সালে নবম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত হোন। পরে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় গিয়ে শিক্ষক শাহাবুদ্দিন ও ওই ছাত্রী আপত্তিকর অবস্থায় ধরাও পড়েছিল। তারপর ছাত্রীটি এলাকা ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন।’ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আরো বলেন, ‘করোনার লকডাউনের সময় রাতে সাড়ে ১২টার দিকে দুই মেয়েসহ কম্পিউটার ল্যাবে অবস্থান করছিলেন। পরে তাদেরকে এলাকার লোকজন হাতেনাতে ধরেছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সভাপতি জামাল উদ্দিনের আহমেদের ভাগনি জামাই হওয়ায় কেউ কোন কিছুই করতে পারেনি।’
বিদ্যালয়টির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সহকারী শিক্ষক বলেন, ‘গত ৩০ বছর ধরে এ্যাডভোকেট জামাল উদ্দিন আহমেদ নিজের স্কুল মনে করে যেমন খুশি তেমনভাবে চালাতো। প্রতিষ্ঠানটির আয়ের টাকা সে একাই ভোগ করতেন, কাউকে দিতেন না। যদিও প্রতিষ্ঠানটি এমপিও ভুক্ত ছিল। কারণ তিনি ছিলেন আওয়ামীলীগের একজন প্রভাবশালী নেতা।’ তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কোন বেতন বোনাস পেতাম না। শুধু মাত্র সরকারী বেতনটাই পেতাম। সেটাও জামাল সাহেব একাই খেয়ে ফেলতেন। পুরো প্রতিষ্ঠানটি জামাল তার বউ, শালিকা, ভাগনি, ভাগনি জামাই ও ভাজতি জামাই দিয়ে পরিচালনা করতো। বর্তমান প্রধান শিক্ষিকাও জামাল সাহেবের ভাগিনা।’
আন্দোলনের সম্বয়কের ভূমিকার দায়িত্বে থাকা ছাত্র মো. হাফিজ্জুজামান আলিফ বলেন, ‘পুর্ণ বিন্যাস কমিটি গঠন, সাময়িকভাবে অভিযুক্ত শিক্ষক শাহাবুদ্দিন, সহকারী প্রধান শিক্ষক লুবনা ও প্রধান শিক্ষিকা সুরাইয়া বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সায়মিকভাবে তাদেরকে বহিষ্কারের আশ্বাস দিলে আমরা আন্দোলন স্থগিত করি।’ তিনি বলেন, ‘যদি তারা কথা না রাখে তাহলে পরবর্তীতে আরো কঠোর কর্মসূচি দিব। প্রয়োজন হলে আব্দুল্লাহপুর – কালিগঞ্জ সংযোগ সড়ক অবরোধ করা হবে।’
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র শিক্ষক মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টাও করেও পাওয়া যায় নি। প্রতিষ্ঠানেও তাকে পাওয়া যায় নি।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে বেলায়েত হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুরাইয়া বেগম বলেন, ‘দীর্ঘদিন সাবেক গভর্নিং বডির সভাপতি ইচ্ছেমত করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন। শাহাবুদ্দিন ছাত্রীদের সঙ্গে অসৌজন্য মূলক ব্যবহার কারণে শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু মারুফ খান, মাসুম, সাইফুল নামের স্থানীয় বিএনপির লোকজনের মাধ্যমে শিক্ষক শাহাবুদ্দিন প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন।’
হাজিরা বহিতে স্বাক্ষরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শাহাবুদ্দিন কিভাবে স্বাক্ষর দিয়েছেন, সেটা আমার জানা নেই। আমার সামনে স্বাক্ষর করে নি।’ছাত্রদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সকল দাবি আমরা মেনে নিয়েছি। সেই সাথে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ডিআই/এসকে