
ঘূর্ণিঝড় রেমালের তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে উপকূলীয় এলাকা পিরোজপুরের ইন্দুরকানী। উপজেলার ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ বাড়িঘরে পানি ওঠায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে বাসিন্দারা। ঘূর্ণিঝড়ে উপজেলার অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। জলোচ্ছ্বাসের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁচা ঘর বাড়ি।
অনেকে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী উঁচু পাকা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার গাছপালা বিধ্বস্ত হয়েছে। অধিকাংশ কৃষকের কলাবাগান তছনছ হয়ে গেছে। ঘরের উপর বড় বড় গাছপালা উপড়ে পড়ে শত শত বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও বাতাসের প্রচণ্ড গতিবেগ থাকায় অনেকের ঘরের টিনের চালা উড়ে গেছে। পানিতে ডুবে অনেকের গরু, ছাগল,হাস মুরগি মারা গেছে।
জলোচ্ছাসে কচা ও বলেশ্বর নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ভেঙে গেছে বেড়িবাঁধ। পানির চাপে নদী তীরবর্তী গ্রামের কাঁচা পাকা রাস্তাঘাট জলোচ্ছাসে তলিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় রাস্তা ভেঙ্গে গেছে এবং বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ছোট বড় বিভিন্ন সড়ক ভেঙে যাওয়ায় ওইসব এলাকার বাসিন্দারা চলাচলের জন্য পড়েছেন চরম দুর্ভোগে ।
বিদ্যুৎ লাইন ও খুটির উপর গাছপালা উপড়ে পড়ার কারনে বিদ্যুৎ বিহীন হয়ে পড়েছে সমগ্র উপজেলা। প্রতিটি গ্রামেই বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই অধিকাংশ গ্রামে। তলিয়ে যায় পুকুর,মাছের ঘের ও কৃষি ক্ষেত। বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে পূর্ব চরবলেশ্বর,পূর্ব চন্ডিপুর, খোলপটুয়া,টগড়া, বালিপাড়া, কালাইয়া,সাউথখালি ও মাঝের চর এলাকায়। জলোচ্ছাসে প্লাবিত হয় চাড়াখালি গুচ্ছগ্রাম,পাড়েরহাট আশ্রয়ন,ইন্দুরকানি বাজার, ঘোষেরহাট বাজার,পাড়েরহাট বন্দর ও চন্ডিপুর হাট। এসব এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে অনেক মালামালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গো খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জলোচ্ছাসে সব জলাধার প্লাবিত হওয়ায় এখানে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া উপজেলার অধিকাংশ বাড়িতেই এখন পর্যন্ত চুলো জ্বালাবার মতো কোন পরিস্থিতি নেই। অনেকের রান্নার চুলা এখনো পানিতে ডুবে রয়েছে। রান্না করতে না পারায় অনেক পরিবার রয়েছে অর্ধাহারে অনাহারে। আবার অনেক পরিবারের সদস্যরা শুকনো খাবার খেয়ে দিন পাড় করছেন। ঘূর্ণিঝড়ের কারনে দুর্ভোগের শেষ নেই এই উপকূলীয় এলাকার মানুষের।
এদিকে ঝড়ের সময় ঘরের উপর গাছ পড়ে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। ঢেপসাবুনিয়া গ্রামের মৃত আশ্রাব আলী মোল্লার স্ত্রী চানবরু বিবি ঝড়ের সময় পাশের ঘর থেকে নিজের ঘরে যান। প্রচন্ড বাতাসে বাড়ির পিছনে থাকা চাম্বল গাছ ঘরের উপরে পড়লে ঘরটি বিধ্বস্ত হয়। এসময় ঘরে থাকা চানবরু বিবি (৭৫) চাপা পড়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। চারদিক পানিতে তলিয়ে থাকায় নিহত হওয়ার একদিন পরে তাকে দাফন করা হয়।
গত মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু বক্কর সিদ্দিকী ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শণ করে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করেন। এ সময় ইউএনও এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা উপজেলার বিভিন্ন দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন। পূর্ব চরবলেশ্বর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ শামসেল ফরাজী জানান,আমার বয়সে এত দীর্ঘ সময় ধরে বন্যা দেখিনি। পানিতে সবার ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। এখন ঘরে থাকার মত অবস্থা নাই।
পূর্ব চন্ডিপুর গ্রামের শাহজাহান জানান, তার ঘরে রান্না করার মত অবস্থা নেই। তাই পাঁচ দিন যাবত বাজার থেকে পাওয়া রুটি খেয়ে বেঁচে আছি।
পাড়েরহাট ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান শাওন জানান, উপজেলার টগড়া ফেরিঘাটের দক্ষিণ প্রান্ত সহ চন্ডিপুর ও বালিপাড়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ বিলিন হয়ে গেছে। নদী তীরবর্তী রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে অনেক। জরুরি ভিত্তিতে বেড়ি বাঁধ,রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার একান্ত প্রয়োজন। ইন্দুরকানীর নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান জিয়াউল আহসান গাজী জানান,ঘূর্ণিঝড়ের দুর্গত মানুষদের জন্য আমার নিজস্ব তহবিল থেকে বিভিন্ন আশ্রয়ন কেন্দ্রে নগদ অর্থসহ খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিয়েছি। তারপরেও এখানে আরো অনেক ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু বক্কর সিদ্দিকী জানান, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা গুলো পরিদর্শন করে দুর্গতদের মাঝে সরকারি খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছি।