
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে অগ্নিকান্ডের ঘটনাগুলোর মূল পরিকল্পনাকারী ও সরাসরি অংশগ্রহণকারী আরসার গান গ্রুপের ৩ সদস্যকে ২২টি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছে র্যাপিড এ্যকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-১৫)।
বৃহস্পতিবার(২৫ জানুয়ারি)সন্ধায় র্যাব সদর দফতরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এক সংবাদ বিঞ্জপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন, উসমান প্রকাশ মগবাগি উসমান (৩০),মো. নেছার (৩৩) এবং ইমাম হোসেন (২২)।
খন্দকার আল মঈন বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে অগ্নিকান্ডের ঘটনাগুলোর মূল পরিকল্পনাকারী ও সরাসরি অংশগ্রহণকারী আরসার গান গ্রুপ কমান্ডার উসমান প্রকাশ মগবাগি উসমান এবং তার ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগী গান গ্রুপের সক্রিয় সদস্য মো. নেছার ও ইমাম হোসেনকে কক্সবাজার উখিয়ার শরনার্থী রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২০ এক্সটেনশনের অদূরে লাল পাহাড় থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় ২২টি দেশীয় তৈরী আগ্নেয়াস্ত্র, শতাধিক তাজা গুলি এবং চারটি হাতে তৈরী ককটেল বোমা উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মূর্তিমান আতঙ্কের নাম আরসা’র সন্ত্রাসীগোষ্ঠি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ হত্যা, অপহরণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত রয়েছে আরসা’র সন্ত্রাসীগোষ্ঠি।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ হত্যা, অপহরণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত রয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি রাত অনুমান ১টার সময় উখিয়ার ৫নং ক্যাম্পের সাব ব্লক এ/৮ এ ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় হাজারের অধিক বসতি পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে অন্তত শতাধিক ঘর। এরপর মাত্র ৫ দিনের ব্যবধানে গত ১১ জানুয়ারি ফের মধ্যরাতে উখিয়ার কুতুপালং ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি বসতি পুড়ে যায়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সৃষ্ট এই ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে গোয়েন্দা নজরদারী ও তৎপরতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করে র্যাব-১৫।
কমান্ডার বলেন, র্যাব-১৫ এর একটি চৌকস আভিযানিক দল বিশেষ নজরদারী এবং রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আজ কক্সবাজার উখিয়ার শরনার্থী রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২০ এক্সটেনশন এর অদূরে লাল পাহাড়ে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে অগ্নিকান্ডের ঘটনাগুলোর মূল পরিকল্পনাকারী ও সরাসরি অংশগ্রহণকারী আরসার গান গ্রুপ কমান্ডার উসমান প্রকাশ মগবাগি উসমান এবং তার ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগী গান গ্রুপের সক্রিয় সদস্য মোঃ নেছার ও ঈমান হোসেনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। উদ্ধার করা হয় ২২টি আগ্নেয়াস্ত্র, শতাধিক তাজা গুলি এবং ৪টি হাতে তৈরী হাত বোমা।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আরসার শীর্ষ সন্ত্রাসী মাষ্টার খালেদের মাধ্যমে গ্রেফতারকৃত উসমান আরসায় যোগদান করে। আরসার সাবেক গান গ্রুপ কমান্ডার সমিউদ্দিন র্যাব কর্তৃক গ্রেফতারের পরই বাংলাদেশ অবস্থানরত আরসার শীর্ষ কমান্ডার মাষ্টার করিম উল্লাহ কর্তৃক উসমানকে গান গ্রুপের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। উসমান পার্শ্ববর্তী দেশে বসবাসরত অবস্থায় সে দেশের সেনাবাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ করতো। কিন্তু রাখাইন প্রদেশের মগগোষ্ঠি ও সেনাবাহিনী কর্তৃক তার বাব-মা এবং পরিবারকে অত্যাচার করা হলে তার কোন প্রতিকার না পাওয়ায় সে মনোকষ্ট থেকে সোর্স থেকে বেরিয়ে আসে। ২০১৮ সালের শুরুর দিকে সেখান থেকে একটা উন্নতমানের অস্ত্র চুরি করে পালিয়ে আসে এবং পরবর্তীতে মাষ্টার খালেদ তার কাছ থেকে অস্ত্রটি নিয়ে নেয়।
গ্রেফতারকৃত ওসমান মাষ্টার খালেদের সম্পর্কে তালতো ভাই (বিয়াই) হয়। আরসাতে যোগদান করে অস্ত্র চালনায় পারদর্শী হয়ে উঠে। এরপর থেকেই সে ওস্তাদ খালেদের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে আরসার বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। ২০২২ সালে কোনারপাড়া জিরোলাইনের অপারেশনে সে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। জিরোলাইন ক্যাম্পে আগুন লেগে ক্যাম্প বিলুপ্ত হওয়ার পর সে তার স্ত্রী পরিবারসহ ক্যাম্প-১৭ তে চলে আসে। আরও জানা যায় যে, গ্রেফতারকৃত উসমান ক্যাম্পে বিদ্যমান ১০টি গান গ্রুপের শীর্ষ কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতো। উসমানের অধীনে মজুদ থাকা অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাত্রীবেলায় গহীন পাহাড়ী এলাকা থেকে ক্যাম্পে প্রবেশ করাতো এবং তাদের টার্গেট অনুযায়ী ক্যাম্প অভ্যন্তরে অপরাধ কর্মকান্ড শেষে অস্ত্রগুলি পুনরায় ক্যাম্প হতে পাহাড়ী এলাকায় নিয়ে যেত। গ্রেফতারকৃত উসমান ক্যাম্প-১৭ এর আবদুল্লাহ এবং কাছিমকে নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করে। আরও জানা যায় যে, আতু নামে একজনকে দোকান থেকে ডেকে নিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনাতেও উসমানের সংশ্লিষ্টতা ছিল।
গ্রেফতারকৃত নেছার আরসার গান গ্রুপের একজন অন্যতম সক্রিয় সদস্য। তাকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মূলত দেশীয় তৈরী বোমা ও মাইন তৈরীর বিশেষজ্ঞ হিসেবে বলা হয়ে থাকে। গ্রেফতারকৃত নেছারের নেতৃত্বে ১০জনের একটি সদস্য নিয়ে অদ্যবধি পাঁচ শতাধিক মাইন/বোমা তৈরী করেছে মর্মে স্বীকার করে। পরবর্তীতে ক্যাম্পে নাশকতা সৃষ্টির জন্য তৈরীকৃত মাইন/বোমাগুলো থেকে ০২ থেকে ০৩টি করে ক্যাম্পে থাকা আরসা সদস্যদের নিকট সরবরাহ করতো। গ্রেফতারকৃত নেছার নিজ হাতে প্রায় পাঁচশত বোমা/মাইন তৈরী করেছে বলে স্বীকার করে। ঈমাম হোসেন উসমানের একজন অন্যতম সহযোগী এবং গান গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। সে অস্ত্র চালনায় দক্ষ হওয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংগঠিত বিভিন্ন নাশকতা, চাঁদাবাজি ও হত্যাকান্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করতো বলে জানা যায়।
গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান তিনি।
ডিআই/এসকে