
প্রেমের ফাঁদে ফেলে ভাড়া বাসায় ডেকে নিয়ে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- জুয়েল রানা (৩৭), মাহমুদ হাসান (৩৪), গোলাম রাব্বী (৩০), মাসুম সরকার (২৮), লাভলী (৩৭) ও সায়মা (১৮)।
শনিবার (৯ মার্চ) ঢাকার উত্তরা, উত্তরখান, ডেমরা ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার নবীরগর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে হ্যান্ডকাফ ও মুক্তিপণের ৬ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।
ডিবি জানায়, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি লিটন মিয়া (৪০) নামে এক ব্যবসায়ী কাপড় কিনতে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া থেকে ঢাকার ইসলামপুরে আসেন। বিকেল ৫ টার দিকে লিটন ইসলামপুরের ব্যবসায়ী আল মামুনকে ফোন করে জানায় তার জরুরী ভিত্তিতে ৪ লাখ টাকা প্রয়োজন। পরে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় কোতয়ালী থানায় দায়েরকৃত একটি মামলা তদন্তের ধারাবাহিকতায় চক্রের ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনার প্রায় ১০ দিন পর ডেমরার একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ভিকটিম লিটনকে।
গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে ডিবি জানায়, ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী জুয়েল রানা। ঘটনার দিন ভিকটিম বাড়ি ফেরার পথে ডেমরা এলাকায় তার পূর্ব পরিচিত লাভলীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে লাভলীর মেয়ে সায়মা তাকে স্টাফ কোয়াটার এলাকা থেকে রিসিভ করে বাসায় নিয়ে যান।
বাসার পৌঁছার পর জুয়েল রানার নেতৃত্বে ৪ জন মিলে ভিকটিমসহ লাভলী ও লাভলীর মেয়েকে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগে বেঁধে ফেলে। পরবর্তীতে অভিযুক্ত লাভলী ও লাভলীর মেয়ে সায়মাকে ছেড়ে দিয়ে ভিকটিম লিটন মিয়াকে ওই বাসায় জিম্মি করে রাখে।
লাভলী ও লাভলীর মেয়ে সায়মা একই চক্রের সদস্য উল্লেখ করে ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, লাভলীর কাজ ছিল ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের প্রেমের ফাদে ফেলে ঢাকার কোন একটি বাসায় নিয়ে আসা। চত্রের হোতা জুয়েল লাভলীর মেয়ে সায়মাকে নিজের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া করেন।
এই কাজের জন্য জুয়েল রানা বেশ কিছু রেজিস্ট্রেশন বিহীন সিম তার শ্বশুরের মোবাইলের দোকান থেকে সংগ্রহ করেন। একটি সিম লাভলীকে দেন ভিকটিমের সঙ্গে কথা বলার জন্য। লাভলী ঘটনার বেশ কিছু দিন আগে থেকে ওই সিম দিয়ে ভিকটিম লিটনের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন। এই সূত্রে নির্ধারিত দিনে ভিকটিম লাভলীর সঙ্গে দেখা করতে ডেমরায় যান।
তিনি আরও বলেন, ভিকটিমকে জিম্মি করার পর জুয়েল রানা ভিকটিম এবং লাভলীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন দুটি আড়াইহাজার এলাকায় ফেলে দিয়ে আসেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পুলিশ যেন বুঝতে পারে ভিকটিম আড়াইহাজার এলাকা থেকে অপহৃত হয়েছেন। পরবর্তীতে ফোন দুটি স্থানীয় একজন ব্যক্তি কুড়িয়ে পেয়ে ব্যবহার করলে পুলিশ তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিষয়টি বুঝতে পারে।
পরে জুয়েল রানা অ্যাপস ব্যবহার করে ভিকটিমের মোবাইল নম্বর ক্লোন করে ভিকটিমের ভগ্নিপতি মহসিনকে ফোন করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং ক্রিপ্টো কারেন্সির একটি অ্যাকাউন্টে ডলারের মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা দিতে বলে। পরবর্তীতে ভিকটিমের পরিবার আরিফ নামে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আট হাজার ডলারের সমপরিমাণ ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ হিসেবে প্রদান করেন।
ডিবি প্রধান বলেন, জুয়েল রানা ৪ লাখ টাকার সমপরিমাণ ডলার দুবাই অবস্থানরত মোহাম্মদ আলী রিফাতকে ক্রিস্টো কারেন্সির মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়, যিনি এ চক্রের সদস্য। বাকি ৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ ডলার সে বিক্রি করে তার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে এবং গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে এই টাকা উদ্ধার করা হয়।
মূল হোতা জুয়েল রানার বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, অস্ত্র, অপহরণ, পর্ণোগ্রাফি ও মাদক সহ প্রায় দুই ডজন মামলা রয়েছে। এই মূহুর্তে তার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র নবীনগর থানাতেই ৫ টি ওয়ারেন্ট রয়েছে।
গত জানুয়ারিতে ঢাকার দক্ষিণখান এলাকায় এমনই একটি ঘটনা ঘটিয়ে মুক্তিপণ হিসেবে ১৬ লাখ টাকা নেয়। তারও মাস দুয়েক আগে নবীনগরের ফারুক নামে এক ব্যক্তির ছেলেকে আটক করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে বলে জানা যায়।
ডিআই/এসকে