ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার হতদরিদ্র, ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের সন্তান আব্দুর রাজ্জাক (১৭) এখন পুলিশ কনস্টেবল। রাজ্জাক উপজেলার কালিকচ্ছ ইউনিয়নের মনিরবাগ এলাকার আব্দুর রাকিবের বড় ছেলে। চাকরিটি পেতে রাজ্জাকের খরচ হয়েছে মাত্র ১২০ টাকা। এত স্বল্প খরচে ঘুষ ছাড়া সোনার হরিণ খ্যাত পুলিশের চাকরি প্রাপ্তিতে হতবাগ রাজ্জাকের পরিবার ও স্বজনরা। তবে রাজ্জাক বলছেন, খেয়ে বাঁচি না। টাকা পাব কোথায়? শুধু মেধায় আমি আজ পুলিশ কনস্টেবল।আমার পিতা মাতার কাছে বিষয়টি স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে। পুলিশ সুপার মহোদয়ের নিখুঁত ব্যবস্থাপনায় শতভাগ স্বচ্ছতায় নিয়োগের প্রতিটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় এই অসম্ভব সম্ভব হয়েছে।
রাজ্জাকের পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজ্জাকের পিতা আব্দুর রাকিব শ্রমবিক্রি (রাজমিস্ত্রী) করেন। মা মাসুমা বেগম করেন সেলাইয়ের কাজ। রাজ্জাকরা দুই ভাই দুই বোন। রাজ্জাক সবার বড়। ছোট বোন ফাতেমাতুজ জুহুরা এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ভাই আব্দুর রহমান (০৬) ও বোন হুমায়রাতুজ্জুহি (০৩)। তাদের নিজেদের কোন জায়গা সম্পত্তি নেই। রাকিব পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন সরাইল উপজেলার কালিকচ্ছের মনিরবাগ শুশুড় উসমান গণির বাড়িতে। পুরনো একটি ঘরে স্ত্রী, ২ ছেলে, ২ মেয়ে ও প্যারালাইসিস রোগী শ্বশুড়-শ্বাশুড়িসহ মোট ৮ জন বসবাস করছেন।
অতিকষ্টে দিনকাটানো এই ঘরে রাত যাপন করতে হয় তাদের। রাকিব আর মাসুমার আয়ে চলে সংসার। এরপর দুই প্যারালাইসিস রোগীর ঔষধ। এত খরচ চালিয়েও সন্তানদের পড়া লেখা করাচ্ছেন রাকিব। নিজে রাজমিস্ত্রী দিনরাত হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করছেন। তাই রাকিবের স্বপ্ন ছেলে মেয়েদের বড় কিছু বানাতে হবে। পরিবারের সবার বড় ছেলে রাজ্জাককে সংসারের দুঃখ কষ্ট বুঝতে দিতেন না। প্রয়োজনে স্বামী স্ত্রী থাকতেন অর্ধাহার অনাহারে। কিন্তু সন্তানদের কখনো কষ্ট দিতেন না।
রাজ্জাক ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে সরাইল অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ গ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়। শত কষ্টের মাঝেও মুখ খুলে হাঁসেন পিতা রাজ্জাক। হাল ছাড়েননি তিনি। রাজ্জাককে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি করেন সরাইল সরকারি কলেজে। ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের এইচএসসি পরীক্ষায় সফলতার সাথে রাজ্জাক উত্তীর্ণ হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে চাকরির জন্য মাত্র ১২০ টাকা খরচ করে আবেদন করেন রাজ্জাক। ‘সেবার ব্রতে চাকরি’-এই স্লোগানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় শতভাগ মেধা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে নিয়োগ পরীক্ষার সকল ধাপ সম্পন্ন করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাখাওয়াৎ হোসেন। চুড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হয় গত ১৩ মার্চ বুধবার। জেলায় মোট ৭১ জনের চাকরি হয়েছে। এরমধ্যে ১১ জনই নারী। সরাইল উপজেলায় চাকরি হয়েছে ৫ জনের। নারী রয়েছে ২ জন। এই তালিকায় এসেছে আব্দুর রাজ্জাকের নাম। আনন্দে আত্মহারা রাজ্জাক ও তার পরিবার। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করায় দু’হাত তুলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য দোয়া করছেন রাজ্জাকের পিতা মাতা।
রাজ্জাকের পিতা আব্দুর রাকিব বলেন, ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েও যখন পুলিশে চাকরির নিশ্চয়তা মিলে না, সেই সময়ে আমি রাজমিস্ত্রীর ছেলের মাত্র ১২০ টাকা খরচ করে চাকরি পেয়েছে। টাকা বা এমপি-মন্ত্রীর তদবির নয়, নিশ্চয় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করেছেন পুলিশ সুপার মহোদয়। আমি পুলিশ সুপার ও সরকারের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
এই দিকে আব্দুর রাজ্জাকের নানা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশের হাবিলদার উসমান গণি আজ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন মাত্র ১২০ টাকা দিয়ে পুলিশের চাকরি হয়েছে। এমন স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চাকরি পাওয়ায় পুলিশ সুপারকে খুশিতে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে। সকল পুলিশ সদস্যদের জন্য দোয়া করেন তিনি।
সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এমরানুল ইসলাম বলেন, খুশির সংবাদ হচ্ছে আমাদের থানায় ৫ জনের চাকরি হয়েছে। জায়গা বাড়িঘর হীন অসহায় পরিবারের রাজ্জাকের চাকরিই প্রমাণ করে নিয়োগ প্রক্রিয়াটা কত স্বচ্ছ হয়েছে। তদবির নয়, প্রকৃত মেধাকে মূল্যায়ণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে পুলিশ বিভাগের সুনাম উচ্চে তুলে ধরায় পুলিশ সুপার স্যারের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।