
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের উপনির্বাচনের ১৩২ ভোট কেন্দ্রের অধিকাংশতেই ব্যাপক ভোট কারচুপি হয়েছে। তাই কারচুপিকৃত কেন্দ্রের ফলাফল বাতিল ও নির্বাচন কমিশনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতি অনাস্থা জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা। বুধবার (৮ নভেম্বর) প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে এই লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
উল্লেখ্য,গত ৫ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ সংসদীয় শুন্য আসনে উপনির্বাচনের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু নৌকা প্রতীকে ৬৬ হাজার ৩১৪ ভোট পেয়ে প্রাথমিকভাবে বিজয় লাভ করে। অপরদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী জিয়াউল হক মৃধা কলার ছড়ি প্রতীকে পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৫৫৭ ভোট। উক্ত নির্বাচনে আশুগঞ্জের কয়েকটি কেন্দ্রে অনিয়মের বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ৫ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সরাইল উপজেলার কয়েকটি কেন্দ্রে ও আশুগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের সমর্থকেরা প্রশাসন, প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারদের সহযোগিতায় ব্যাপক জাল ভোট দেওয়া হয়। ফলে অবৈধ ভোটের মাধ্যমে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
সরাইল উপজেলা নির্বাচন অফিস পরিকল্পিতভাবে কালীকচ্ছ পাঠশালা কেন্দ্র, কালীকচ্ছ পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কালীকচ্ছের প্রতিটি কেন্দ্রে, তেরকান্দা, লুপাড়া, ইসলামামবাদ, আখিতারাসহ অধিকাংশ এলাকার অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভোটার তালিকা সরবরাহ করায় কেন্দ্রের ভিতরে ভোটারদের সঙ্গে আমাদের কাছে সরবরাহ করা ভোটার তালিকা মিলেনি। ফলে শত শত ভোটার ভোট দিতে এসে ভোট না দিয়ে বাধ্য হয়েই ফিরে যেতে হয়েছে। সরাইলের নোয়াগাও কেন্দ্রে, কুট্টাপাড়া পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, শাহজাদাপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহজাদাপুর পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহজাদাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহবাজপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, শাজবাজপুর পশ্চিম সরকারি প্রাাথমিক বিদ্যালয়, ধামাউড়া পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অরুয়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, জয়ধরকান্দি কেন্দ্রে, পানিশ্বর সামসুল আলম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট ছাপানো হয়েছে।
অপরদিকে আশুগঞ্জ উপজেলার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, যাত্রাপুর নূরানীয়া হাফেজিয়া মাদরাসা, যাত্রাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড়তল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাওঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আন্দিদিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শরিফপুর সরকারি প্রাথিমিক বিদ্যালয়, লালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আশুগঞ্জ শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র, বাখরাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কেন্দ্র চরচারতলা, চরচারতলা উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সোহাগপুর দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিশলয় কিন্ডারগার্ডেন লালপুর, চরলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আল ইকরা ইসলামী কিন্ডারগার্ডেন তালশহর, তারুয়া দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শরিফপুর কেন্দ্র ছাড়াও উপজেলার প্রায় সকল কেন্দ্রে ব্যাপকভাবে ভোট ছাপানো হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে তিনি আরও বলেন, আমার পরিদর্শিত ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি ছিল খুবই নগণ্য। অথচ ভোটের অস্বাভাবিক ছড়াছড়ি। কয়েকটি কেন্দ্রের ভোট ছাড়ানোর ভিডিও গণমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এসব কেন্দ্রে নির্লজ্জভাবে ভোট ছাড়ানো হয়। আমি রিটার্নিং অফিসার জেলা পুলিশ সুপার ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে জাননোর পরেও এসব তৎপরতা বন্ধ করতে পারেনি তারা।ভোটার উপস্থিতি কমের খবর বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ও ওঠে এসেছে।
নির্বাচন কমিশনার থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন যেহেতু রিটার্নিং অফিসার,
পুলিশ সুপার ও জেলা নির্বাচন অফিসারগণের তত্তাবধানে উপনির্বাচনটি পরিচালিত হয়েছে, সেহেতু তাদের দ্বারা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হবেনা বলে আমি মনে করি।
এ ব্যাপারে বিচার বিভাগীয় বা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নয় এমন কোন ব্যক্তিবর্গকে দিয়ে তদন্তের দাবি করেন তিনি। অন্যথায় তিনি(আমি) মহামান্য আদালতের শরণাপন্ন হবো।
এমতাবস্থায় সরাইলের কয়েকটি কেন্দ্র ও আশুগঞ্জের অধিকাংশ কেন্দ্রে ব্যাপক পরিমানে ভোট কারচুপি হয়েছে। সেহেতু উক্ত নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃথা বলেন, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে এই কু-কামগুলো হয়েছে। নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। ৩০ থেকে ৩৫ টা কেন্দ্রে ভোট কারচুপি হয়েছে। তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি। তাদের কাছেই আবার তদন্তভার। এই তদন্ত কমিটির ওপর আমার কোন আস্থা নাই। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির দাবি জানাই নির্বাচন কমিশনারের কাছে। অন্যথায় আমি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হব।
এই বিষয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী মো. শাহজাহান আলম সাজু বলেন, আমি তদন্ত কমিটিকে স্বাগত জানাই। তিনি বলেন- স্মরণকালে এমন সুন্দর নির্বাচন হয়নি। এতে মানুষের স্বত:স্ফুর্ত অংশ গ্রহন ছিলো। পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেছেন ভোটের দিন। বিভিন্ন সংস্থার লোকজন ছিলো। আমার ৪ জন প্রতিদ্বদ্বি ছিলেন ভোটের সময় তারাওতো কেউ এমন বলেননি বা অভিযোগ করেননি, যে কোন কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে। নির্বাচন সম্পন্ন হবার তিন দিন পর এ ধরনের অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। জনগণের ভোটের প্রতি অসম্মানের সামিল। তবুও আমি তদন্তকে স্বাগত জানাই।
এর আগে মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখার উপ-সচিব মো. আতিয়ার রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসককে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত ভোটে অনিয়মের খবরের বিষয়ে তদন্ত করে ৩ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এরই প্রেক্ষিতে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. শাহগীর আলম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. রুহুল আমিনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. জয়নাল আবেদিনের নেতৃত্বে আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা পুলিশ।
গত ৫ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ উপনির্বাচনের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। এতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু নৌকা প্রতীকে ৬৬ হাজার ৩১৪ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী জিয়াউল হক মৃধা কলার ছড়ি প্রতীকে পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৫৫৭ ভোট।