
মু. রিয়াজুল ইসলাম লিটন, সিনিয়র রিপোর্টার
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যৌন হয়রানিসহ নানা অনিয়ম নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা ও প্রতিকার করতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেল গঠনের কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
ধর্ষণ কান্ড, যৌন হয়রানি, যৌন কেলেঙ্কারিতে উত্তপ্ত দেশের শীর্ষ চার বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন চলছে অস্থিরতা।
এসব যৌন হয়রানি ও কেলেঙ্কারির ঘটনায় উত্তপ্ত, সরব প্রতিবাদ হচ্ছে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ইউজিসির প্রফেসর আলমগীর বলেন, ক্যাম্পাসে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ হলেই কেবল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়, শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছেন এক ছাত্রী। এ ঘটনার বিচার দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামীকে আটকে রেখে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এরই প্রেক্ষিতে ওইদিন রাত থেকেই বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে শাস্তি চেয়ে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় :
শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক শিক্ষক নাদির জুনায়েদকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আবুল মনসুরের কাছে রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে আসা চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়। যেখানে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ তাকে সবধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নিমিত্তে ৩ মাসের ছুটিতে থাকবেন নাদির জুনায়েদ। চিঠিতে পরবর্তী সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাপক নাদির জুনায়েদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠনসহ অন্যান্য পদক্ষেপ নেয়ার কথাও জানানো হয়। গত ১০ই ফেব্রুয়ারি নাদির জুনায়েদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ আনেন বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী। দেড় বছর ধরে এই শিক্ষকের দ্বারা যৌন হয়রানির স্বীকার হয়েছেন বলে ওই শিক্ষার্থী প্রক্টর বরাবর দেয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন। এরপরই এই শিক্ষকের বিচারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন ব্যাপক আন্দোলন বিক্ষোভে নামে। মানববন্ধন, মশাল মিছিল, অভিযুক্ত শিক্ষকের রুমে তালা দেয়ার পর সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা তার শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। ওই শিক্ষকের শাস্তির দাবিতে ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে বিভাগের সামনে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। তারা নাদির জুনায়েদের কক্ষ ও বিভাগের ৪টি কক্ষে তালা দিয়ে ভিসি কার্যালয়ের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সময় তারা ভিসি অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামালকে তিনদফা দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি দেন। সেখানে তাদের অবস্থানের মুখেই অধ্যাপক নাদিরকে ৩ মাসের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাদির জুনায়েদ। যৌন হয়রানির অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘উদ্দেশ্যমূলক’ বলেও দাবি করেছেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ দফা দাবিতে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলে স্বামীকে আটকে রেখে তার স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমানসহ ৪ জনকে আটক করে পুলিশ। গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সংলগ্ন জঙ্গলে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘবদ্ধ গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ মাদকের সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়াসহ পাঁচদফা দাবিতে আন্দোলন করছেন। গতকাল নতুন প্রশাসনিক ভবন প্রতীকী অবরোধ করা হয়। সকাল ৯টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্লাটফর্ম ‘নিপীড়ন বিরোধী মঞ্চ’-এর ব্যানার থেকে এ অবরোধ করা হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়:
গত ৩১শে জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ভাইস চ্যান্সেলর বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের এক শিক্ষার্থী একই বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মাহবুবুল মতিনের বিরুদ্ধে। এতে তিনি লেখেন, থিসিস চলাকালীন আমার সুপারভাইজার কর্তৃক যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হই। থিসিস শুরুর পর থেকে তিনি আমার সঙ্গে বিভিন্ন যৌন হয়রানিমূলক; যেমন- জোর করে হাত চেপে ধরা, শরীরের বিভিন্ন অংশে স্পর্শ করা, অসঙ্গত ও অনুপযুক্ত শব্দের ব্যবহার করা। কেমিক্যাল আনাসহ আরও বিভিন্ন বাহানায় তিনি আমাকে তার রুমে ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক জাপটে ধরতেন। এরমধ্যে গত ১৩ই জানুয়ারি আনুমানিক ১২টা নাগাদ কেমিক্যাল দেয়ার কথা বলে রুমে ডেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এমতাবস্থায় তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তার পক্ষে দৈনন্দিন ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার