
প্রতিষ্ঠাপর থেকে দেশে জঙ্গি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটলিয়ন (র্যাব)। জেএমবির শীর্ষনেতা থেকে শুরু করে গুলশনানে হলি আর্টিজান হোটেলে জঙ্গি হামলার পর র্যাব জঙ্গিদের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের গ্রেফতারে কঠোর অভিযান চালায়। এমন কি দেশে আত্মপ্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার প্রথম সন্ধান পায় র্যাব।
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে র্যাব জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। র্যাব প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার জঙ্গি সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় দেড় হাজার জেএমবি সদস্য।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে শতাধিক জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। এছাড়াও জঙ্গিবাদ থেকে স্বেচ্ছায় র্যাবের কাছে আত্মসমার্পণ করেছেন ৯ জঙ্গি।
মঙ্গলবার ( ৯ জানুয়ারি) বিকেলে র্যাব সদর দফতরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মঈন বলেন, র্যাবের র্যাব ম্যানডেটের আলোকে জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযান চালিয়ে আাসছে। শুধুমাত্র অভিযান নয়; জঙ্গিবাদ বিরোধী জনমত গড়তে ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে প্রচার প্রচারণা চালিয়েছে র্যাব। জঙ্গিদের অর্থের উৎস এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহ বন্ধেও কার্যক্রম চালয়েছে। এছাড়া জঙ্গি আত্মসমর্পণে বিশেষ উদ্যোগ ‘র্যাব ডি-রেডিক্যালাইজেশন ও রিহ্যাবিলিটেশন’কার্যক্রম চলমান রেখেছে।
দেশে সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করা জামাত-উল-মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)’র শীর্ষনেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, আব্দুর রহমানের ভাই আতাউর রহমান সানি, জামাতা আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হোসেন মামুন ও খালেদ সাইফুল্লাহ ওরফে ফারুকদের মতো দূর্ষর্ধ জঙ্গি নেতাদের গ্রেফতার করেছে র্যাব। ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার মাধ্যমে পুণরায় জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব ফুঁটে ওঠে।
হলি আর্টিজান ঘটনা পরবর্তী সময়ে র্যাব জঙ্গিদের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের গ্রেফতারে সক্রিয় ছিল। জঙ্গি সংগঠনের আমিরসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সাফল্য অর্জন করে র্যাব। এছাড়া কেন্দ্রীয় দাওয়াতী শাখা প্রধান, সূরা ও শরিয়া বোর্ড সদস্য, মহিলা শাখার নেতৃবৃন্দ এবং বেশ কয়েক জন অতি গুরুত্বপূর্ণ আইটি বিশেষজ্ঞকে গ্রেফতারের মাধ্যমে জঙ্গি সংগঠনকে দুর্বল করে দেয় র্যাব। হলি আর্টিজান পরবর্তীতে র্যাবের তৎপরতায় ১ হাজার ৮৬৯ জঙ্গি সদস্য গ্রেফতার হয়। তার মধ্যে ৮৭৩ জনেই জেএমবি সদস্য।
এক বছরে র্যাবের জঙ্গি বিরোধী উল্লেখযোগ্য অভিযান:
কমান্ডার মঈন বলেন, ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়িারি দেশে আত্মপ্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র শুরা সদস্য ও সামরিক শাখার প্রধান মাসুকুর রহমান ওরফে রনবীর। এবং বোমা বিশেষজ্ঞ আবুল বাশার মৃধা ওরফে আলম’কে বিপুল পরিমাণ দেশি ও বিদেশি অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে গ্রেফতার। ১২ মার্চ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কেএনএফ’র ছত্রছায়ায় নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র পার্বত্য অঞ্চলের প্রশিক্ষণ কমান্ডার দিদার হোসেন ওরফে চম্পাইসহ নয়জন বান্দরবান থেকে গ্রেফতার। ২৩ জুলাই ‘জামাতুল আনসার ফীল হিন্দাল শারক্বীয়া’র আমীর আনিসুর রহমান ওরফে মাহমুদসহ আগ্নেয়াস্ত্র, বোমা তৈরির সরঞ্জাম মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থেকে গ্রেফতার। ৩০ আগস্ট ‘আনসার আল ইসলাম’র খুলনা, বাগেরহাট ও গোপালগঞ্জ অঞ্চলের দাওয়াতী শাখার পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার। ১৪ সেপ্টেম্বর ডিজিএফআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে র্যাবের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১৩ ঠাকুরগাঁও সদর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আনসার আল ইসলামের উত্তরাঞ্চলের দাওয়াতী শাখার দায়িত্বশীল মুনতাসির বিল্লাহসহ চারজনকে গ্রেফতার। ২৫ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব-১ ও ডিজিএফআইয়ের যৌথ অভিযানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম’ এর ঢাকা অঞ্চলের দাওয়াতী শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী ওরফে আবু মাসরুরসহ ছয়জন গ্রেফতার। ২৫ অক্টোবর র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-৬ ঝিনাইদহ সদর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘আনসার আল ইসলাম’র উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দাওয়াতি শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইয়াকুব হোসাইন ওরফে ইয়াকুব হুজুরসহ তিনজন জনকে গ্রেফতার। ১০ ডিসেম্বর ডিজিএফআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব-১ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘আনসার আল ইসলাম’র ঢাকা ও পাশ্ববর্তী কয়েকটি জেলার প্রধান সমন্বয়কারী ও প্রশিক্ষণ শাখার প্রধান আব্দুর রাজ্জাক ওরফে ইসহাক ওরফে সাইবাসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়।
আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসন: শুধুমাত্র গ্রেফতার নয়, র্যাবের কাছে স্বেচ্ছায় জঙ্গিবাদ ছেড়ে ফিরে এসেছেন ৯ জন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে জঙ্গিদের আত্মসমর্পনের ব্যবস্থা করেছে র্যাব। মূলত তখন থেকেই শুরু হয় বিপথগামী জঙ্গি সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে র্যাবের তৎপরতা।
ডি-রেডিকেলাইজেশন ও রি-হ্যাবিলিটেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপথগামী জঙ্গিদের সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে এনেছে। র্যাবের আহবানে সাড়া দিয়ে এখন পর্যন্ত ঢাকা, বগুড়া, রংপুর, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে আত্মসমর্পনের মাধ্যমে ৩১ জন বিপথগামী তরুণ-তরুণী জঙ্গিবাদ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। এরমধ্যে গত এক বছরে ‘নব দিগন্তের পথে’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গত বছর ২ জানুয়ারি র্যাবের মহাপরিচালক কাছে নতুন জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র নয় জঙ্গি কোনো শর্ত ছাড়াই ত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।
ডিআই/এসকে