
মু. রিয়াজুল ইসলাম লিটন, সিনিয়র রিপোর্টার:
ঈদ জামাতের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ মিনার দিনাজপুর গোর-এ শহীদ ময়দান কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ। সৌন্দর্য বাড়ানোর লক্ষ্যে মিনারে সংস্কার কাজ, রং করা, ধোয়ামোছা, মাঠে মাটি ভরাটসহ আনুষঙ্গিক কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে । এ উপলক্ষে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। এছাড়াও ঈদের নামাজে আসা মুসল্লিদের জন্য তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
পুলিশ সুপার মহোদয়ের ঈদগাহ ময়দান পরিদর্শন
দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ঈদগাহ গোর-এ-শহীদ ময়দান দিনাজপুরে ঈদ-উল-ফিতর নামাজের জামাত সুষ্ঠু ভাবে পালনের লক্ষে জেলার সন্মানিত পুলিশ সুপার জনাব শাহ ইফতেখার আহমেদ, পিপিএম (বার) মহোদয় গত ০৭ এপ্রিল ২০২৪ খ্রিঃ দুপুর ১৩.০০ ঘটিকায় গোর-এ-শহীদ ঈদগাহ ময়দান পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন শেষে পুলিশ সুপার মহোদয় সাংবাদিকদের বলেন, ঈদগাহ ময়দানজুড়ে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার সদস্যরা ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করবে। নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করতে ওয়াচ টাওয়ার ছাড়াও পুলিশের তৎপরতা সাদা পোশাকে অব্যাহত থাকবে। আমরা নিরাপত্তা ব্যাবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছি। মেটাল ডিটেক্টর, আর্চওয়ের মাধ্যমে চেকিং হয়ে মুসুল্লিরা মাঠে প্রবেশ করবে। ময়দানের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশা করি নিরাপদে নির্বিঘ্নে মুসুল্লিরা নামাজ আদায় করে ঘরে ফিরতে পারবেন।
এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন জনাব মোঃ মমিনুল করিম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ), জনাব আব্দুল্লাহ আল মাসুম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস্), (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) জনাব সিফাত-ই-রাব্বান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি), জনাব মোঃ মোসফেকুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক এন্ড এস্টেট), জনাব শেখ মোঃ জিন্নাহ আল মামুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল), দিনাজপুরসহ জেলা পুলিশের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
এরই মধ্যে মাঠের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। মাঠের আরেকটি অংশে ঘের দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন যানবাহনের গ্যারেজ। এছাড়াও পাশের স্টেশন ক্লাব, সার্কিট হাউজ, শিশু একাডেমি ও জেলা গণগ্রন্থাগারেও যানবাহন রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রবেশের জন্য মাঠের চারপাশে তৈরি করা হয়েছে ১৯টি তোরণ। শহরের প্রবেশমুখ এবং মিনারে যাওয়ার রাস্তায়ও তৈরি হয়েছে তোরণ। মুসল্লিদের জন্য মাঠে ওজুখানা ও ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নামাজের সময় বিদ্যুতের পাশাপাশি থাকবে জেনারেটর সহ শতাধিক মাইক। এছাড়া র্যাবের জন্য তৈরি করা হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার ও সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ মাচা। ঈদের দিন অন্যান্য উপজেলা থেকে বাস সার্ভিস ছাড়াও যেসব উপজেলার সঙ্গে শহরের ট্রেন যোগাযোগ রয়েছে সেসব উপজেলা থেকে মুসল্লিদের জন্য স্টেশনগুলো থেকে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জানা যায়, দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ শহীদ ময়দানের পশ্চিম প্রান্তে ২০১৫ সালে এ ঈদগাহের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় দেড় বছর পর এটি নামাজের জন্য পুরো প্রস্তুত করা হয়। এই ঈদগাহে রয়েছে ৫২টি গম্বুজের দুই ধারে ৬০ ফুট করে দুটি মিনার, মাঝের দুটি মিনার ৫০ ফুট করে এবং প্রধান মিনারের উচ্চতা ৫৫ ফুট। এসব মিনার আর গম্বুজের প্রস্থ ৫১৬ ফুট। দেশের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গোর-এ শহীদ ময়দানের পশ্চিম দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ ঈদগাহ মিনারটি। প্রত্যেকটি গম্বুজে দেওয়া হয়েছে বৈদ্যুতিক বাতি সংযোগ। মিনার দুটির উচ্চতা ৫০ ফুট, যে মেহরাবে খতিব বয়ান করবেন সেটির উচ্চতা ৫০ ফুট। ৫২টি গম্বুজ ২০ ফুট উচ্চতায় স্থাপন করা হয়েছে। গেট দুটির উচ্চতা ৩০ ফুট।
প্রতিবছর দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতো কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায়। এখন দিনাজপুরে ৫২ গম্বুজের ঈদগাহ মাঠে সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। দেশের সবচেয়ে বড় এই ঈদের জামাতে ইমামতি করবেন দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতাল জামে মসজিদের খতিব মাওলানা শামসুল হক কাসেমী। ঈদের জামাত সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে বলে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে মাইকিং করে প্রচার করা হচ্ছে । এছাড়া যদি বৈরী আবহাওয়া হয় তাহলে বড় মাঠের পাশে মসজিদসহ আশপাশের এলাকার মসজিদগুলোতে একযোগে নামাজ আদায় করা হবে।
জেলা প্রশাসন,পৌরসভা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পাশাপাশ জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে গত কয়েকদিন ধরে মিনারের সংস্কার ও মাঠের পরিচর্যার কাজ তদারকি করেছেন। জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম ও জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, দিনাজপুর পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রেখেছেন।
দিনাজপুর পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গোর-এ শহীদ বড় ময়দানে ঈদের জামাত ঘিরে কড়া নিরাপত্তার জন্য নেওয়া হয়েছে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ঈদগাহের চারপাশে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে মুসল্লিদের তল্লাশির ব্যবস্থা থাকবে। ঈদগাহ প্রাঙ্গণে সক্রিয় থাকবেন সাদা পোশাকে পুলিশ ও র্যাব সদস্যসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। এছাড়া মাঠের নিরাপত্তার জন্য নির্মিত হয়েছে চারটি বড় পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। ট্রাফিক ব্যবস্থা থাকবে শহরজুড়ে। যাতে করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা যানবাহনগুলো শহরে প্রবেশ করতে ও বের হতে কোনো সমস্যা না হয়।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, ঈদের জামাত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এদিকে ঈদের জামাতে দূর-দূরান্তের মুসল্লিদের জন্য থাকছে দুটি ঈদ স্পেশাল ট্রেন।২০২৩ সালে পবিত্র ঈদুল ফিতরে এই ময়দানে একসঙ্গে ৬ লক্ষাধিক মানুষ নামাজ আদায় করেছিলেন। গত ঈদুল আজহা থেকে আশপাশের জেলা ও উপজেলাগুলো থেকে আগত মুসল্লিদের সুবিধার্থে দুটি স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এবার পবিত্র ঈদুল ফিতরেও দুটি স্পেশাল ট্রেন চলাচল করবে। বিশাল এই জামাতে দিনাজপুর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসল্লিরা যেন নামাজে অংশ নিতে পারেন এজন্য প্রচার-প্রচারণা ও নিরাপত্তার বিষয়ে বরাবরের মতো জোর দেওয়া হয়েছে।
ঈদ স্পেশাল দুটি ট্রেনের সময়সূচি
এ জামাতে দূরদুরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের জন্য দুটি স্পেশাল ট্রেন সার্ভিসের ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার বলেন, রেলওয়ের বিভাগের মহাপরিচালকের নির্দেশনা অনুযায়ী পশ্চিমাঞ্চল রেলের জেনারেল ম্যানেজার ঈদের জামাতে শরিক হওয়ার জন্য ঈদের দিন এ দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছেন। ঈদের দিন সকাল ছয়টায় পার্বতীপুর থেকে স্পেশাল ১৭ নম্বর ট্রেন ছাড়বে। জামাত শেষে দিনাজপুর স্টেশন থেকে স্পেশাল ১৮ নম্বর ট্রেন ছাড়বে সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে।
স্পেশাল ১৭ ও ১৮ নম্বর ট্রেন জেলার মন্মতপুর, চিরিরবন্দর ও কাওগাঁও স্টেশনে যাত্রা বিরতি দেবে। স্পেশাল ১৯ নম্বর ট্রেন ঠাকুরগাঁও স্টেশন থেকে ছাড়বে ভোর পাঁচটায় এবং জামাত শেষে সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে দিনাজপুর স্টেশন থেকে স্পেশাল ২০ নম্বর ট্রেন ছাড়বে। ১৯ ও ২০ নম্বর ট্রেন শিবগঞ্জ, পীরগঞ্জ, সেতাবগঞ্জ, মঙ্গলপুর ও কাঞ্চন জংশনে যাত্রাবিরতি দেবে। রেলওয়ে বিভাগের ভাষ্য, ১৭ ও ১৮ নম্বর ট্রেন কাঞ্চন কমিউটারের রেকে এবং ১৯ ও ২০ নম্বর ট্রেন দোলনচাঁপার রেকে চলবে বলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
উল্লেখ্য, দিনাজপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গোর-এ শহীদ বড় ময়দানের আয়তন প্রায় ২২ একর। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই এ মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে বড় কোনো মিম্বর ছিল না। ২০১৫ সালে স্থানীয় সাংসদ ও জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি মিনার নির্মাণের পরিকল্পনা ও অর্থায়ন করেন। এরপর ২০১৭ সালে সম্পন্ন হয় নির্মাণকাজ। নির্মিত ৫২ গম্বুজের ঈদগাহ মিনার তৈরিতে খরচ হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। গম্বুজগুলোর দুই ধারে ৬০ ফুট করে দুটি মিনার, মাঝের দুটি মিনার ৫০ ফুট করে। ঈদগাহ মাঠের মিনারের প্রথম গম্বুজ অর্থাৎ মেহেরাবের (যেখানে ইমাম দাঁড়াবেন) উচ্চতা ৪৭ ফিট। এর সঙ্গে রয়েছে আরও ৪৯টি গম্বুজ। এছাড়া ৫১৬ ফিট লম্বায় ৩২টি আর্চ নির্মাণ করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এত বড় ঈদগাহ মাঠ দ্বিতীয়টি নেই। এর আগে ঈদগাহের মধ্যে দিনাজপুর স্টেশন ক্লাব থাকলেও এবার তা সরানো হয়েছে। ফলে বেড়েছে ঈদগাহের আয়তন। পুরো মিনার সিরামিক্স দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি গম্বুজ ও মিনারে রয়েছে বৈদ্যুতিক লাইটিং। রাত হলে ঈদগাহ মিনার আলোকিত হয়ে ওঠে। ২০১৭ সাল থেকেই প্রতিবার এখানে ঈদের নামাজ আদায় করছেন দিনাজপুর জেলাসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা-উপজেলার ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। দিনাজপুর সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মুসল্লিদের জন্য ৩০০টি ওজুখানা, ৪০টি টয়লেট ও খাবার পানি সরবরাহের জন্য ৫টি পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের ভাষ্যমতে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে এ মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এর আগে বড় কোনো মিম্বার ছিল না। ২০১৫ সালে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম মিনার নির্মাণের পরিকল্পনা ও অর্থায়ন করেন। এরপর ২০১৭ সালে সর্ববৃহৎ এ ঈদগাহ মাঠের নির্মাণকাজ শেষ হয়।