
দীর্ঘদিন সম্পর্কের জেরে মাঝে মধ্যেই সাভারের প্রয়াত সংসদ সদস্য ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শামছুদ্দোহা খান মজলিশের বাড়িতে যাতায়াত করতেন ইলেক্ট্রিশিয়ান সুবল কুমার রায়। যাতায়াতের এক পর্যায়ে শামছুদ্দোহা খানের বড় মেয়ে শামীমা খান মজলিশ ওরফে পপির সঙ্গে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়েন সুবল। ঘটনা জানাজানি হলে ওই বাড়িতে সুবলের যাতায়াত বন্ধ করে দেন শামছুদ্দোহা খানের স্ত্রী সেলিমা খান মজলিশ।
এরপরেও সুবল ও শামীমার যোগাযোগ চলতে থাকলে মা সেলিনা খান মজলিশ বিষয়টি জেনে যাওয়ায় মাকে থামাতে ছুরিকাঘাত করেন মেয়ে শামীমা খান মজলিশ। এরপরেও মা জীবিত থাকলে মৃত্যু নিশ্চিত করতে সুবলের সহয়তায় সেলিমা খানের মাথায় ইলেকট্রিক শকের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় মৃত্যু।
পিবিআই জানায়,নিহতের বড় মেয়ে শামীমা খান পপির সঙ্গে গ্রেফতার সুবল কুমার রায়ের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। এছাড়াও পারিবারিক সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করে পিবিআই। তারা হলেন- সুবল কুমার রায়,শামীমা খান মজলিশ ওরফে পপি ও গৃহকর্মী আরতি সরকার। সাভার থানাধীন ভাগলপুর ও পাকিজা এলাকাইয় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।
দীর্ঘ ১৩ বছরেও সেলিমার মৃত্যু রহস্য উদঘাটন না হলে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
মঙ্গলবার (২ জুলাই) রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআই হেডকোয়ার্টার্সে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদার।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়,২০১১ সালের ১৪ জুন সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে নিজ বাসায় দ্বিতীয় তলায় গলায় এবং পেটের নিচের অংশে গুরুতর জখমপ্রাপ্ত হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে ছিলেন সেলিমা খান মজলিশ। পরবর্তীতে পরিবারের লোকজন এবং প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সেলিমা খানকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় চারদিন পর ১৮ জুন সেলিমা খান মৃত্যুবরণ করেন।
এরপর ১৫ জুন নিহতের ভাই মো.শাফিউর রহমান খান ওরফে শাফি বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।
পরবর্তীতে থানা পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলাটির তদন্তভার সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।
সিআইডি কর্তৃক তদন্ত-
সিআইডির তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার মো.আবু বকর সিদ্দিক মামলাটি ২০১১ সালের ২৪ জুন থেকে ২০১৫ সালের ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ৪ বছর ৩ মাস ২৪ দিন তদন্ত করেন। তদন্তকালে তিনি মামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আসামি হিসেবে মো. আবু সুফিয়ান ওরফে রানাকে গ্রেফতার করে। মামলাটি তদন্ত শেষে তিনি গ্রেফতার আবুল কালাম আজাদ, হরিপদ সরকার এবং মো.আবু সুফিয়ান ওরফে রানাকে এই মামলার ঘটনার দায় থেকে অব্যাহতি প্রদান করে সাভার মডেল থানার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন।
মামলাটি পুনঃতদন্ত হওয়ার কারণ-
