
বিকাশ বা নগদের এসআরদের সাথে তারা সখয়তা গড়ে তোলে। পরে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন নতুন এজেন্টদের নম্বরের তালিকা হাতিয়ে নেয় তারা। এরপর এসআর সেজে তারা নতুন কোনো এজেন্টের নম্বরে কল করেন। তাকে ফোনে বলা হতো আমি বিকাশ বা নগদের এসআর। আপনি তো শুধু টাকা পাঠান।
নতুন কিছু সেবা যুক্ত করে নিলে লাভ বেশি পাবেন। তাদের এমন কথা শুনে দোকানী এজেন্ট বলে ওঠেন ঠিক আছে তাহলে সেট করে দেন। এবার দোকানে সেই ব্যক্তিকে অবিশ্বাস করলে তারা বিকাশের এস আর এর সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। এরই মধ্যে এসআরের নম্বর ক্লোন করে সেই এজেন্টকে ফোন দেয়া হয়। ফোনে বলা হয় আমাদের সিনিয়র স্যার আপনাকে হয়তো ফোন দিয়েছিল আপনি তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন। এবার এজেন্ট দোকানীর বিশ্বাস জন্মে। পরে তাকে প্রতারক চক্রের সদস্যরা ফোন দিলে তারা যেভাবে তথ্য চায় সেভাবে তথ্য দেন। কিন্তু এরই মাঝে হাতিয়ে নেয়া হয় সেই বিকাশ এজেন্টের গোপন পিন নম্বর। তার বিকাশ একাউন্ট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পরবর্তীতে যত টাকা ঢুকে পড়ে তার সবটাই হাতিয়ে নেয় তারা।
চক্রটি কাজের জন্য প্রথমে পেইড এ্যাপসের মাধ্যমে নতুন বিকাশ বা নগদের এ্যাপস বানায়। এরপর চার ডিজিটের পাসওয়ার্ড দেন তারা। গত প্রায় বছর ধরে এ কাজ করে আসছিল চক্রটি। এই সময়ে তারা ৬০ থেকে ৭০ জন এজেন্টের নম্বর ক্লোন করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
মঙ্গলবার (২ এপ্রিল) ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা ও ফরিদপুর জেলায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়ে দুই চক্রের ৯ জনকে সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব-১০।
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থেকে সাধারন মানুষের বয়স্ক ভাতা,বিধবা ভাতা ও ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রধানের নামে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎকারী চক্রের মূল হোতা ইসমাইল মাতুব্বর (২১) ইব্রাহিম মাতুব্বর (২৭),মো.মানিক ওরফে মতিউর রহমান (১৯) ও মো.সিনবাদ হোসেন (২৪) কে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২২টি মোবাইল ফোন,৩৫টি সিম কার্ড,৫টি মোবাইলের চার্জার,০১টি ল্যাপটপ,১টি ব্যাগ ও নগদ- ৩০ হাজার হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় অভিযান চালিয়ে বিকাশ ও নগদ একাউন্ট হ্যাকড করে টাকা হাতিয়ে নেয়া চক্রটির চার জনকে গ্রেফতারকৃতরা হলেন-সুমন ইসলাম (২০), মাহমুদুল হাসান পলক (২০),সাব্বির খন্দকার (১৯), সাকিব (১৯) ও রাসেল তালুকদার (২৩)। এ সময় তাদের নিকট হতে ১৪টি মোবাইল ফোন, ৯১টি সিম কার্ড, ০১টি ব্যাগ,১০৪টি ইয়াবা ট্যাবলে ও নগদ-৫২,৫০০/- (বায়ান্ন হাজার পাঁচশত) টাকা উদ্ধার করা হয়।
বুধবার (৩ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের সব তথ্য জানান র্যাব-১০ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি ফরিদ উদ্দিন।
যেভাবে এজেন্টকে বোকা বানায় প্রতারকরা: তিনি জানান,গ্রেফতারকৃত সুমন ইসলাম মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ) ব্যবসায় অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে এজেন্টদের কাছ থেকে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে প্রতারিত করে অর্থ আত্মসাৎকারী চক্রটির মূল হোতা। তার নেতৃত্বে চক্রটি প্রায় ৮-৯ মাস ধরে বিভিন্ন বিকাশ/নগদ ব্যবসায়ী এজেন্টদের সাথে প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিল। তারা সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অবৈধ উপায়ে নতুন এজেন্টদের নাম্বার সংগ্রহ করতো। সুমন প্রথমে বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে বিকাশ/নগদের প্রতিনিধিদের নম্বর ক্লোন করে বিভিন্ন বিকাশ/নগদ এজেন্টদের ফোন দিয়ে নিজেকে বিকাশ/নগদের প্রতিনিধির পরিচয় দিতো। তারা প্রতিদিন গড়ে ২০ টা নাম্বারে কল দিতো। এরপর বিকাশ/নগদ এজেন্টদেরকে হাজারে ৪ টাকার পরিবর্তে ৮-১০ টাকা লাভ করার বিভিন্ন অফার সম্পর্কে অবহিত করতো। এক্ষেত্রে এজেন্টরা সেই অফার সম্পর্কে অবগত নয় বললে সুমন এজেন্টদের নিকট হতে বিকাশ/নগদের এসআরের ফোন নম্বর নিয়ে ক্লোন করে উক্ত নম্বর হতে এজেন্টদের ফোন করে সার্ভিস রিপ্রেজেনটেটিভের (এসআর) পরিচয় দিয়ে বলতো উনি আমাদের বস উনি যা বলেন সেভাবে কাজ করেন বলে ফোন কেটে দেয়।
তিনি আরো জানান,তারপর সুমন মোবাইলে ওটিপি প্রেরনের মাধ্যমে কৌশলে এজেন্টদের নিকট হতে বিকাশ/নগদের এজেন্ট নম্বরের পাসওয়ার্ডটি সঙ্কগ্রহ করতো। একইভাবে একাধিক ভিকটিমদের পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করে একটি মোবাইলে একাধিক বিকাশ/নগদ অ্যাপস ডাউনলোড করে এবং প্রত্যেকটি একাউন্টে লগইন করে রাখতো। সেই একাউন্টে কোন টাকা প্রবেশ করা মাত্র সুমন মোবাইলে নটিফিকেশনের মাধ্যমে তা জানতে পারে এবং সাথে সাথে উক্ত টাকা তার অন্যান্য সহযোগী মাহমুদুল, সাব্বির, সাকিব ও রাসেলের একাউন্টে স্থানান্তর করে। পরবর্তীতে রাসেল সেই টাকা তাদের আশপাশের বিভিন্ন এলাকা হতে ক্যাশআউট করে সুমনের কাছে নিয়ে আসে। এ টাকা তারা সবাই মিলে ভাগ করে নিত। এই চক্রটি ২ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৬০-৭০ জন বিকাশ/নগদ এজেন্ট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তারা সবাই স্বল্প সময়ে কোটিপতি হবার আশায় এবং মাদক সেবনের অর্থ যোগান দিতে এই প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।
ডিআই/এসকে