
মু. রিয়াজুল ইসলাম লিটন, সিনিয়র রিপোর্টার
দেশে গত এক বছরে চোরাপথে আসা ৭০০ কেজি ৯২৮ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে কোকেন জব্দ করা হয়েছে ১৩ কেজির বেশি। গতকাল বৃহস্পতিবার আট কেজি ৩০০ গ্রাম কোকেনসহ এক বিদেশিকে আটক করা হয়েছে। জব্দ হওয়া এই হেরোইন ও কোকেনের আনুমানিক বাজারদর এক হাজার কোটি টাকার বেশি বলে কালের কন্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে।
গত এক বছরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও কোস্ট গার্ডের জব্দ করা তালিকা বিশ্লেষণ করে এই তথ্য জানা গেছে। তালিকাটি সমন্বয় করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। চোরাপথে আসা বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের মধ্যে হেরোইনের পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। ২০১৬ সাল থেকে হেরোইন আসার পরিমাণ বাড়তে থাকে। গত ১৫ বছরের মধ্যে ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি হেরোইন জব্দ করা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দুজন কর্মকর্তা জানান, জব্দ হওয়া প্রতি কেজি হেরোইনের মূল্য কমবেশি এক কোটি টাকা। সে হিসাবে গত বছর জব্দ হওয়া ৭০০ কেজি হেরোইনের দাম ৭০০ কোটি টাকা।
গতকাল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জব্দ হওয়া আট কেজি ৩০০ গ্রাম কোকেনের মূল্য ১০০ কোটি টাকার বেশি বলে জানান মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তানভীর মমতাজ। এই বাজারদর অনুযায়ী, গত বছর জব্দ হওয়া ১৩ কেজি কোকেনের দাম আনুমানিক ২০০ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারে হেরোইনের উৎস আফিম চাষ বেড়ে যাওয়ায় এই নেশার দ্রব্য সীমান্ত পথে অবৈধভাবে বাংলাদেশে আসছে। এটি এখন দেশের তরুণ ও যুব সম্প্রদায়ের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ সায়েন্স অ্যান্ড ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, হেরোইন ও কোকেন যা জব্দ হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি দেশে আসছে। উচ্চমূল্যের এই মাদকের পাচার রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স থাকলেও দিন দিন এর ছোবল বাড়ছে। এই জায়গায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও কিছু বেসরকারি সংস্থার আরো গুরুত্ব দেওয়া উচিত। জব্দ হওয়া মাদকদ্রব্যের তালিকা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিগত ১৫ বছরে সারা দেশে চার হাজার ২৫ কেজি ৪৭৮ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়। এর মধ্যে গত বছর ৭০০ কেজি ৯৮০ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে ৩৩৮ কেজি ২২১ গ্রাম জব্দ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ছাড়া ২০২১ সালে ৪৪১ কেজি, ২০২০ সালে ২১০ কেজি, ২০১৯ সালে ৩২৩ কেজি, ২০১৮ সালে (বিশেষ অভিযানের বছর) ৪৫১ কেজি, ২০১৭ সালে ৪০১ কেজি, ২০১৬ সালে ২৬৬ কেজি, ২০১৫ সালে ১০৭ কেজি, ২০১৪ সালে ৭৮ কেজি, ২০১৩ সালে ১২৩ কেজি, ২০১২ সালে ১২৬ কেজি, ২০১১ সালে ১০৭ কেজি, ২০১০ সালে ১৮৮ কেজি ও ২০০৯ সালে ১৫৯ কেজি জব্দ করা হয়।
গত বছর কোকেন জব্দ করা হয় ১৩ কেজির বেশি, যা ২০২২ সালে ছিল প্রায় সাড়ে চার কেজি। ২০২৩ সালে চার কোটি ২৯ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়, যা ২০২২ সালে ছিল চার কোটি ৫৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬৯ পিস। একইভাবে ২০২৩ সালে আগের বছরের তুলনায় গাঁজা, আফিম ও ফেনসিডিল জব্দের পরিমাণ কমেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩০ ধরনের মাদকদ্রব্য বেচাকেনা হয়। এর মধ্যে ইয়াবা, আইস, হেরোইন ও গাঁজা বেশি সেবন হচ্ছে।
ডিএনসির সমন্বিত তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ৯৭ হাজার ২৪১টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার আসামি ১২ লাখ ২৮৭ জন।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, গত বছর যে পরিমাণ হেরোইন জব্দ করা হয়েছে, তা গত ১৫ বছরের যেকোনো সময়ে চেয়ে দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড গোয়েন্দা) তানভীর মমতাজ কালের কণ্ঠকে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বেশি দৃষ্টি ছিল ইয়াবা ও আইসে। এর মধ্যে হঠাৎ হেরোইন আসা বেড়ে গেছে। অন্যান্য মাদকদ্রব্যের সঙ্গে হেরোইন জব্দ করতে অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে মিয়ানমার বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আফিম উৎপাদনকারী দেশ হয়েছে। ২০২২ সালে নিষেধাজ্ঞার পর আফগানিস্তানে আফিম চাষ ৯৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে মিয়ানমারে আফিম উৎপাদন বেড়েছে। সেখান থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে। এভাবে নিষিদ্ধ এই মাদকদ্রব্য মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসছে।
গত বছর ভারত থেকে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের সময় হেরোইনের বেশির ভাগ চালান আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, সিলেটসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকার মাদক ব্যবসায়ীরা বেশির ভাগ হেরোইন আনছেন। এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে হেরোইন আনার ক্ষেত্রে ভারতের ত্রিপুরা হয়ে সিলেটের জকিগঞ্জ নিরাপদ রুট হয়ে উঠেছে।
ডিএনসি একাধিক কর্মকর্তার মতে, মাদকপাচারের বিষয়টি বেলুনের মতো। এক দিক দিয়ে কমলে অন্য দিক দিয়ে বাড়ে। হেরোইন চালান আসা বেড়েছে। গত বছর এই মাদকদ্রব্য যে পরিমাণ জব্দ হয়েছে, এতে বলা যায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
ডিএনসির প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, হেরোইন বেশ ক্ষতিকর। এর আসক্তিতে এক পর্যায়ে ঝিমুনি ও খিঁচুনি দেখা দেয়। চোখ বসে যায়। ওজন কমতে থাকে। এটি ফুসফুস, লিভার, কিডনি শেষ করে দেয়। এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।’
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের সম্ভাব্য গতিবিধির ওপর সব সময় র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। এতে বিভিন্ন অপকৌশল করেও মাদক ব্যবসায়ীরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন।