
মু. রিয়াজুল ইসলাম লিটন, সিনিয়র রিপোর্টার
বাংলাদেশের আটাশতম বারের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা শুরু হয়েছে আজ রোববার থেকে। দেশি-বিদেশি ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে জন্ম হলেও মেলাটি বাংলাদেশের ক্রেতাদের কাছে পণ্য ক্রয়ের অন্যতম জনপ্রিয় মেলায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে মেলাটি শুরু হয়েছিল, তা কতটা পূরণ করতে পেরেছে, তা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক রয়েছে।

গত বছরে পূর্বাচলের ২৭ তম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। ঢাকার শেরে বাংলানগরে তখন থেকেই প্রতি বছর এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ বছর থেকে প্রতিবারই ঢাকার শেরে বাংলানগরে বাংলাদেশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর উদ্যোগে শিল্প পণ্য ও ভোগ্যপণ্য নিয়ে নিয়মিত আয়োজিত হচ্ছে এ মেলা ।ধীরে ধীরে এই মেলা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে এই জনপ্রিয়তা ছিলো দেশের সাধারণ ক্রেতাদের কাছে। যারা কি না গৃহস্থালির জিনিসপত্র কিনতে মেলায় ভিড় করতেন। এ কারণে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ থাকতো দেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছানো। ঢাকার মিরপুরের গৃহবধূ তুহিনা আক্তার বিবিসি বাংলাকে বলেন, ২০০১ সাল থেকে নিয়মিতই মেলায় যেতাম। গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ, দরকারি অনেক কিছু এক জায়গায় পাওয়া যেতো। তাছাড়া, বিভিন্ন সময় ডিসকাউন্ট পাওয়া যেতে বাণিজ্য মেলায়। দেশীয় সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বাণিজ্য মেলা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর দিন দিন মেলায় স্টল ও দেশিয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। আগে থেকে ঘোষণা থাকায় দেশীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি অনেক দেশ ও ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারাও আসতো বিভিন্ন পণ্য নিয়ে। ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকার শেরে বাংলা নগরে অনেকটা জমজমাট ছিলো বাণিজ্য মেলা। পরে ২০২২ সালে থেকে এই বাণিজ্য মেলা রাজধানীর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে আয়োজিত হচ্ছে।

স্থান পরিবর্তন ও রং হারানো মেলা
প্রতিবছর বাণিজ্য মেলা নিয়ে বছরের শুরুতে রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এক ধরনের আগ্রহ দেখা যেতো। কিন্তু স্থান পরিবর্তনের পর তাতে অনেকটাই ভাটা দেখা যায়।
মালিবাগের বেসরকারি চাকুরীজীবী মাহিরা নাজনীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, আগের বছরগুলোতে বন্ধের দিন সুযোগ পেলে পরিবারের সবাই পুরনো বাণিজ্য মেলায় যেতাম। এমনও হয়েছে দুই তিন বারও যাওয়া হতো। কিন্তু স্থান পরিবর্তনের পর আর তার যাওয়া হচ্ছে না।
বাণিজ্য মেলায় প্রতি বছর যে সব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো বড় আকারে স্টল সাজিয়ে পণ্য তোলেন তার মধ্যে পারটেক্স গ্রুপ অন্যতম। এবার মেলায় তাদের স্টল থাকলেও কোন ধরনের পণ্য তুলছেন না তারা।
এই ব্যবসায়ী গ্রুপটির হেড অব অপারেশন্স ফখরুদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এক সময় বাণিজ্য মেলা একটা মেগা ইভেন্ট ছিলো। বাণিজ্য মেলাকে কেন্দ্র করে অনেক ধরনের প্রোডাক্ট ডেভেলপ করা হয়। নতুন জায়গায় বাণিজ্য মেলা স্থানান্তরের পর ট্রান্সপোর্ট ও দূরত্বের কারণে গত বছর থেকে আমরা খুব একটা রেসপন্স পাচ্ছি না”। “এবারও আমরা স্টলের আবেদন করেও প্রত্যাশিত জায়গা পাই নাই। আমাদের চাহিদা অনুযায়ী জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয় নি। এ কারণে মেলায় আমাদের স্টল থাকবে। কিন্তু কোন পণ্য থাকবে না। আমরা ফিজিক্যালি পার্টিসিপেট করবো না”। তবে বাণিজ্য মেলার পরিচালক ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর সচিব বিবেক সরকার বিবিসি বাংলাকে বলেন, “স্থান পরিবর্তন করায় প্রথম বছর একটু সংকট ছিলো। তবে এ বছর মনে হয়, ঢাকার মতো একটা ফ্লেভার আসবে। স্মুথ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ঢাকার মতোই পরিবেশ সৃষ্টি হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি”।
পূর্বাচলের বাণিজ্য মেলা
বাণিজ্য মেলা কতটা আন্তর্জাতিক?
বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় আন্তর্জাতিক মেলার আয়োজন হয়ে থাকে সাধারণত দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের জন্য। যেখানে বিদেশি ক্রেতারা আসেন, পণ্যের গুণগত মান যাচাই ও দরদাম করেন এবং পছন্দের পণ্যের ক্রয়াদেশ দেন। আবার দেশের ক্রেতারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যগুলো কেনার সুযোগ পেয়ে থাকেন মেলা থেকে। রাজধানীর উত্তরায় থাকেন উদ্যোক্তা লুৎফুন নাহার লিনা। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “আগে আমরা যখন মেলায় যেতাম সেটাকে আন্তর্জাতিক বলার একটা কারণ ছিলো। কারণ তখন বিদেশি অনেক পণ্য থাকতো মেলায়”। “তখন ইরান, ভারত, ভুটান, পাকিস্তানের ড্রেস কিনতাম মেলা থেকে। বিদেশি অনেক দোকান বসতো। আর এখন দেশি সব দোকানে ছেয়ে গেছে মেলা। বিদেশি দোকান আগের মতো নাই। সাধারণত বিদেশ থেকে প্রডাক্টস আসতো, সেই টানে আমি যেতাম। এখন আর তেমন দেখা যায় না”, বলছিলেন মিজ লিনা।মেলার পরিচালক ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর সচিব বিবেক সরকার বিবিসি বাংলাকে বলেন, ”আমাদের আন্তর্জাতিক মানের দশ থেকে এগারোটা প্রতিষ্ঠান এবারো থাকবে। যখন এক মাস যখন মেলা হয়, তখন পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ সুবিধা যতটা দরকার সেটা শতভাগ পূর্ণ করতে পারি না। এটা হয়তো ভবিষ্যতে আমরা করতে পারবো”। প্রায় তিন দশ ধরে ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশি পণ্যের প্রসার ও ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্দেশ্যে বাণিজ্য মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। কিন্তু এত বছরেও এটি আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করতে পারেনি কেন? অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আহসান এইচ মনসুরের প্রশ্ন, ”এটা কিভাবে আন্তর্জাতিক মেলা হয়? এটা তো আসলে স্থানীয় মানুষের একটা সামাজিক অনুষ্ঠান। এটা আসলে আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্য মেলা।” বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম বলেন “আমরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা বলার চেষ্টা করছি এ জন্য যে, আমাদের লোকাল শিল্পগুলো যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার সুযোগ পায়। এখানে প্রদর্শনী হয় যে আমাদের কী কী আন্তর্জাতিক মানের পণ্য রয়েছে। আমরা বেশি উৎসাহিত করে আনছি না এ কারণে যে বিদেশিরা এক মাসের মেলায় আসতে চায় না”।
বাণিজ্য মেলায় নানা ধরনের পণ্য এক স্থানে পাওয়া যায় বলে বাংলাদেশি ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়তা আছে
রপ্তানি বাড়াতে পারবে বাণিজ্য মেলা?
