বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতি করে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া চক্রের চারজনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। তারা ভূয়া দলিল ও এনআইডি ব্যবহার করে এসব করতেন। টার্গেট ছিল আরও ৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তিনি পরিবারকে নিয়ে বিদেশে চলে গিয়ে গা ঢাকা দেবেন প্রতারক জয়নাল। তার আগেই তাকেসহ তার চক্রের তিনজনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি।
গ্রেফতারকৃতরা হলো,জয়নাল আবেদীন ওরফে ইদ্রিস (৪২), নির্বাচন কমিশনের কর্মচারী পল্লব দাস (৩৬), রফিকুল ইসলাম খাঁন (৩৮) ও আলিফ হোসেন (২০)।
শুক্রবার মিরপুর ডিওএইচএসস্থ ১৩ নম্বর রোডের ৯৪০/৪১ বাসার নিচ তলায় থাকা জয়নালের অফিস থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
শনিবার ( ৬ এপ্রিল ) দুপুরে ডিবির নিজ কার্যালয়ে এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।
ডিবির হারু বলেন,এই প্রতারক জয়নালের এক সময় কিছুই ছিল না। তিনি ইমিটেশন পণ্যের দোকান করতেন। কিন্তু সেই ব্যবসায় লস করে তিনি ব্যবসা ছাড়েন। এরপর জড়িয়ে পড়েন প্রতারণায়।
জয়নাল তার প্রতারণার জন্য একটি কোম্পানি খুলে সেখান থেকে আরও সাতটি কোম্পানির নামে কাগজপত্র তৈরি করে রেখেছিল। পরে সেগুলো দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের দিয়ে সে ঋণ নিতো। আমরা তাকেসহ পল্লব দাসক রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসা করব পল্লব দাস জয়নালের মতো আর কতজনকে সার্ভার ব্যবহারে এমন কার্যকর এনআইডি তৈরি করে দিয়েছে। এছাড়া তারা আর কতটি ব্যাংক থেকে এমন ঋণ নিয়েছেন তা আমরা খতিয়ে দেখবো। এই পল্লবের সাথে আরও ইসির যদি কেউ জড়িত থাকে তাদেরও আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।
পল্লব প্রতি এনআইডি বাবদ জয়নালের কাছ থেকে দুই থেকে তিন লাখ করে টাকা নিতেন। তবে এই পল্লব এনআইডি বানিয়ে দিয়ে কত টাকা কামিয়েছেন এবং তার অর্থ সম্পদ করেছেন কিনা তা খতিয়ে দেখবে ডিবি।
ডিবি বলছে,জয়নালের কার্যকর ১০টি এনআইডি ছিল। এসব এনআইডি দিয়ে সে বিভিন্ন ব্যাংকে লোনের জন্য আবেদন করতো। এনআইডির নাম ও ঠিকানা ঠিক থাকতো শুধুমাত্র সে সেটির নম্বর পরিবর্তন করে আরেকটি তৈরি করতো। পল্লব দাস যে অফিসে চাকরী করতেন সেই অফিসারের ব্যবহৃত সার্ভারের পাসওয়ার্ড তার কাছ থাকতো এই সুবাধে তিনি এসব ভূয়া কার্যকর এনআইডি করতেন।
ডিবির হারুন বলেন,জয়নাল তার এনআইডির একই দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে শুধুমাত্র নম্বরগুলো পরিবর্তন করে আরেকটা এনআইডি বানাতো। এজন্য কোনটাতে সে দাড়িসহ ছবি দিতো। আবার কোনটাতে গোফ,কোনটা দাড়ি গোফ ছাড়া থাকতো। কোনটা দুই বছর আগের আবার কোনটা পরের। একই জমি,একই ফ্লাট ও একই অফিস দেখিয়ে ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করতেন জয়নাল। কিছু ব্যাংক থেকে তিনি ঋণ নিয়েছিলেন আবার কিছু ব্যাংক থেকে তার ঋণ প্যান্ডিং অবস্থায় ছিল। এমন ঋণের পরিমাণ ৫০ কোটির টাকার কম নয়। একই এনআইডি ও ভূয়া দলিল দিয়ে জয়নাল একই নামে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ তুলেছে। যে তার এনআইডিগুলো তৈরি করে দিতেন পল্লব দাস আমরা তাকেও গ্রেফতার করেছি।
ডিবি প্রধান হারুন বলেন,জয়নাল ডিওএইচএসে ইআর ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি অফিস নিয়েছিল। মুলত একটি অফিসকে সাত ভাগে সাত নামে একই ঠিকানায় বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করতেন। এ যাবৎ জয়নাল বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে ৩০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু তা ফেরত দেননি। আর এসব টাকায় তিনি তার বসুন্ধরা এলাকায় একটি সাত তলা বাড়ী,উত্তরায়,আশকোনাসহ আট থেকে নয়টি ফ্লাট ও মাদারীপুরে বাড়ী করেছে।
