
সোহেল সরকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সংবাদদাতা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ভারত সীমান্ত ঘেঁষা এলাকা প্রায় ৪৪ কিলোমিটার। জেলার তিনটি উপজেলা কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর ভারত সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত। ওই তিন উপজেলাতেই চোরকারবারিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বেড়ে গেছে চোরাচালান। এ অবস্থায় কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ইতিমধ্যেই সীমান্তে বিজিবি’র দু’টি ব্যাটালিয়নের টহল জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে কোনো অপরাধী যেন পালিয়ে যেতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে বিজিবি। একইসঙ্গে চোরাচালানরোধে তারা কাজ করে যাচ্ছে। ইদানিং পুলিশও তৎপর হয়ে উঠেছে। পুলিশের অভিযানেও ভারতীয় পণ্য জব্দ হয়েছে। পুলিশ ও বিজিবির এসব পৃথক অভিযানে বেশ কয়েকজন চোরাকারবারিও আটক হয়। ভারতে পাচারের সময় সেনাবাহিনীর হাতে আটক হয় ইলিশ। বিজিবি থেকে পাওয়া তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গত দুই সপ্তাহ ধরে তাদের টহল কার্যক্রমে বেশ তোড়জোড়। গত ১০ দিনের এক হিসেব থেকে দেখা যায়, বিজিবি’র অভিযানে কয়েক কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য উদ্ধার হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে, মাদক, শাড়ি-থ্রিপিস, মোবাইল ফোন, ফোনের ডিসপ্লে, কসমেটিকস, মহিষ ইত্যাদি। মূলত দুর্গাপুজাকে সামনে রেখে চোরাচালান বেড়েছে বলে বিজিবি’র দায়িত্বশীল সূত্র স্বীকার করেছে। তবে একইসঙ্গে এটাও জানানো হয়ে যে, চোরাচালানরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থানে রয়েছে। সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে। যদিও স্থানীয় সূত্র মতে, চোরাকারবারিরা বিজিবি’র চোখকে ফাঁকি দিয়ে দেদারছে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।.চোরাকারবারে তারা নানা ধরণের কৌশল অবলম্বন করছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পণ্য এনে তারা ছড়িয়ে দিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তারা অনেকটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। একটি চক্র এ কারবারের সঙ্গে জড়িত। অভিযানে যে পরিমাণ পণ্য ভারত থেকে আসছে এর চারভাগের একভাগও ধরা পড়ছে না। ২৫ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসন আয়োজিত এক সভায় বিজিবি ২৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল ফারাহ মোহাম্মদ ইমতিয়াজ জানান, সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার বেড়েছে। অনেকের বাড়িতে এনে মজুদ করে রাখা হচ্ছে। তবে বিজিবি তৎপর আছে। একই সভায় বিজিবি ৬০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল এ এম জাবের বিন জব্বারও তার আলোচনায় মাদক চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, কেউ যেন অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিতে না পারে সে বিষয়ে বিজিবি কঠোর অবস্থানে। রয়েছে। বিজিবি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ি, গত ১০ দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৌশলী একটি চোরা কারবার ধরা পড়ে ২১ সেপ্টেম্বর। ওই দিন রাতে বিজিবি-২৫ ব্যাটালিয়নের অভিযানে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে প্রায় চার কোটি টাকা মুল্যের ভারতীয় শাড়ি ও থ্রিপিস জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ট্রাকের উপরে পাথর দিয়ে ড্রাম ও বস্তায় ভরে অভিনব কায়দায় পাচারকালে এসব শাড়ি-থ্রিপিস জব্দ করা হয়। প্রায় ছয় কিলোমিটার ধাওয়া করে ট্রাকটি আটকের পর এতে তল্লাশি চালিয়ে ওই বিপুল পরিমাণ ভারতীয় শাড়ি-থ্রিপিস পাওয়া যায়। ২৬ সেপ্টেম্বর আখাউড়ায় ৬০ ব্যাটালিয়নের পৃথক অভিযানে প্রায় পৌণে দুই কোটি টাকা মূল্যের ৫৭টি ভারতীয় এনড্রয়েড মোবাইল ফোন ও ৯৭২টি ফোন ডিসপ্লে উদ্ধার করা হয়।উপজেলার বাউতলা ও ছয়ঘরিয়া সীমান্তের এ অভিযানে ইমিটেশনের নেকলেস, কানের দুল, চুরি, টিকলী ও আংটিও উদ্ধার করা হয় আগের দিন পৌর এলাকার বাইপাস থেকে ৫০ লাখ টাকার ১১৭১টি ডিসপ্লে উদ্ধার হয়। ২০ সেপ্টেম্বর আখাউড়া উপজেলার ধরখার থেকে ১১৫০ কেজি ভারতীয় কফিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে থানা পুলিশ।এ সময় কফি পাচারকাজে ব্যবহৃত একটি পিকআপ ভ্যানও জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো, কসবা উপজেলার হারিয়াবহ গ্রামের শামসু মিয়ার ছেলে কাউছার মিয়া (৪০), বড়টুবার কুদ্দুস মিয়ার ছেলে আবু কালাম (৪২), ধজনগর গ্রামের নূরু মিয়ার ছেলে সেলিম মিয়া (৫৫)। এদিকে কসবা উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী গুরুহিত এলাকা থেকে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি ও থ্রিপিস জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।১৭ সেপ্টেম্বর একটি পিকআপ ভ্যানে করে পাচারের সময় বিজিবি-৬০ ব্যাটালিয়নের অভিযানে এসব ভারতীয় পণ্য জব্দ করা হয়। জব্দ করা পণ্যের মধ্যে ছিলো ১৫৮৪ পিস শাড়ি ও ১৭৭ পিস থ্রিপিস। ২৩ সেপ্টেম্বর কসবা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারকালে এক হাজার ৫০ কেজি ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর অভিযানে উপজেলার বিনাউটি ইউনিয়নের আদ্রা এলাকা থেকে পিকআপ ভ্যানসহ এসব ইলিশ জব্দ করা হয়। এ সময় মো. সারোয়ার আলম নামে একজনকে আটক করা হয়। সারোয়ার আদ্রা গ্রামের শহীদ ভূইয়ার ছেলে। জব্দ করা ইলিশ পরে প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার বিয়াল্লিশর থেকে ৪৯টি ভারতীয় মোবাইল ফোন সেটসহ স্বপন খান (৪০) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। বিজয়নগর কামাল মোড়া এলাকা থেকে ১১ হাজার ৮৭৫ পিস ইয়াবাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে বিজিবি ২৫ ব্যাটালিয়ন। ১৯ সেপ্টেম্বরের অভিযানে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া দু’জন হলো, কামালমোড়া গ্রামের মো. মুলু হোসেনের ছেলে মো. রাকিব হোসেন ও ঘনশ্যামপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে মো. অন্তর। ২২ সেপ্টেম্বর রাতে বিজয়নগর উপজেলার চান্দুরা থেকে আটক করা হয় ভারতীয় ১৭টি মহিষ।