সিআইডি এফআরটি দাখিল করলে বাদীপক্ষ মামলাটি পিবিআইয়ে সহযোগিতায় পুনরুজ্জীবিত করার আবেদন করে ব্যর্থ হয়। ইতোমধ্যে মামলার বাদীপক্ষ বিষয়টি সরকারের ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন। পরে পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক মো.সালাহ উদ্দিন মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে বলে মামলটি পুনরুজ্জীবিত করার আবেদন করেন। পরবর্তীতে আদালত মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ প্রদান করেন।
পিবিআইয়ের মামলার তদন্ত-
পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মামলাটির তদন্তভার এসআই সালেহ ইমরানের কাছে অর্পণ করেন। তিনি তদন্তভার গ্রহণ করে মামলাটি কার্যক্রম শুরু করেন। ২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী তদন্তভার পিবিআইয়ের এসআই মো.ইমরান আহমেদের কাছে অর্পণ করেন।
যেভাবে পিবিআই মামলার তদন্ত শুরু করে।
বনজ কুমার মজুমদার সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মামলা পুনর্জীবিত করতে নির্দেশনা আসে। পিবিআই ঘটনার তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শুরু হলে নিহয়ের বড় মেয়ে শামীমা খান মজলিশের পাশাপাশি বাকি দুই মেয়েকেও সন্দেহের মধ্যে রাখা হয়। খোঁজ ক্রয়া হয়,ওই বাসায় কারা যাতায়াত করতো। জানা যায়,একজন ইলেকট্রিশিয়ান মাঝে মাঝে বাসায় আসতো। কিন্তু তার বহুদিন ওই বাসায় আসা-যাওয়া নেই। সে ৩০ বছর ধরে সাভার থানায় ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করছে। সেই সঙ্গে পাশেই তার একটি বড় মুদির দোকানও রয়েছে।
কিন্তু তদন্তকালে জানা যায়,নিহতের রুমের ইলেকট্রনিক সুইচ বোর্ড ভাঙ্গা এবং দুটি ইলেকট্রনিক তার বের করে রাখা হয়েছে। এরপর ইলেকট্রিশিয়ান সুবল কুমার রায়কে নিয়ে আসা হয়।
সংসদ সদস্য শামছুদ্দোহা খান মজলিশ ইলেকট্রিশিয়ান সুবল কুমার রায়কে পছন্দ করতেন। এ কারণে ১৯৯৮ সাল থেকে সুবল মাঝে-মধ্যে শামছুদ্দোহার বাসায় যাতায়াত করতেন এবং বাসার ইলেকট্রিকের কাজ করে দিতেন।
পিবিআইপ্রধান বলেন,সুবল কুমার রায়কে গ্রেফতারের পর আদালতের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে জানান, সেলিমা খান মজলিশের বড় মেয়ে তার স্বামীকে নিয়ে নিচতলায় বসবাস করতেন। সেখানে সে নিয়মিত যাতায়াতের এক পর্যায়ে শামীমা খান মজলিশের স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে ২০০১ সালে সুবল কুমার রায় এবং শামীমা খান পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি ২০০৫ সালে জানাজানি হলে তাকে মারধর এবং অপমান করা হলে তিনি বাসা থেকে চলে যান। সুবলকে বাসায় আসতে নিষেধ করা হয়। ২০০৮ সালে সুবল কুমার রায় বিয়ে করেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি আবার সেই সংসদ সদস্য শামছুদ্দোহা খানের বাসায় যাতায়াত শুরু করেন।
যেদিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে সেদিন ভোরবেলা ফজরের নামাজের সময় নিহত সেলিমা খান মজলিশ ছাঁদে উঠেছিলেন এবং সেখান থেকে দেখতে পান সুবল চুপিচুপি তার বাড়ির দিকে আসছে। এরপর সে এটা দেখে চিৎকার করতে করতে নিচে নামছিলেন। তখন সুবল ও শামীমা খান মায়ের চিৎকার থামাতে উপরে যান। মাকে থামানোর জন্য মেয়ে শামীমা খান মাকে জাপটে ধরেন। পাশে থাকা একটি ফল কাটার চাকু দিয়ে গলার দুই পাশে তিনটি পোচ দেন তিনি। এরপর দেখেন তার মা মারা যায়নি। তখন ইলেকট্রিশিয়ান সুবল ইলেকট্রিক বোর্ড ভেঙে সেখান থেকে দুইটি তার বের করে সেলিমার মাথায় ইলেকট্রিক শক দেয় এবং মৃত্যু নিশ্চিত করে। ফলে এই বিষয়টি ময়নাতদন্ত রিপোর্টে আসে না।
ডিআই/এসকে