নরসিংদী জেলার মাধবদী থানার দক্ষিণ বিরামপুরে চুরি করার সময় দেখে ফেলায় স্থানীয় মিষ্টি ব্যবসায়ী নির্মল দেবনাথ হত্যার ঘটনায় জড়িত ঘাতককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
সংস্থাটি বলছে, বাড়িতে কেউ না থাকায় নির্মলকে হত্যার বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াসা তৈরি হয়। ফলে ক্লুলেস মামলা হিসেবে হত্যায় জড়িত ঘাতককে গ্রেফতার করতে মাঠে নামে পিবিআই। ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর ঘাতক মাসুম বিল্লাকে গ্রেফতারের পরই খুলে যায় নির্মল হত্যার রহস্য।
গত ৬ মার্চ মাধবদী থানার অজোপাড়াগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা হয় হত্যায় ব্যবহৃত বটি ও চুরি করে নিয়ে যাওয়া মোবাইল।
রবিবার ( ১০ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআই সদর দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান নরসিংদী জেলার পিবিআই ইউনিটের ইনচার্জ পুলিশ সুপার (অতিঃ ডিআইজি পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত) মো.এনায়েত হোসেন মান্নান।
তিনি বলেন,নির্মল দেবনাথ (৪৩) পেশায় মিষ্টি কারিগর ও ব্যবসায়ী। তিনি মাধবদী থানার দক্ষিণ বিরামপুর এলাকার মৃত শ্রী রঞ্জিত দেবনাথ ছেলে। ঘটনার আগের দিন ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর নির্মলের স্ত্রী মনি দেবনাথ তার সন্তানদের নিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে তার বাবার বাড়িতে যান। পেশাগত কাজ শেষে রাতে নির্মল একাই বাড়িতে এসে ঘুমিয়ে যান। পরের দিন ১৫ নভেম্বর সকালে বাড়ি ফিরে নির্মলের স্ত্রী বাড়িতে ফিরে দেখেন প্রধান ফটক খোলা।
ঘরের আসবাবাপত্র ও কাপড় চোপড় এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। পাশের রুমের খাটের ওপর নির্মলের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান। কোনো মালামাল খোয়া না গেলেও নির্মলের ব্যবহৃত একটি বাটন ফোন চুরি হয়। এই ঘটনায় নিহতের ছেলে বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার এক মাস পর পুলিশ সদরদফতরের নির্দেশে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।
মোবাইলের সূত্রে খুলে গেলো হত্যার জট:
পিবিআই তদন্তে নেমে প্রথমে চুরি যাওয়া মোবাইলটি উদ্ধারের চেষ্টা করে। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে জানতে পারে নিহত নির্মলের মোবাইল ফোনটি ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর এলাকায় এক নারী মোবাইলটি ব্যবহার করছেন। পরবর্তীতে অভিযান চালিয়ে মোবাইলটি উদ্ধার করা হয়।
মোবাইলটির ব্যবহারকারী লাইলী নামের নারী তদন্তকর্মকর্তাদের জানিয়েছেন,মাধবদীতে একটি কর্মরত থাকা অবস্থায় তার প্রেমিক সাকিল এই মোবাইলটি তাকে উপহার দিয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে সাকিলকে নরসিংদী জেলার পলাশ থানা এলাকা থেকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সাকিল জানিয়েছে,রবিন নামের একজনের কাছ থেকে ২৫০ মোবাইলটি কিনে লাইলী দিয়েছে। সাকিল আটকের খবরে রবিন আত্মগোপনে চলে যায়।
পরবর্তীতে মাধবদী থানার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে রবিনকে আটক করা হয়। রবিনের তার ফুপাতো ভাই মাসুম বিল্লা মোবাইলটি বিক্রির জন্য দিয়েছি। এবার মাসুম বিল্লাকে গ্রেফতারে মাঠে নামেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। এ দিকে মামাতো ভাই রবিন আটকের খবরে গাঁ ঢাকাদেন মাসুম।
গ্রেফতার এড়াতে বারবার স্থান পরিবর্তন করতে থাকেন। পরবর্তীতে নরায়নগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। তবে বারবারই ফাঁকি দেন মাসুম। পরবর্তীতে মাধবদীতে নিজ এলাকা থেকে গ্রেফতার হয় মাসুম।
চুরি দেখে ফেলায় নির্মলকে কুপিয়ে হত্যা:
গ্রেফতার মাসুম পেশাদার চোর। তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। কারগার থেকে বের হলেই চুরি করেন তিনি। তেমনই চুরির উদ্দেশ্যে ১৫ নভেম্বর রাত সোয়া তিনটার দিকে নির্মল দেবনাথের বাড়িটি নিরিবিল দেখে টার্গেট করে। প্রথমে রান্নাঘরের ভেন্টিলেটার ও জানাল দিয়ে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়।
পরবর্তীতে বাসার ছাঁদে গিয়ে দরজা খোলা পেয়ে বাসার ভেতরে প্রবেশ করে। বাসায় ঢুকে বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য সংগ্রহ করে। এই সময়ে নিহত নির্মল ঘুমে ছিলেন। চুরির এক পর্যায়ে মাসুম নির্মলের মাথার বালিশের নিচে থাকা মোবাইল ও টাকার ব্যাগ নিতে যায়। এই সময়ে ঘুম ভেঙ্গে যায় নির্মলের। নির্মল চিৎকার দিলে পালানোর চেষ্টা করে। তবে বাড়ির প্রধান গেট বন্ধ থাকায় বের হতে পারেনি। পরবর্তীতে চোর মাসুমকে বটি দিয়ে কোপ দেওয়ার চেষ্টা করে নির্মল।
সেই বটি কেড়ে নিয়ে নির্মলকে নির্মমভাবে কুপিয়ে গেট খুলে পালিয়ে যায় মাসুম। পরবর্তীতে সেই ফোন বিক্রি করতে মামাতো ভাই রবিনকে দেয় ঘাতক মাসুম। গ্রেফতারের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে মাসুম। বর্তমানে সে কারাগারে রয়েছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- অতিরিক্ত পুলিশ
সুপার (সিআরও এন্ড মিডিয়া) আবু ইউসুফ (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত) এবং পিবিআই সদরদফতরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো.নাসিম মিয়া।
ডিআই/এসকে