
জহির সিকদার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সংবাদদাতাঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার সীমান্তবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয় ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি ও বাংলাদেশে যখন ভারি বৃষ্টিপাত হয়। অতি সম্প্রতি আকস্মিক ব্যাপক বন্যায় উপজেলার ৪০ গ্রাম প্লাবিত হয়।স্থানীয়রা বলছেন এর কারন মূলত ঢলের পানি আটকে থাকার কয়েকটি খাল ও নদী দখল-দূষণের কথা। স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে বহু আগেই যেসব নদী-খাল জৌলুস হারিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম কালন্দি খাল। এ খালের অনেক অংশই দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ স্থাপনা। এতে করে খাল সরু হয়ে তার স্বাভাবিক চলাচলের গতি হারিয়েছে । ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা থেকে সীমান্ত পার হয়ে আখাইড়া উপজেলার স্থলবন্দর, গাজীর বাজার, নারায়ণপুর বাইপাস মোড়, পৌর এলাকার সড়ক বাজার ও বড় বাজার দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তিতাস নদীতে মিলিত হয়েছে কালন্দি খাল।১৫০ থেকে ২০০ বছর আগে ব্রিটিশ আমলে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ঢলের পানি নিষ্কাশনও সেচ কাজের সুবিধার জন্য খালটি খনন করা হয় বলে জনশ্রুতি আছে।একসময় শুষ্ক মৌসুম বাদে বছরের বাকি সময়ে এ খাল দিয়ে নৌকা চলাচল করত। আখাউড়ার কয়েকটি বাজারে মালামালসহ অন্যান্য মালামাল এ পথে নৌকা দিয়ে নিয়ে আসাত। এখালের পানি এখানকার কৃষিজমির সেচের কাজে ব্যবহৃত হতোা। একসময় উজানের বিশাল জলধারা প্রবাহিত থাকলেও দখলদারদের করাল গ্রাসে খালটি এখন মৃতপ্রায় শহরের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র খালটির সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যও এখন অনেকটা হুমকির মধ্যে।ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার পানিও এই খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়। এক সময়ের খরস্রোতা কালন্দি খাল এখন দখল আর দূষণে মৃতপ্রায়।আখাউড়া প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্লাব নামে একটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে কালন্দি খালটি দখল ও দূষণমুক্ত করার জন্য আন্দোলন করে আসছিল। তাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের নভেম্বরে কালন্দি খালটি দখল ও দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রশাসন। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খালটিতে ৩৪ প্রভাবশালী ব্যক্তির শতাধিক অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে নামেমাত্র অভিযান পরিচালনা করে উচ্ছেদ অভিযান শেষ করা হয়।জানা যায়, প্রভাবশালীরা রাতের আঁধারে প্রথমেবাঁশ, টিনের চাল দিয়ে মাঁচা বেঁধে জায়গাটি দখলে নেন।কিছুদিন পর টিনের বেড়ার আড়ালে পাকা দালান গড়ে তোলেন রহস্যজনক কারণে স্থানীয় প্রশাসনের খালটি রক্ষণাবেক্ষণ ভূমিকা চোখে পড়ে না।আখাউড়া উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, খালটি রাধানগর আখাউড়া মৌজার উপর দিয়ে তিতাস নদীতে বয়ে গেছে।কালান্দি খালটি এস.এ খতিয়ান প্রজার নামে ও বি এস জরিপে খালটি সরকারের ০১ নং খাস খতিয়ানে লিপিবদ্ধ হয়,খালটি এস.এ ১৩৯ দাগ রূপান্তিত হয়ে বি.এস ২৬৩ দাগের খাল হিসেবে সৃজন হয়।খালটি রাধানগর মৌজার বি.এস ম্যাপে পশ্চিম দিকে ৩৭ ফুট প্রস্থ ও পূর্ব দিকে ৩১ ফুট প্রস্থে উল্লেখ রয়েছে কিন্তু বাস্তবে খালটি ১০ থেকে ১৫ ফুট প্রস্থ খুঁজে পাওয়াও মুশকিল।কোনো কোনো স্থানে দখল আর আবর্জনার কারণে খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।অভিযোগ আছে, গত বিএস জরিপের সময় খাল পাড়ের কিছু জায়গা বিভিন্ন ব্যক্তিন নামেওরেকর্ড করা হয়েছে।