
ডেস্ক রিপোর্ট :
প্রতীকে উপজেলা নির্বাচন শুরু করে যে সংকটের মুখে পড়েছে আওয়ামী লীগ, প্রতীক ছাড়া নির্বাচনও ক্ষমতাসীন দলটিকে নানা সংকটে ফেলবে। সরকারি দলের একাধিক কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের দায়িত্বশীল নেতা বলেন, যখন থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করা শুরু হয়েছে মূলত তখন থেকেই সংকট দানা বেঁধেছে। সেটা কাটিয়ে না উঠতেই আবার আগের পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ায় সংকট না কমে বরং ঘনীভূত হবে। জেলা পর্যায়ের নেতারা বলছেন, উপজেলা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ার ঘোষণায় দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মধ্যে নেতিবাচক অনুভূতির কথা শোনা যাচ্ছে।আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য বলেন, দলীয় প্রতীকে উপজেলা নির্বাচন দলের জন্য ‘উপজ্বালা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এখন প্রতীক ছাড়া উপজেলা নির্বাচন করার সিদ্ধান্তও একই ‘উপজ্বালার’ মুখোমুখি ফেলে দেবে দলকে। তিনি বলেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন আওয়ামী লীগকে প্রথমে ভীষণ বিপাকে ফেলে দিলেও যখন মানিয়ে নিতে শুরু করেছে তখন আগের নিয়মে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নানা রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করবে। খবর দেশ রুপান্তর।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার আইন আওয়ামী লীগের ভেতরেই কিছু সংকট সৃষ্টি করেছে। এখন প্রতীক ছাড়া নির্বাচন করলে সংকট কেটে যাবে তা নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। জেলার আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক দিয়ে নির্বাচন ঠিক হয়নি। এতে তৃণমূলের রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভেদ-বিরোধ অনেকাংশে বাড়িয়ে তুলেছে। যাই হোক, যখন দেওয়াই হয়েছে দিয়ে আবার এখন দেব না, এটাও ঠিক হয়নি।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে মনোনয়নের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের। এতে করে মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মীরা বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। উপজেলা নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই বিরোধ মেটাতে দলের সর্বস্তরের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ঢাকা ডেকে পাঠান দলীয় সভাপতি।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপজেলা নির্বাচন উন্মুক্ত রাখার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে সাধারণ মানুষের জন্য কারা কতটুকু কাজ করেছেন, কারা করতে পারেননি সেটা যাচাই হয়ে যাবে। জনগণের কাছে কার গ্রহণযোগ্যতা কতটা সেটাই এবার দেখবেন তিনি। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, শুধুমাত্র আওয়ামী লীগে বিভেদ-বিরোধ নয়, অনুপ্রবেশের সুযোগও করে দিয়েছে প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। অনুপ্রবেশ বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং ঘটেছে ২০১৪ সাল থেকেই। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজনীতি করেননি কিন্তু দলীয় সংসদ সদস্যের আশীর্বাদপুষ্ট বলে মনোনয়ন পেয়ে যাচ্ছেন। এই অনিয়মের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরাও জড়িয়ে যান আর্থিক সুবিধা নিয়ে। অর্থের বিনিময়ে মনোনয়নের কারণে ত্যাগী, আদর্শিক ও মাঠঘাট চষে বেড়ানো নেতা বঞ্চিত হয়েছেন। এতে করে মাঠ কাঁপানো অনেক নেতার নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। প্রতীক ছাড়া উপজেলা নির্বাচন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিয়ে দলের বড় অংশ ব্যস্ত থাকায় সংগঠন দুর্বল হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের বড় একটি অংশ প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি করতে গিয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। এই অংশটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে বছরের পর বছর সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকতেন। নেতারা বলেন, নেতাকর্মী-সমর্থকদের বড় অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ায় সামাজিক কর্মকা-ে যুক্ত থাকা আওয়ামী লীগ নেতার সংখ্যাও কমে গেছে। তবে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিতে এসব ব্যাপার না থাকায় ওইসব দলে নির্বাচন-কেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব-কোন্দল-অসন্তোষ সৃষ্টি হয়নি। এসব দিক থেকে পর্যালোচনা করলে প্রতীক ছাড়া নির্বাচনও আওয়ামী লীগকে ‘উপজ্বালার’ মুখোমুখি করবে। এবারের স্থানীয় নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি বিজয়ের হার অনেক কমে যাবে। তাছাড়া দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে গ্রামে-গঞ্জে আওয়ামী লীগ বিরোধী মানুষের মধ্যে মনোভাব তৈরি হয়েছে। তাই পদ-পদবি নেই, সাধারণ সমর্থক পরিচয় থাকা আওয়ামী লীগের কেউ স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হলেও জয়ী হয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়বে।আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের এখন যে অবস্থা তাতে সব স্তরেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে জামায়াতের নেতাকর্মী বা তাদের সমর্থিত প্রার্থী এগিয়ে থাকবে। তারপরেই থাকবেন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। গত ১৫ বছর শহরকেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা পিছিয়ে থাকলেও গ্রামে-গঞ্জে ও মফস্বল শহরে ওই দুটি দলের নেতাকর্মীরা সশরীরে উপস্থিত থেকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে, সময় দিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছেন।
উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে ‘উপজ্বালার’ আশঙ্কার কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের আইন মূলত ওলট-পালট করে দিয়েছে তৃণমূলের রাজনীতি। প্রতীকে নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে তার বিরূপ প্রভাব তৃণমূল আওয়ামী লীগকে কোন্দলের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এতে করে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। দলকে দুর্বল করেছে। লাভের বেলায় একটাই হয়েছে স্থানীয় সরকারের ভোটে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই। মাঠের বিরোধী দল বিএনপি ভোট বর্জন করায় প্রতীক পেলেই জয় পাওয়া সহজ হয়েছে। তিনি বলেন, এবার প্রতীকে নির্বাচন না করার দলীয় সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয় কঠিন হয়ে যাবে। দিনাজপুর জেলার এক নেতা বলেন, নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে প্রতীক না দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দলীয় রাজনৈতিক কৌশলও রয়েছে এখানে। দলের বাইরের মানুষকে সম্পৃক্ত (নির্বাচন) করার জন্য যে কৌশল দল নিয়েছে তাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।’ তিনি বলেন, আবার পুরনো নিয়মে ফেরায় সংকট কমে যাবে, তা কিন্তু নয়। আবার নতুন সংকট দেখা দেবে।