ডিবি জানায়,তার অফিস থেকে বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানের ভূয়া ৫০টি সিল উদ্ধার করা হয়েছে। যা তিনি প্রতারণার কাজে ব্যবহার করতেন। ইনকাম ট্রাক্সের বিভিন্ন ভুয়া ফাইল তৈরী করতেন তিনি। ভূমি অফিসের সহযোগিতায় বিভিন্ন মালিকের ভুয়া দলিলও তৈরি করতেন জয়নাল। তার বাসা থেকে প্রায় কয়েক বস্তা দলিল উদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামেভূয়া কাগজপত্র ও ভাউচার তৈরী করতেন তিনি ও তার চক্র।
ডিবির কর্মকর্তা হারুন জানান,জয়নাল ভূয়া দলিল বানিয়ে জমির নামজারী করতেন। এরপর খাজনা কপি ভূয়া তৈরি করতেন তিনি। এজন্য তাকে ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা সহায়তা করতেন কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভূয়া জমির নামজারী খারিজকপি বিভিন্ন তারিখে সরকারী কর্মকর্তার সহায়তায় এনআইডি কার্ড,দলিল ও অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। জয়নাল একই নামে একই রকম সাত থেকে আটটি ভূয়া দলিল তৈরি করে বিভিন্ন ব্যাংকে জমা দিতো।
হারুন আরও জানান,জয়নাল একটি প্রতিষ্ঠানের উপর একটি লোন নেওয়ার পরে পরবর্তীতে আবারও এনআইডি কার্ডের ছবি তারিখ পরিবর্তন করে জমির দলিল ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লোন নিতেন। অন্যকেও লোন করে দিতেন। এরপর সেই লোকদের কাছ থেকে লোনের পারসেন্ট নিতেন জয়নাল। একাধিক কার্যকারী এনআইডি তৈরি করে একই ফ্ল্যাট/জমি/বাড়ি দেখিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংক হতে লোন নিয়ে উধাও হয়ে যায়। এছাড়াও বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠান এর কাগজ তৈরি করে ব্যাংক লোন নিয়ে থাকে।
ডিবি জানায়,জয়নাল পল্লব দাসের পাসওয়ার্ড দিয়ে একাধিক এনআইডি তৈরি করেন। পল্লব দাস রংপুরে এনআইডি সার্ভারে আউট সোর্সসিং এ ডাটা এন্টি অপারেটর এর কাজ করেন। এসব ভূয়া এনআইডি দিয়ে তিনি বিভিন্ন ভূয়া নামজারী ও ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের সিল স্বাক্ষর জালিয়াতি করে বিভিন্ন ব্যাংকে ঋনের জন্য আবেদন করতেন। এছাড়াও ভূয়া ইনকাম ট্যাক্সের কর্মকর্তাদের সিল স্বাক্ষরে বিভিন্ন কাগজ তৈরি করে সেগুলো বিভিন্ন ব্যাংকে জমা দিতো। চক্রটি একই নামে একাধিক কার্যকর এনআইডি তৈরি করে ব্যাংক ঋণ নিতো।
ডিবি প্রধান বলেন,জয়নাল তার প্রতারণার জন্য একটি কোম্পানি খুলে সেখান থেকে আরও সাতটি কোম্পানির নামে কাগজপত্র তৈরি করে রেখেছিল। পরে সেগুলো দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের দিয়ে সে ঋণ নিতো। আমরা তাকেসহ পল্লব দাসক রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসা করব পল্লব দাস জয়নালের মতো আর কতজনকে সার্ভার ব্যবহারে এমন কার্যকর এনআইডি তৈরি করে দিয়েছে। এছাড়া তারা আর কতটি ব্যাংক থেকে এমন ঋণ নিয়েছেন তা আমরা খতিয়ে দেখবো। এই পল্লবের সাথে আরও ইসির যদি কেউ জড়িত থাকে তাদেরও আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।
এসময় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ডিবির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবীর, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আজহারুল ইসলাম মুকুল এবং অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া ডিবির রমনা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার জাবেদ ইকবাল।
ডিআই/এসকে