অতীতে পতিতা ব্যবসা, মাদকের ব্যবসায় তার নাম শোনা যেত ব্যাপকভাবে। খুলশী এলাকার হেনো অপরাধ নেই যেখানে তার নাম যুক্ত থাকতো না। নগর যুবলীগের পদে ছিলেন, তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বদান্যতাও পেতেন হরহামেশা-এমনটাই দাবি এলাকাবাসীর। হঠাৎ করেই যেন তার এসব অপরাধ নির্বিঘ্ন করার হাতিয়ার পেলেন তিনি। ব্যাপকভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও অজানা সুপারিশে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে তিনি পেয়ে যান ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন। হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্র দখল করতে স্ত্রী রোমানা চৌধুরীকে সাথে নিয়ে করেন গোলাগুলিও। এই গুলিতে এক যুবকের মৃত্যু হলে তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে করা হয় হত্যা মামলা। এরপরও থামেননি। নির্বাচিত হওয়ার পর ব্যস্ত সড়কে ও রেলের জায়গায় গড়ে তোলেন বাস, ট্রাক পরিবহন স্ট্যান্ড। প্রতি গাড়ি থেকে ২৪ ঘন্টার জন্য ২০০ টাকা করে চাঁদাবাজির জন্য গড়ে তোলেন আলাদা সিন্ডিকেট। এই অবৈধ স্ট্যান্ড ও সড়কে গাড়ি রাখার চাঁদাবাজি নিয়ে ঘটে আরো একটি হত্যাকাণ্ডসহ বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা। সেখানেও তার নাম আসে অতীতের মতোই।শুধু তাই-ই নয়, সর্বশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের দিন তিনি ও তার স্ত্রীর নেতৃত্বে পাহাড়তলী কলেজ কেন্দ্রে ব্যাপক হামলার ঘটনা ঘটে বলে গণমাধ্যমে উঠে আসে। অস্ত্রসহ তার এক সহযোগী পুলিশের হাতে ধরাও পড়ে। আলোচিত এই ঘটনায় এই কাউন্সিলর ও তার স্ত্রীর জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসে গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে।
বেপোরোয়া, অপ্রতিরোধ এই কাউন্সিলর হলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১৩নং পাহাড়তলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরী। তিনি আবার চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের কমিটিতে সহ-সভাপতিও।
এবার বহিরাগত ৫০-৬০ জন সন্ত্রাসীকে দিয়ে এলাকায় মিছিল করিয়ে তান্ডবের অভিযোগ তার দিকেই। গতকাল বুধবার (২৭ মার্চ) রাত আটটার পর খুলশী থানাধীন জালালাবাদ এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় বসবাসকারী চারটি পরিবারের ঘরে চালানো হয় তান্ডব ও লুটতরাজ। ২টি দোকানেও চালানো হয় ভাংচুর ও লুটপাট। ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভাড়া করা সন্ত্রাসীর দল ৪টি পরিবারের ঘর কুপিয়ে, দোকান ও ঘরের মালামাল ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এসময় ৩-৪ জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করে তারা। এই ঘটনাায় রাতেই ক্ষতিগ্রস্ত এক নারী ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরীকে প্রধান আসামি করে খুলশী থানায় মামলা করেন। যারা আহত হয়েছেন তারা সবাই চিকিৎসাধীন আছেন, তারাও পৃথক মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। মূলত এলাকায় নিজের আধিপত্য বিস্তার, স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মহিউদ্দিন বাচ্চুর সমর্থকদের কোণঠাসা করতেই একের পর এক অপরাধে জড়াচ্ছেন ওয়াসিম, এমনটাই দাবি স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, সরকারি জায়গা দখল, এমপি ও সাবেক কাউন্সিলরের সমর্থক লোকজনকে হামলা-মামলা দিয়ে হয়রানি এবং সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন সহিংসতা চালানোর মামলায় হওয়া সাক্ষীদের ভয়ভীতি ও হামলা করে সাক্ষী না দিতে তৎপর কাউন্সিলর ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরী- এমনটাই দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
ঘটনাস্থলের বাসিন্দা প্রত্যক্ষদর্শী এবং ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছেন, হামলার আগে কাউন্সিলর ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরীর কয়েকজন স্থানীয় সমর্থক বাইরে থেকে লেগুনা, অটোরিকশা ও রিকশায় করে ৫০-৬০ জনকে এলাকায় আনে। তারা মিছিল করে চট্টগ্রাম- ১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মহিউদ্দিন বাচ্চু, একই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও খুলশী থানা আওয়ামী লীগের আহবায়ক মোহাম্মদ হোসেন হিরণ ও তাদের অনুসারি মেরির বিরুদ্ধে। এসময় মিছিলকারীরা এমপি মহিউদ্দিন বাচ্চু, সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরণ ও নারীনেত্রী মেরি’র বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। এসময় কাউন্সিলর ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরীর প্রশংসাসূচক স্লোগানও দেন। মিছিলকারীরা হেলমেট, মাস্ক, মুখ ও মাথা কাপড় বেঁধে অংশ নেন এবং হামলা চালান।