
বান্দরবান রুমা বাজারে সোনালী ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার এবং ম্যানেজারকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারে বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছে র্যাব। পাশাপাশি পরপর দুইদিনে কীভাবে
কেএনএফ এই ঘটনা ঘটালো তাও অনুসন্ধান করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বাহিনীটির ধারণা ব্যাংক লুট ও হামলার ঘটনা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। সেই হিসেবে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বেশ কিছুদিন ওই এলাকায় ছদ্মবেশে অবস্থান করছিল।
বৃহস্পতিবার ( ৪ এপ্রিল ) বিকালে এসব তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি বলেন,প্রাথমিকভাবে আমরা যে তথ্য পেয়েছি- এই হামলা পূর্বপরিকল্পিত। ব্যাংক ও তার আশেপাশে এলাকায় তারা (কেএনএফ সদস্যরা) বেশ কিছুদিন ধরে ছদ্মবেশে অবস্থান করছিল। আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বলতে গেলে তারা টাকার জন্য এই কাজটি করেছে। টাকাটা তাদের মূল টার্গেট ছিল। উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের একটি শান্তি কমিটির মাধ্যমে শান্তি আলোচনা চলছে এই সময়ে তাদের অবস্থান ও আধিপত্য জানান দিতেই এই ঘটনা ঘটায়।
এই হামলায় অন্য কারও ইন্ধন রয়েছে কি-না বা কোনো কারণ রয়েছে কি-না সে বিষয় র্যাবের গোয়েন্দারা কাজ করছে জানিয়ে কমান্ডার মঈন বলেন,এরইমধ্যে র্যাব-১৫ বান্দরবান ক্যাম্পে জনবল বাড়িয়েছে। পাশাপাশি র্যাব সদরদপ্তর থেকে পাহাড়ে অভিযানে দক্ষ এমন সদস্যদের বান্দরবান পাঠানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়ে তদন্ত:
মঈন জানান, আমরা ধারণা করছি- রুমা বাজারে সোনালী ব্যাংকে রাত সোয়া আটটা থেকে নয়টার মধ্যে সন্ত্রাসী সংগঠন কেএনএফ হামলা চালায়। হামলার সময়ে বিদ্যুৎ ছিল না। সেটি (বিদ্যুৎ) না থাকার বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি। যতটুকু জানা গেছে হামলায় প্রায় শতাধিক ব্যক্তি অংশ নিয়েছিল।
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন,কেএনএফের রাষ্ট্র বিরোধী কার্যক্রম চালানোর বিষয় সর্বপ্রথম র্যাব সামনে আনে। এই কুকি-চিন ন্যাশনালফ্রন্ট (কেএনএফ) টাকার বিনিময়ে জঙ্গি সংগঠন ‘জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’কে টাকার বিনিময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয়, অস্ত্র সরবারাহ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল। এই প্রশিক্ষণের জন্য তারা তিনবছর মেয়াদী চুক্তি করেছিল। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় র্যাব দীর্ঘ একটি অভিযান চালায়। অভিযানে তাদের ট্রেনিং সেন্টার শনাক্ত, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ শতাধিক জঙ্গি সংগঠনের সদস্য ও কুকি-চিনের ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। টানা অভিযানে তারা দীর্ঘদিন কোণঠাসা ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চলছিল। এই কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কুকি-চিনের বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ রাখে। এই আলোচনা চলমান অবস্থায় ২ এপ্রিল শতাধিক কেএনএফ সদস্য সোনালী ব্যাংকে হামলা চালালো।তারা পুলিশের দশটি অস্ত্র ও আনসারের চারটি অস্ত্র লুট করেছে। ব্যাংকের ম্যানেজার নেজাম উদ্দিন ভল্টের চাবি না দেওয়ায় তাকেও অপহরণ করে নিয়ে গেছে। এর পরেরদিন থানচিতে আরও দুটি ব্যাংকে হামলা চালানো হয়। ব্যাংক থেকে ভল্টের চাবি নিতে না পারলেও ব্যাংকে থাকা গ্রাহকের বেশ কিছু টাকা নিয়ে গেছে।
র্যাব মুখপাত্র জানান,কেএনএফ প্রথম দিনের হামলায় কোনো গাড়ি ব্যবহার করেনি। রাতের বেলা এসেছিল। প্রথম দিন বিদ্যুৎ না থাকায় কোনো ফুটেজ ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় দিনের হামলায় তারা চাঁদের গাড়ি ব্যবহার করেছে। এই দিনের বেশ কিছু ফুটেজ পাওয়া গেছে।
এখন যা করছে র্যাব:
এলিট ফোর্স র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান,তারা মূলত সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর সহযোগিতায় ব্যাংক ম্যানেজারকে অক্ষত ও নিরাপদে ফিরিয়ে দিতে চাই। এজন্য নানা কৌশলে কাজ করছে। ব্যাংক ম্যানেজারের সঙ্গে বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে তার পরিবার যোগাযোগ রাখছে। তিনি সুস্থ আছেন। সন্ত্রাসী সংগঠনটি পরিবারের কাছে মুক্তিপণ হিসেবে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা দাবি করেছে। আমরা ম্যানেজারের অবস্থান শনাক্তে কাজ করছি। একই সঙ্গে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করছি কীভাবে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যদের গ্রেফতারের অভিযান চলবে। পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ স্থানীয়দের দেখিয়ে ও গণমাধ্যমে প্রকাশ করে জড়িতদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। কারণ কুকি-চিন সম্প্রদায়ের কিছু লোক এই কাজ করছে।’
‘ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে পার্বত্য এলাকায় অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন। তাই অভিজ্ঞদের ছাড়া পাহাড়ে অভিযান চালানো দূরুহ। সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় র্যাব অপহৃত ব্যাংক কর্মকর্তা ও অস্ত্র উদ্ধারে কাজ করছে।’
শতাধিক লোক মিলে এমন হামলার ঘটনায় গোয়েন্দাদের ব্যর্থতা দেখছেন কি জানতে চাইলে র্যাব মুখপাত্র বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে অভিযান বা গোয়েন্দা কার্যক্রম চালানো কঠিন। আর যেহেতু শান্তি আলোচনা চলমান থাকার কারণে শান্তিপূর্ণ আলোচনার প্রক্রিয়াটা চলমান ছিল। আরেকটা বিষয় জঙ্গি অভিযান চলার সময়ে অনেকের বিষয় তথ্য ছিল বিভিন্নভবে তাদের সহযোগিতার অভিযোগ ছিল। কিন্তু শান্তি আলোচনা চলমান থাকায় আমরা চাচ্ছিলাম তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। কিন্তু তারা সেটি করেনি। আমাদের কাছে ব্যাংকে হামলার তথ্য ছিল না। কিন্তু তাদের টাকার প্রয়োজনের তথ্য ছিল। এই তথ্য আমরা বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সরবরাহ করেছি। জঙ্গি অভিযানেও আমরা বলেছি টাকার জন্য তারা জঙ্গিদের প্রশিক্ষণসহ নানা সহযোগিতা করেছে।
ব্যাংকে হামলার পাশাপাশি তারা পুলিশ ও আনসারদের ওপর হামলা চালিয়ে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছে। এছাড়া মসজিদ ও আশেপাশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনার পরে শান্তি আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। যা ইতোমধ্যে শান্তি কমিটি ঘোষণা করেছে। আমরাও এখন সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান চলমান রয়েছে যোগ করেন র্যাব মুখপাত্র।
ডিআই/এসকে