আখাউড়া উপজেলা ভূমি কার্যালয় সূত্রে আরো জানা গেছে, পৌর এলাকার প্রাণকেন্দ্রের ৩৭৫ ও ১৪৯ দাগের অংশে সবচেয়ে বেশি দূষণ ও দখল হয়েছে। শহরের ভেতরে হওয়ায় দখলদারদের নজর যেন শুধুই খালের ওপর। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর খালটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীরা খুশি হয়েছিলেন। কিন্ত ২০২২ সালের উচ্ছেদ অভিযানের পর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আজ অবদি কালন্দি খালে প্রাণ ফেরানোর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় এখন হতাশ স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ কর্মীরা।স্থানীয় পরিবেশ কর্মীরা বলেন, দখল-দূষণের কারণে কোনো খালেরই পানিপ্রবাহ ঠিক নেই। প্রভাবশালীদের দখলে বিলীন হয়েছে খাল ও নদীর অনেকাংশ। তাই পানি সরে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হওয়ায় বন্যার দুর্ভোগ প্রকট হয়ে উঠেছে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগের মুখে পড়ছেন সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।স্থানীয় বাসিন্দা সবুজ হাসান বলেন, ছোটবেলায় দেখেছি এই খাল দিয়ে নৌকা চলেছে। তখন খালের মধ্যে পানি ছিল ভরপুর, পানির প্রবাহ ছিল অনেক বেশী। কালের পরিবর্তনে ধীরে ধীরে খালটি দখলের কারণে এখন তা প্রায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। খালটি দীর্ঘদিন ধরে খনন না হওয়ায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।
পৌরশহরের রাধানগরের বাসিন্দা দীজেন ঘোষ বলেন, পৌরশহরের বৃহত্তর এলাকা রাধানগর ও সড়ক বাজারের মধ্য দিয়ে কালন্দি খালটি প্রবাহিত। এটি দিনদিন ভরাট হয়ে যাওয়ার কারনে এখন আর খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হয় না। ফলে সামন্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।পাশাপাশি ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে জনগণের দুর্ভোগ বেড়েছে। খালটি উদ্ধারের জন্য একটি সংগঠন, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজ একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, যা এখন সময়ের দাবি।আখাউড়া প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্লাবের উপদেষ্টা বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট আকছির এম চৌধুরী বলেন, উজানের পানি ভাটি অঞ্চলে প্রবাহিত হবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আখাউড়া নদী-খাল দখল ও দূষণে এখন মরা খাল-নদীতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কালন্দি খাল, জাজি গাং, হাওড়া নদী। তাছাড়া অপরিকল্পিত ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণেও পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তিতাস নদী একসময় খরস্রোতা নদী ছিল।
এ নদীতে বড় বড় নৌযান চলাচল করত। কালের পরিক্রমায় আজ তিতাস নদী না চাষাবাদের জমি বুঝা কঠিন। এসব নদী-খাল পরিচর্যা করে সংস্কার করতে হবে। দখল ও দূষণমুক্ত করে পানিপ্রবাহ ঠিক করতে হবে। তা না হলে সামনে আরও ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হবে আখাউড়ার মানুষজন।এলাকাবাসীর দাবী শিগগিরই অবৈধভাবে দখলদার মুক্ত করে খালটির পরিছন্নতার কাজ শুরু করবেন স্থানীয় প্রশাসন। আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাজালা পারভীন রুহি বলেন। কোথায় খাল রয়েছে, সেগুলো কতটুকু ভরাট হয়েছে, সে বিষয়ে জরিপ না করে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে আমরা অবশ্যই চাইবো প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ যেভাবে হয় সেভাবে যেন ব্যবস্থা করা যায়। খালের বিষয়টি অবশ্যই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে এবং তা উদ্বারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।