ক্ষতিগ্রস্ত রাবেয়া মুন্নী মেরি জানান, কয়দিন আগে সংসদ নির্বাচনের দিন পাহাড়তলী কলেজে কাউন্সিলর ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরী ভোটকেন্দ্রে ও বাইরে হামলা করছিল। অস্ত্রসহ তার লোক ধরা পড়ছিল। সেই মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমি স্বাক্ষী দিছি। আমিসহ যারা যারা স্বাক্ষী দিছে তাদের উপর হামলা চালাইতেছে। ধারালো কিরিচ নিয়ে বাড়িঘরে ওয়াসিম হামলা করাচ্ছে। বুধবারসহ এই নিয়ে মোট ৪ বার হামলা করছে। এলাকার ২০-২৫টা সিসি ক্যামেরা ওয়াসিম নিজে ভাঙছে। গতকাইল আমি ঘরে ছিলাম না। হেরা মিছিল সহকারে আসি আমার ঘর, অফিস, আশেপাশের কয়েকটা দোকান ভাঙচুর করছে। আমার ঘর ও অফিসের কিছু রাখে নাই। টিভি-ফ্রিজ, আসবাবপত্র ভাঙচুর করেছে। খাবারের প্লেটটাও আর নাই। আমার ঘরে টাকা-পয়সা যা ছিল সব নিয়ে গেছে। ভয়ে যারা দৌড়াদৌড়ি করে পালাইতেছিল তাদের কয়েকজনরে কুপাইছে। ঠ্যাং ভেঙ্গে দিছে। আমি রাতেই খুলশী থানায় ওয়াসিমকে ১ নম্বর আসামি করে মামলা করেছি।
ক্ষতিগ্রস্ত জামসেদ জানান, আমার সাথে তাদের কোনো বিরোধ নাই। আমার মোটরসাইকেলটা কুপিয়ে নষ্ট করে দিছে। কাউন্সিলর ওয়াসিম এখানে হিরন সাহেব, এমপি বাচ্চু সাহেবের কোনো অনুসারিকে থাকতে দিবেন না বলে হুমকি দিছে। অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে বাইরে থেকে লোক এনে বুধবার তান্ডব চালাইছে কমিশনার ওয়াসিম উদ্দিন। এতো খারাপ কমিশনার আমরা আগে দেখি নাই।
স্থানীয় অধিবাসী মো. নুরুল হক জানান, আমরা তারাবির নামাজে ছিলাম। যখন ৪ রাকাত নামাজ শেষ করি তখন বাইরে ব্যাপক শব্দ হচ্ছিল। হামলাকারীরা মসজিদের গেইটেও কয়েকদফা ধাক্কা দেয়। আমরা মসজিদের ভেতর থেকে দেখছিলাম ৫০-৬০ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হেলমেট পড়ে, কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে আমাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও দুইটি মোটরসাইকেল কোপাচ্ছে। সিসি ক্যামেরা ভেঙ্গে দিচ্ছে। তারা দোকানের টাকা ও জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে। এসময় তারা সাবেক পুলিম কর্মকর্তা আল্লাহবক্সের ভাড়াটিয়াসহ আমাদের কয়েকজনকে কুপিয়ে জখম করে, পা ভেঙ্গে দেয়। তিনি বলেন, এমপি সাহেব, হিরণ সাহেবের বিরুদ্ধে এবং কাউন্সিলর ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে তারা স্লোগান দিচ্ছিল। এতোবড় তান্ডব হলো এটা কি একজন জনপ্রতিনিধির করা উচিৎ। উনার সাথে এমপির বিরোধ আছে, সাবেক কাউন্সিলরের বিরোধ আছে সেটা তাদের ব্যাপার, এ জন্য সাধারণ মানুষের উপর এভাবে হামলা করতে পারেন? স্থানীয় বাসিন্দা সাবেক পুলিশ সুপার আল্লাহ বক্স জানান, গতকাল ২৭ মার্চ রাতে একটি পক্ষ এখানে ব্যাপক হামলা-ভাঙচুর চালায়। এতে আমার এক ভাড়াটিয়া দোকানদের ভাগিনা বা ছেলে কেউ আহত হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে আমি আর তেমন কিছু জানি না। স্থানীয় বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা সামসুদ্দোহা আলী জানান, বুধবার (২৭ মার্চ) রাতে কাউন্সিলর ওয়াসিমের লোকজন এখানে হামলা করেছে বলে শুনেছি। আমি অসুস্থ, এই বিষয়ে আর কিছু বলতে পারছি না। তবে এলাকার মানুষ খুব অতিষ্ঠ। এখানকার মানুষ এখন ভালো নাই।
অভিযুক্ত কাউন্সিলর ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমি কালকে সর্বক্ষণ বাসায় ছিলাম। কোথাও বের হইনি। আমি কোনো হামলা করিনি। সরকারি ১নং খাস খতিয়াতের জায়গা নিজের ভাইয়ের আমমোক্তারনামীয় জায়গা দাবি করে থানায় জিডি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা আমার বাপ-দাদার সম্পত্তি। আমার ভাই আমমোক্তারমূলে জায়গার মালিক। এটা সরকারি ছিল, ২৫ বছর আগে আমরা রায় পেয়েছি। বাপ-দাদার সম্পত্তি হলে আমমোক্তারনামীয় সম্পত্তি কেন হবে? বন্টন নামা কোথায়- এমন প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে যান। আরেক প্রশ্নের জবাবে ওয়াসিম উদ্দিন বলেন, আমি কোনো হামলা করিনি। এমপি মহিউদ্দিন বাচ্চু, সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরণ এলাকার জায়গা-জমি দখল করতেছে। এলাকায় আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করাচ্ছে। আমি হামলার সময় ঘটনাস্থলে ছিলাম না, সিসি ক্যামেরাও আমি ভাঙচুর করিনি।
এই বিষয়ে খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ নেয়ামত উল্লাহ জানান, বুধবার রাতে জালালাবাদ মুক্তিযোদ্ধা হাউজিং এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় থানায় রাবেয়া মুন্নী নামের একজন মহিলা মামলা করেছেন। আমরা হামলাকারী ২ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। বাকীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।