
হবিগঞ্জের মাধবপুরে ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাই স্কুল এন্ড কলেজের শতবর্ষ উপলক্ষে চাঁদা দায়ের অর্ধ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে ।জানা যায়,২০২৩ সনের জানুয়ারির ২১ তারিখ ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাই স্কুল এন্ড কলেজের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে স্কুল কর্তৃপক্ষ চাঁদা আদায় করেন প্রায় অর্ধ কোটি টাকা । ওই স্কুল এন্ড কলেজের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির খবরে দৈনিক সকালের খবর প্রতিনিধির দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা যায়, শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ওই স্কুলের সাবেক ছাত্র-ছাত্রী, বর্তমান ছাত্র ছাত্রী, রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ ও মাধবপুর উপজেলার বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেন স্কুল কর্তৃপক্ষ । চাঁদা আদায়ের লক্ষ্যে “শিকড়ের টানে শতবর্ষ উদযাপন” নামে একটি ম্যাগাজিনও বের করেন । আর এই ভুলে ভরা ম্যাগাজিনের প্রথম পাতায় শতবর্ষ উদযাপন লেখা থাকলেও ভেতরের সব পাতায় রয়েছে গৌরবের ১০ বছর উদযাপন। বইটিতে বাণী, ছড়া, কবিতা, বিজ্ঞাপন সহ ছাত্র/ছাত্রী কে কত সনে এসএসসি পাশ করেছেন তাদের সাথে যে ছাত্র/ছাত্রী এসএসসি’র গন্ডি পার হতে পারেনি তাদেরকে ও এসএসসি পাস দেখিয়ে ছবি আকারে ছাপিয়ে তুলে ধরেছেন । বিনিময়ে পেয়েছেন মোটা অংকের টাকা। ওই ম্যাগাজিন বইটিতে রয়েছে ব্যক্তি মালিকানাদিন ফার্ম, দোকানের বিজ্ঞাপন সহ ১৪টি কোম্পানির বিজ্ঞাপন । প্রতিটি কোম্পানি থেকে আদায় করা হয়েছে ডোনেশন । এছাড়াও সমাজের নেতাকর্মী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, চাকুরীজিবী, সমাজ সেবক, পীর সাহেব সহ কেও বাদ পড়েনি চাঁদা আদায় করার ক্ষেত্রে। এমনি করে প্রায় অর্ধকোটি টাকা চাঁদা আদায়ের তথ্য বেরিয়ে আসে অনুসন্ধানকালে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শতবর্ষ অনুষ্ঠানে প্রায় তিন হাজার লোকের আয়োজন করা হয়েছিল। যেখানে অতিথি আপ্যায়নের জন্য ১ পিছ ডিম, ১ পিছ পোল্ট্রি মুরগ ও পোলাও ভাতের আয়োজন করা হয়েছিল । বাজার করার প্রধান দায়িত্বে ছিলেন, সহকারি শিক্ষক দীপক কান্তি রায়। আর এই অনুষ্ঠানের শুধু মসলার বাজারের হিসেব দেখানো হয়েছিল প্রায় ২ লক্ষ টাকা। এখানেও পুকুর চুরির মত দুর্নীতি করেছেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া যায় ।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শতবর্ষ অনুষ্ঠানে ৩ হাজার লোকের খাবারের আয়োজনের টুকেনও করা হয়েছিল। কিন্তু টুকেন হাতে থাকা অনেক ব্যক্তি খাবার না পেয়ে উপবাসে ফিরতে হয়েছে বাড়িতে। দুর্নীতি ও অনিয়মের মহা তান্ডবে লন্ডভন্ড ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাই স্কুল এন্ড কলেজ ।
এই শতবর্ষ অনুষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্বে থাকা ঐতিহ্যবাহী খান্দুরা দরবার শরীফের পীরজাদা সৈয়দ সুহেল সাহেবের সাথে এই বিষয়ে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, এই অনুষ্ঠানে আমাকে আহ্বায়কের দায়িত্ব পালনের জন্য যখন বলা হয়েছিল তখন আমি সম্মতি দিতে অস্বীকার করি। পরে আমাকে অনেক অনুরোধ করে আহ্বায়ক বানানো হয়েছিল। আমি এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে বেশ কিছু উপ কমিটি গঠন করে দিয়েছিলাম। অনুষ্ঠান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রেজুলেশনের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক হারুন অর রশিদ, সভাপতি মোঃ শামছু মিয়া, সহকারী শিক্ষক দীপক কান্তি রায় সহ বেশ কিছু ব্যক্তিবর্গদের নিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের জন্য কত টাকা চাঁদা কালেকশন করা হয়েছিল জানতে চাইলে সৈয়দ সুহেল সাহেব বলেন, আমি সঠিক বলতে পারব না। তবে অনুষ্ঠান শেষে প্রধান শিক্ষকের নিকট সকল হিসাব কিতাব বুজিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবং তার একটা রেজুলেশনও করা হয়েছিল। যদি প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করেন তাহলে সব কিছু জানতে পারবেন। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক হারুন অর রশিদ এর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে রেজুলেশনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে জানিনা । শতবর্ষ অনুষ্ঠানে কত টাকা খরচ হয়েছে জানতে চাইলে তিনি আগের ন্যায় সহজ উত্তর দিয়ে বলেন, আমি এই সবের কিছুই জানি না। শতবর্ষ অনুষ্ঠানের ম্যাগাজিন বইটির বিষয়ে জানতে চাইলে সোজাসাপ্টা উত্তর দেন অনার্থক আমাকে প্রশ্ন করে কোন লাভ নেই । আমি কোন কিছুই জানিনা। সর্বশেষে শতবর্ষের ম্যাগাজিন বইটি কেন বিতরণ করা হয়নি জানতে চাইলে তিনি পূর্বের ন্যায় একইভাবে উত্তর দিলেন জানি না ৷ তাহলে জানে কে ? এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন তাও জানিনা । অর্থাৎ তিনি না শব্দ মুখস্ত করে বিপদমুক্ত হতে চাইছেন ।
অন্যদিকে বাজার করার দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক দীপক কান্তি রায় এর কাছে দুই লক্ষ টাকার মসলার বাজারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাজার কত টাকার করা হয়েছে তার হিসেব প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করলে জানতে পারবেন।
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শামছু মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এই স্কুল এন্ড কলেজের অনিয়ম ও দুর্নীতির ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিক্ষা অফিসার’কে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে । ৯ মে বৃহস্পতিবার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তদন্তও করেছেন । যার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রমানিত হবে তার উপর শাস্তি দিবে প্রশাসন। এই তদন্তের সাথে আমি একমত পোষণ করছি। যারা অপরাধের সাথে জড়িত তাদের শাস্তি হোক। এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফয়সাল এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও ইউডিসিকে তদন্তের দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে । কোন অনিয়ম বা দুর্নীতি প্রমানিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা গ্রহণ করা হবে।