এই অভিযোগ ওঠার পর এর প্রতিবাদে লাগাতার আন্দোলন করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিচারের দাবিতে গত ৩১শে জানুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা। অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের স্থায়ী বহিষ্কার না করা পর্যন্ত এ আন্দোলন চলমান থাকবে বলে জানান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আশ্বাস দিলেও মাঠে থেকেই বিচার নিশ্চিত করতে চান তারা। আন্দোলনের বিষয়ে রসায়ন বিভাগের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী রেজাউল করিম বলেন, আমরা ওই শিক্ষকের স্থায়ী বহিষ্কারের জন্য ৯ দিনের মতো আন্দোলন করছি। আমাদের বোনকে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণচেষ্টার মতো জঘন্য ব্যক্তিকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে যাতে এরকম নিকৃষ্ট কাজ কেউ করার চিন্তাও মাথায় না আনে। বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা ক্লাসে ফিরবো না। তাকে যদি শাস্তি না দেয়া হয় আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে যাবো।এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করেছে। কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. জরিন আখতার। এ বিষয়ে চবি ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. শিরীন আখতার বলেন, তদন্ত কমিটি এ ঘটনায় দিনরাত কাজ করছে। তদন্ত কমিটি প্রতিনিয়ত বৈঠক করে যাচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও তাদের তদন্ত চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর শ্লীলতাহানি:
সূত্রে জানা গেছে , গত ৯ই ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল জব্বারের মোড় হতে শাহজালাল পশুপুষ্টি মাঠ গবেষণাগার সংলগ্ন রাস্তায় শ্লীলতাহানির শিকার হন পশুপালন অনুষদের এক নারী শিক্ষার্থী। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এক সিএনজি চালক পেছন থেকে এসে অশালীনভাবে ওই নারী শিক্ষার্থীর গায়ে হাত দেয়। সেই সময়, তার সিএনজিতে কোনো যাত্রী ছিল না। পরবর্তীতে, সেই সিএনজিচালককে ধরতে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। পরদিন শ্লীলতাহানির বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন পশুপালন অনুষদের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ সময় প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করে গালিগালাজ করে। এর প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ পত্র জমা দেন। ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির দু’দিনের মধ্যেই শ্লীলতাহানিকারী সিএনজিচালক মো. মোশারফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানা পুলিশ। গতকাল দুপুরের দিকে ময়মনসিংহের পাটগুদাম এলাকা থেকে অভিযুক্তকে আটক করা হয়। সে নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা থানার নাটেরকোনা গ্রামের বাসিন্দা। অভিযুক্তকে আটকের পরই বাকৃবি ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে আলোচনা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা পুনরায় স্ব স্ব পদে কাজ শুরু করেছেন। এ বিষয়ে থানার ওসি মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের বিষয়টি জানার পরই আমাদের সকল বিভাগকে অবহিত করে। সকলের সহযোগিতায় আমরা দ্রুত সময়ে ময়মনসিংহের পাটগুদাম এলাকা থেকে অভিযুক্তকারীকে আটক করতে সক্ষম হয়েছি। এখন মামলার প্রস্তুতি চলছে। পরে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জাবিতে ধর্ষণের দায় এড়াতে পারে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ: র্যাব
র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামীকে আটকে রেখে এক নারীকে ধর্ষণের ঘটনার দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। কারণ বিভিন্ন সময় মাদক, ধর্ষণসহ নানা অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বহিরাগতদের প্রবেশের দায় কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।’ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এলিট ফোর্সটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এ কথা বলেন তিনি বলেন, সম্প্রতি ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী বিষয়টি খুবই এলার্মিং (বিপজ্জনক)। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এখনই আরও কঠোর হতে হবে। কারণ আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি, ক্যাম্পাসে মাদকসহ নানা অবৈধ কাজ ঘটে। এসব ঘটনা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয় রয়েছে। তারা যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, সহযোগিতা চান, আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করব। আমরা দেশের ভবিষ্যত সম্পদ, জাতির আগামী দিনের ভবিষ্যতকে এভাবে নষ্ট হতে দিতে পারি না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মঈন বলেন, শিক্ষার্থীদের অপরাধে জড়ানোর বিষয়ে আগেই সতর্ক হওয়া দরকার ছিল। আমরা সবাইকে খারাপ বলব না। কারণ যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তারাই তো আগামী দিনে দেশ পরিচালনা করবে। তাই আমরা মনে করি, শুধু এখনই নয়, সব সময় তাদের নজরদারিতে রাখা উচিত। কারণ শিক্ষার্থীদের বয়স অনেক কম। মামুনের মতো লোকেরাই নিজেদের স্বার্থে, নিজেরাই অপকর্ম করার জন্য শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে। কোমলমতি শিক্ষার্থী যারা আছে তাদের এমন করে বিপথে নেওয়ার দায়-দায়িত্ব আমাদের সকল স্টেকহোল্ডারদের নিতে হবে। অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমকেও এর দায় নিতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের ঘটনায় নাগরিকের উদ্বেগ:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৩ ফেব্রুয়ারি ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন নাগরিকরা। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘আমরা এ ঘটনায় হতবাক ও ক্ষুব্ধ। সাম্প্রতিক ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখ করে বিবৃতিতে তারা বলেছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোপূর্বে এমন আরও ঘটনা ঘটেছে। কোনো ধর্ষণের ঘটনায় কোনো রকম তদন্ত বা সুরাহা কর্তৃপক্ষ করেনি। বিশাল এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা আনার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নেয়নি। এই সুযোগে উচ্ছৃঙ্খল কতিপয় ছাত্র এই ধরণের অমানবিক ঘটনা ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে। এতে বলা হয়, ‘এই ধর্ষক ছাত্রদের যে কথিত রাজনৈতিক পরিচয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, তা আমাদের শঙ্কিত করে তুলেছে। আজকের যে ছাত্র সে আগামী দিনের রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব প্রাপ্ত হবে। সেই ছাত্রদের যদি এই নৈতিক অধঃপতন হয়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চরম উদ্বিগ্ন।বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমরা দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলতে চাই যে বাংলাদেশে এ হীনকর্ম জনগণের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। আমরা সরকারের কাছে এই জঘন্য অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার চাই। সেইসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা ও শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা আশা করি বাংলাদেশের কোথাও আর কোনো নারীকে ধর্ষণ করা হবে না।’
জাবি প্রশাসনের ব্যর্থতায় যৌন নিপীড়ন বন্ধ হয়নি, ইউজিসি:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামীকে হলে আটকে স্ত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর ইউজিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর বলেছেন, কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় সেখানে যৌন নিপীড়নসহ অন্যান্য অনিয়ম বন্ধ হয়নি। ইউজিসির এক কর্মশালায় তিনি এ মন্তব্য করেন বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, সম্প্রতি রাতে স্বামীকে মীর মোশাররফ হোসেন হলে আটকে রেখে এক গৃহবধূকে দলবেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের এক নেতা এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। ফিরে আসে আড়াই দশক আগে ‘ধর্ষণের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ আন্দোলনের স্মৃতি।
১৯৯৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দীন মানিকের বিরুদ্ধে ‘ধর্ষণের সেঞ্চুরির’ অভিযোগ উঠেছিল। পরে ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে মানিক ও তার সহযোগীরা ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়। সেই ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তোলে। অধ্যাপক আলমগীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যৌন হয়রানিসহ নানা অপকর্মে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া এসব অপরাধের বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও অপরাধীদের প্রশ্রয়ের কারণে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি ঘটনা রোধ করা সম্ভব হয়নি। উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ইউজিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বলেন, ক্যাম্পাসে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ হলেই কেবল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরি, শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ এবং শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়।
অধ্যাপক আলমগীর বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ ঘটনা আমাদের মর্মাহত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনা ঘটছে, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত না করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে এবং অছাত্ররা দিনের পর দিন কীভাবে হলে থাকছেন সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে তিনি মনে করেন। ইউজিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলমগীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানিসহ অনিয়মের অভিযোগ পর্যালোচনা ও প্রতিকারে পদক্ষেপ গ্রহণে ইউজিসি শিগগিরই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সেল গঠন করবে। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটলে এই সেল তদারকি করবে এবং তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দলবেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ইউজিসি। ইউজিসি গঠিত কমিটির সদস্যরা বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। ইউজিসি জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর কী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং কেন এমন ঘটনা ঘটছে তা খতিয়ে দেখবে এই কমিটি।