
মোবাইল ফোন বর্তমান যুগে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। গুরুত্বপূর্ণ সকল তথ্য আদান-প্রদান, সংরক্ষণ, আর্থিক লেনদেন এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের জন্য আমরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বেড়েছে। হ্যাকাররা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন নিত্য নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল ডিভাইস ও মোবাইল ফোন হ্যাক করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেই চলেছে।
হ্যাকারদের নতুন কৌশল:
সম্প্রতি হ্যাকাররা একটি নতুন কিছু কৌশল ব্যবহার শুরু করেছে। এই কৌশলে তারা একজন ব্যবহারকারীর সাথে ফোনে (whatsapp, imo) কথোপকথন চালিয়ে যায় এবং একই সাথে অন্য একজন হ্যাকার দূর থেকে ‘এক্সপ্লয়েট কমান্ড’ পরিচালনা করে। এই কমান্ডগুলো ম্যালওয়্যার ইনস্টল করতে, সংবেদনশীল ডেটা চুরি করতে বা ডিভাইসটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
এক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে সরাসরি ফোন করা হয় বা ক্ষুদেবার্তায় সহজ শর্তে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখানো হয় যাতে ব্যবহারকারীরা নিজেরাই ফোন করতে উদ্বুদ্ধ হন।
কেস স্ট্যাডি:
খুলনা জেলার বয়রা এলাকার একজন স্কুল শিক্ষিকা আয়েশা সিদ্দিকা আমার কাছে একটি সমস্যা নিয়ে আসেন। তার অভিযোগ গুলি ছিল এমন-
১: ফোনে কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
২. ফেসবুক আইডি অন্য কেউ ব্যাবহার করছে।
৩. টেলিগ্রাম আইডির ডিভাইস ম্যানেজারে মোবাইল ফোনের যে মডেল নাম্বার ও তথ্য দেখাচ্ছে তা আমার হ্যান্ডসেটের তথ্য নয়।
৪. হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের প্রোফাইলে আমার ছবি দেওয়া ছিল। কিন্তু সেটি পরিবর্তন হয়ে অন্য একটা ছবি সেট করা হয়েছে।
৫. হোয়াটসঅ্যাপ একাউন্টে বেশিরভাগ সময় আমি প্রবেশ করতে পারি না। হোয়াটসঅ্যাপ থেকে আমার কাছে নোটিফিকেশন বার্তা আসে যে, অন্য একটি ডিভাইসে আমার আইডি লগইন করা হয়েছে।
এমতাবস্থায়, আমি ভুক্তভোগীর অনুমতি নিয়ে তার ফেসবুক আইডিতে লগইন করেছিলাম। পর্যবেক্ষনের এক পর্যায় দেখাগেলো সত্যি সত্যিই লগইন হিস্টোরিতে একটি অপরিচিত ডিভাইসের তথ্য রেকর্ড হয়ে আছে। নিশ্চিত হওয়া গেলো— ফোনটি হ্যাক হয়েছে এবং ভুক্তভোগীকেও বিষয়টি জানানো হল। ভুক্তভোগীর অনুমতি নিয়ে জিমেইল সহ অন্যান্য একাউন্ট থেকে অপরিচিত ডিভাইসগুলো সরিয়ে সব অ্যাকাউন্ট ও ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডিভাইস ও অ্যাকাউন্টগুলোর নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করে হ্যাকারের কবল থেকে ফিরিয়ে আনা হল। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর সমস্যার সমাধান দেয়া হয়।
কিছুক্ষনের মধ্যেই ভুক্তভোগী আমাকে ফোন করে জানালেন, তাকে কিছু অচেনা হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার থেকে বার বার ফোন করা হচ্ছে। তিনি আমাকে স্ক্রিনশর্ট পাঠালেন। তার পাঠানো স্ক্রিনশটে দেখা গেলো ২০ থেকে ২৫ বার তাকে কল করা হয়েছে, কিন্তু তিনি কোনটই রিসিভ করেননি।
কিছুক্ষণ পরেই আরো একটি বিদেশি নাম্বার থেকে ফোন আসা শুরু হয় একইভাবে। অর্থাৎ হ্যাকাররা যখন বুঝতে পারে যে তাদের শিকার হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে, ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ তারা হারিয়েছে, তখন তাদের মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। ভুক্তভোগীর ডিভাইস ও আইডি গুলো আবারও নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে।
ফোন কল আসার হার যখন ধৈর্যের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল ভুক্তভোগী তার হোয়াটসঅ্যাপের এক্সেস পুনরায় আমাকে দিলেন পর্যবেক্ষণের জন্য। আমি উক্ত সন্দেহজনক হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে সাইবার অপরাধের শাস্তি, আন্তর্জাতিক অপরাধীদের শনাক্ত ও ইন্টারপোলের মাধ্যমে সাইবার অপরাধীদের আটকের বিধানের প্রক্রিয়াটি ক্ষুদেবার্তায় পাঠিয়ে দিলাম। আর এতেই সেই অচেনা নম্বর গুলো থেকে ক্ষুদেবার্তা ও ফোনকল আসা বন্ধ হয়ে যায়।
ঝুঁকি:
ডেটা চুরি: সফল হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে হ্যাকাররা ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোনের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে এবং ডেটা চুরি করতে পারে।
ম্যালওয়্যার ইনস্টল: হ্যাকাররা ম্যালওয়্যার ইনস্টল করে ডিভাইসকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কীভাবে নিরাপদ থাকবেন:
যদি ফোন রিসিভ করার পর অপর প্রান্ত থেকে কোনো কথা না বলে চুপ থাকে তাহলে ফোনটি কেটে দিন। ফোন দিয়ে যদি অফার বা বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করে তাহলেও কেটে দিন। ফোন দিয়ে যদি কোন প্রলোভন, অ্যাপস ইন্সটল বা গেম খেলে বিজয়ী হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় লাইনটি কেটে দিন।
সন্দেহজনক ফোন কল কখনোই দীর্ঘায়িত করবেন না। আপনার সাথে কথোপকথনের আড়ালে হ্যাকার যদি এক্সপ্লয়েট চালিয়ে ডিভাইসে প্রবেশের চেষ্টা করে সেক্ষেত্রে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সাথে সাথেই হ্যাকারের সম্পুর্ন প্রক্রিয়াটি ভেস্তে যাবে।
অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে আসা ফোন কলগুলোতে সতর্ক থাকুন এবং কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করবেন না।
সন্দেহজনক ওয়েবলিংকে ক্লিক করবেন না এবং অপরিচিত উৎস থেকে অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করবেন না। এছাড়া আপনার মোবাইল ফোনের জন্য শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।
লেখক:মেহেদী হাসান
উপদেষ্টাঃ স্মার্ট সলুশ্যন,
প্রতিষ্ঠাতাঃ লজিক আই ফরেনসিক।
mehedi0001@yahoo.com