অন্যবারের মতো, এবারো সরকারের টার্গেট বিদেশে পণ্য রফতানি বাড়ানো। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, ঢাকার এই বাণিজ্য মেলা বিদেশে পণ্য রফতানিতে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে? এমন প্রশ্নে সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, এটাকে বাণিজ্য মেলা বলা হচ্ছে এ কারণে যে, লোকাল শিল্পগুলো যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার সুযোগ পায়। বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম বলেন, “গত ১৫ বছরে ছয় গুণ রপ্তানি বাণিজ্য বাড়াতে পেরেছি। আমরা সেখানে বসে থাকতে চাই না। আমরা যদি পণ্যে বহুমুখীকরণ করতে পারি, তাহলে আমাদের রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি।” অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নামে আন্তর্জাতিক মেলা হলেও এটি মূলত অনেকটাই ঘরোয়া আয়োজন। এই মেলার মাধ্যমে খুবই কম পণ্যের রফতানি আদেশ পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আহসান এইচ মনসুর বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাণিজ্য মেলা এখন একটা সোশ্যাল ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। বিদেশি ক্রেতাদের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য তেমন কোন উদ্যোগ এখানে নেই, যে কারণ বিদেশি ক্রেতারা খুব একটা আসছে না। ফলে এটা অর্থনীতিতে তেমন বড় কোন ভূমিকা রাখার সুযোগও নাই”। সংকট শুধু মেলার মাধ্যমে বিদেশে পণ্য রফতানি নিয়েই না। বাণিজ্য মেলা ঘিরে এবার নানামুখী হিসাব নিকাশও রয়েছে ব্যবসায়ীরা। কেননা, রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র শেরে বাংলা নগর থেকে মেলার স্থান সরিয়ে নেয়ার পর গত বছর বাণিজ্য মেলা হলেও, তাতে ক্রেতা সমাগম খুব একটা ছিলো না। এমন অবস্থায় অনেক ব্যবসায়ীই খুব একটা আগ্রহ পাচ্ছেন না মেলায় স্টল দেয়ার। কেউ কেউ আবার সুবিধাজনক জায়গায় স্টল না পেয়ে দোকানে পণ্যই তোলেননি। বিবিসি নিউজ বাংলা থেকে সম্পাদিত

দেশি বিদেশি পণ্য কেনার সুযোগ থাকায় বাণিজ্য মেলার বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে ক্রেতাদের কাছে
এবার ক্রেতা বাড়াতে সরকারি যত উদ্যোগ
এবার বাণিজ্য মেলা এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন একটা অর্থনৈতিক সংকট পার করছে বাংলাদেশ। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক একটি মেলায় দেশের পণ্য বিদেশিদের কাছে কেনা বেচার একটা সুযোগ ছিলো। কিন্তু সেই সুযোগ কতটা তৈরি হয়েছে? মেলার পরিচালক বিবেক সরকার বিবিসি বাংলাকে বলেন, “পুরো এক মাস যখন মেলা হয় তখন পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ সুবিধা যতটা দরকার সেটা শতভাগ পূর্ণ করতে পারি না। এটা হয়তো ভবিষ্যতে আমরা করতে পারবো। তখন বিদেশি ক্রেতাদের সমাগমও হয়তো বাড়বে”। গত দু বছর থেকে মেলার স্থান পরিবর্তন হওয়ায় এই অঞ্চলে ক্রেতা সমাগম খুব কম ছিলো। ফলে অনেক ব্যবসায়ী এবার আর স্টল দিতে আগ্রহ পায় নি। রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে অনুষ্ঠিত মেলায় স্টলের সংখ্যা যত ছিলো এখন তার অর্ধেকে নেমে এসেছে। কিন্তু সেগুলোও পূরণ হচ্ছে না। মেলা কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, এবার সাড়ে তিনশোর মতো স্টল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১০টি বিদেশি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরমধ্যে সবগুলো স্টল প্রায় বরাদ্দ শেষ। দূরত্বের কারণে মেলায় দর্শনার্থীর সংখ্যা কম হওয়ায় এবার নতুন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। ঢাকার ফার্মগেট, কুড়িল, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে বিআরটিসি’র বাস সার্ভিস চালু হয়েছে মেলা শুরুর দিন থেকে।প্রতি বছর পহেলা জানুয়ারি মেলা শুরু হলেও এবার জাতীয় নির্বাচনের কারণে বাণিজ্য মেলা পেছানো হয়েছে ২০ দিন। অন্য বছরগুলোতে মেলার তিন মাস আগে থেকে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নোটিশ দেয়া হয়ে থাকলেও এবার মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে দেওয়া হয়েছে নোটিশ এতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমছে।
এমন অবস্থায় মেলার উদ্দেশ্য কতটুকু সফল হবে?
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম শনিবার গণামাধ্যমকে বলেন, ”আমাদের লক্ষ্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ। আর পণ্যগুলো বিদেশিদের দেখানোই উদ্দেশ্য।” মেলা কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, বাণিজ্য মেলায় নতুনত্ব থাকবে বঙ্গবন্ধু প্যাভিলিয়ন। এছাড়া প্রধান ফটকগুলো সরকারের মেগা প্রজেক্টের আদলে করা হবে। মেলার পরিচালক বিবেক সরকার বিবিসিকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার জন্য বা পণ্যের ডাইভার্সিটির জন্য আমাদের দেশিয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পণ্য ডিস্পেলে হবে পাশাপাশি ইরান, তুরস্ক হংকং ভারত পাকিস্তান এই দেশগুলোর প্যাভিলিয়ন থাকবে’। “বাচ্চাদের রিক্রিয়েশনের জন্য একটা শিশু পার্ক থাকবে। সেখানে আধুনিক মানের খেলা ও রাইডস থাকবে। এরকম আরও অনেক ব্যবস্থা থাকবে যেটা হয়তো আমরা আশা করছি দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করতে পারবে”, বলছিলেন মিস্টার সরকার।