ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
সর্বশেষ
পরকীয়া জেরে যুবকের আত্মহত্যা
আমতলীতে তরমুজ পরিবহনে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষ, আহত- ৬
আমতলীতে বাস ও মোটর সাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত দুই
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট নোয়াখালীর আহবায়ক রনি,সচিব দ্বীপ
নওগাঁতে আলোকিত পত্রিকা’র প্রতিষ্ঠাতা বার্ষিকী পালিত
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় লাঙ্গলবন্দ স্নানোৎসব:আনসার বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা
জেলে থাকা আ’লীগ নেতাকর্মীদের নামে ঈদ বোনাস পাঠালেন সাবেক এমপি তুহিন
কালীগঞ্জে এতিম মেয়ের বিয়েতে একতা যুব সমাজকল্যাণ সংস্থার অর্থ সহায়তা
অসুস্থ সন্তানকে বাচাঁতে স্বামীর অবহেলা:বিচারের আশায় আইনের দ্বারস্থ কলাপাড়ার’ রীনা’
৪০ বছর পরে গুণীজন সংবর্ধনা
নেত্রকোনায় শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদের জেলা কমিটির পরিচিতি ও কর্মপরিকল্পনা সভা
পটুয়াখালীতে কারারক্ষীর জানাজায় উপস্থিত হলেন অতিরিক্ত কারা মহা পরিদর্শক
পূর্ব মালঞ্চ মধ্যপাড়া স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কমিটি গঠন :সভাপতি হাসান, সম্পাদক লতিফ
সীমান্তে বাংলাদেশী ভেবে বিএসএফের গুলি ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু
নৌকার উপর গান বাজিয়ে অস্ত্র প্রদর্শন-নাচানাচি: সেনা অভিযানে ডেঞ্জার গ্যাংয়ের ১৬ সদস্য আটক

১২ নভেম্বরের প্রলয়: বাংলাদেশের উপকূলবাসীর জীবনসংগ্রাম ও উপকূল দিবসের দাবি

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর। এ দিনটি বাঙালির ইতিহাসে চিরস্মরণীয়, তবু স্মরণ করতে কাঁপে বুক। উপকূলজুড়ে সর্বগ্রাসী সেই ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল বিস্তীর্ণ এলাকা। সরকারি হিসেবে তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং অগণিত বসতবাড়ি, ফসলি জমি, অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত জীবন আজো উপকূলবাসীর কাছে দুঃস্বপ্ন। তারা আজও অনুভব করেন সেই ঝড়ের ক্ষত।

প্রলয়ের দিন ১২ নভেম্বর সন্ধ্যা থেকেই বঙ্গোপসাগরের বুকে জমে ওঠা ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছিল। মধ্যরাতের দিকে ঘূর্ণিঝড়ের গতি ও তীব্রতা বাড়তে থাকে। ঘণ্টায় প্রায় ২২৪ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে ঝড়টি, যা ১৩ নভেম্বর ভোর পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, নোয়াখালীসহ দেশের বিস্তীর্ণ উপকূল অঞ্চল সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়। তখনকার যোগাযোগের অসুবিধা এবং প্রস্তুতির অভাবে অধিকাংশ মানুষ জানতেই পারেননি তাদের ওপর কী বিপদ আসছে।
উপকূলবাসীর স্মৃতিচারণ প্রতিটি বিপর্যয়ের পেছনে থাকে মানুষের বেদনা আর অসংখ্য হারানোর গল্প। আজও যখন উপকূলের প্রবীণদের সাথে কথা বললে, তারা সেই দিনটির স্মৃতিচারণ করেন। কেউ হারিয়েছেন পরিবার, কেউ বাড়ি, কেউবা জীবনের সহায়-সম্বল। ভোলার এক প্রবীণ কৃষক বললেন, “আমার ছয় সদস্যের পরিবারে সেই রাতে আমরা মাত্র দুজন বেঁচে ফিরি।” ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই পরে উপকূল ছেড়ে অন্যত্র চলে যান, কিন্তু যারা থেকে গিয়েছিলেন, তারা এখনো প্রতি ঘূর্ণিঝড়ের সময় আতঙ্কে থাকেন।
বর্তমানের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব ১৯৭০ সালের পরেও বহুবার উপকূলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আঘাত হেনেছে। তবে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় উন্নত প্রযুক্তি, পূর্বাভাস এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থাকায় প্রাণহানি অনেক কমেছে। তবে ঘূর্ণিঝড় আম্পান, সিডর বা রোয়ানুর মতো ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতির হাত থেকে এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয় উপকূলবাসী। প্রতিবছরই উপকূলের মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, জমি এবং জীবিকা হারাচ্ছেন। এই ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি দুর্যোগের সময় ঘটে যাওয়া পানিবন্দী জীবন, সুপেয় পানির অভাব এবং বিশুদ্ধ খাবার না পাওয়ায় রোগবালাইয়ের প্রকোপও বাড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বর্তমান পৃথিবী ক্রমশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে উপকূল অঞ্চলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে চলেছে। এই লবণাক্ততার ফলে উপকূলের কৃষি জমিগুলো দিন দিন অনুপযোগী হয়ে উঠছে। বহু পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল কৃষিকাজ, এখন তা ঝুঁকির মুখে। এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাঁধ উপচে জোয়ারের পানি প্রবেশ করছে, যা উপকূলের মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ।
উপকূল দিবসের প্রয়োজনীয়তা অতীতের সেই বিপর্যয়ের স্মরণে এবং উপকূলবাসীর দুর্যোগ সহনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে উপকূল দিবস ঘোষণা আজ খুবই প্রয়োজন। দিনটি তাদের প্রতি সম্মান জানাতে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতনতা বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। উপকূল দিবস পালনের মাধ্যমে উপকূলবাসীর জীবনের সুরক্ষা, জীবিকার টেকসই ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জলবায়ু ন্যায্যতার দাবি আদায়ের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।১৯৭০ সালের সেই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির প্রভাব আমাদের জীবনের ওপর কতটা গভীর হতে পারে। উপকূলবাসীর জন্য একটি বিশেষ দিবস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হওয়া দরকার।

৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর দুঃখের এক দিন। সেদিনের ভয়াল ঘূর্ণিঝড় শুধু সমুদ্রের তীরবর্তী জনপদ নয়, গোটা জাতিকেই মর্মাহত করেছিল। সরকারি হিসাবে প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল, যদিও বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা দশ লাখেরও বেশি ছিল। উপকূলের মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতার স্মৃতি আজও তাদের তাড়া করে। স্থানীয়দের মতে, এই বিপর্যয়কে স্মরণে রাখতে ও উপকূলবাসীর কষ্টকে স্বীকৃতি দিতে “উপকূল দিবস” প্রতিষ্ঠা করা দরকার।

ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতিচারণ করে আজও অনেক প্রবীণ উপকূলবাসীর চোখ ভিজে ওঠে। বরগুনার এক প্রবীণ বাসিন্দা, আব্দুল করিম, সেদিনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বলেন, “ঝড়ের রাতে আমি আমার পুরো পরিবার নিয়ে বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বাড়ি ভেঙে পড়ে। চোখের সামনে আমার মা-বাবা, ভাই-বোন সবাইকে হারিয়েছি।” করিমের মতে, “সেই সময় ত্রাণ-সহায়তা পেতে সপ্তাহ লেগে গিয়েছিল, আর মরদেহগুলো নদী ও খালে ভাসছিল।”
আরেকজন উপকূলবাসী, রহিমা বেগম, বলেন, “আমাদের পুরো গ্রাম ভেসে গিয়েছিল। বেঁচে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেই সময়ের পরে উপকূলে বসবাস করা যেন অভিশাপ মনে হয়েছিল।” রহিমা মনে করেন, “এই ঘটনাটি আমাদের প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। সেই দিনটির স্মৃতিকে ধরে রাখতে ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করতে সরকার যদি উপকূল দিবস পালন করে, তবে তা উপকূলবাসীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন হবে।”পরিবেশবিদরা মনে করেন, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীলতার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে, কিন্তু এখনো উপকূল অঞ্চলগুলো বড় বিপদের মুখোমুখি। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. হাফিজুর রহমান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ ও তীব্রতা বাড়ছে। ১৯৭০ সালের ঘটনার পর থেকেই আমরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছি, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান অবস্থা উপকূলবাসীর জন্য আরও বেশি ঝুঁকি তৈরি করেছে।”
ড. রহমান আরও যোগ করেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে কৃষি ও জীবিকার সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। তাই এই অঞ্চলের মানুষদের জন্য জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।” তার মতে, “উপকূল দিবস পালন করলে উপকূলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে এবং দুর্যোগ প্রতিরোধের সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব হবে।”
বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান
বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৪ কোটি মানুষ বাস করেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ। পরিবেশ সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ স্থানান্তরিত হয়, মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। তাছাড়া প্রতি বছর উপকূলীয় অঞ্চলে কয়েক লাখ হেক্টর ফসলি জমি লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘূর্ণিঝড় সিডর (২০০৭), আইলা (২০০৯), এবং আম্পান (২০২০) সহ সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়গুলোর পরিসংখ্যান বলছে, এগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ক্রমশ বাড়ছে। যদিও সরকারের উদ্যোগে আশ্রয়কেন্দ্র এবং দুর্যোগ পূর্বাভাসের উন্নতি ঘটেছে, তবুও ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপকূল দিবসের প্রয়োজনীয়তা
১৯৭০ সালের এই দিনের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতে ও উপকূলবাসীর জীবনসংগ্রামকে স্বীকৃতি দিতে উপকূল দিবস প্রতিষ্ঠা এখন জরুরি বলে মনে করেন অনেকেই। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ রেজা খান বলেন, “উপকূল দিবস পালনের মাধ্যমে উপকূলের মানুষের অধিকার ও জলবায়ু ন্যায্যতার দাবি আরও জোরালো হবে। এটি তাদের প্রতি একটি সম্মান প্রদর্শন, যা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আরও গুরুত্ব দিতে সরকারকে সচেতন করতে পারে।”১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আমাদের শেখায় যে প্রকৃতির সামনে আমরা কতটা অসহায়। উপকূলবাসীর জীবন এবং পরিবেশকে রক্ষা করার জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। উপকূল দিবস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই বিপর্যয়ের স্মৃতি এবং তাদের লড়াইকে সম্মান জানানো সম্ভব হবে, এবং এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সকলকে সচেতন করবে।

শেয়ার করুনঃ