
চিকিৎসক ও কর্মচারী সংকটে দেশের উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চলছে খুঁড়িয়ে। তার ওপর মূল ভবনের নির্মাণকাজ চলায় রয়েছে শয্যা সংকট। মেডিসিন, সার্জারি, অর্থোপেডিক, কার্ডিওলজি, চক্ষুসহ বিশেষজ্ঞ ১০ জন চিকিৎসকের মঞ্জুরীকৃত পদ থাকলেও দীর্ঘদিন পদগুলোয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। হাসপাতালের এক্স-রে মেশিনটি ১০ বছর ধরে অকেজো। নেই নিজস্ব বৈদ্যুতিক (জেনারেটর) ব্যবস্থা। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে অস্ত্রোপচারও বন্ধ। এসব কারণে এখানে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জানা গেছে, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৮ জন চিকিৎসকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৪ জন। এখানে গাইনি ও প্রসূতি, শিশু, চর্ম ও যৌনসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ১০টি পদ খালি। ৭ জন মেডিকেল অফিসারের পদের বিপরীতে ৪টি পদই শূন্য। শূন্য রয়েছে ডেন্টাল চিকিৎসক, আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ও প্যাথলজি বিশেষজ্ঞের পদ। নেই ডেন্টালের চিকিৎসা সরঞ্জাম। স্বাস্থ্য সহকারী ও সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকসহ ১৪ জন মাঠকর্মীরও পদও শূন্য।
এর বাইরে চারজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর তিনজনই নেই। মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ৫টি পদসহ স্টোরকিপার, পরিসংখ্যানবিদ, কম্পাউন্ডার, ক্যাশিয়ার, প্রধান সহকারী, প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক পদে দীর্ঘদিন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া দুটি করে অফিস সহায়ক, ওয়ার্ড বয়, রাঁধুনির ও নৈশপ্রহরীর পদ শূন্য। এর বাইরে একটি করে শূন্য রয়েছে আয়া, ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট, মালি ও ওটি বয়ের পদ।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য পুরাতন মূল ভবনটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। পাশের অন্য একটি দোতলা ভবনে চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম। ৫০ শয্যার বিপরীতে এই ভবনে রয়েছে ৩০ শয্যা। নিচতলায় বহির্বিভাগ, অফিসকক্ষ ও জরুরি বিভাগ। স্টোররুমে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় দ্বিতীয় তলার খোলা স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অসংখ্য চিকিৎসাসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে।
মালেক মিয়া নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘সম্প্রতি আমার চাচাতো ভাই মোটরসাইকেল অ্যাকসিডেন্ট করলে হাসপাতালে নিয়ে আসি। কিন্তু হাসপাতালের এক্স-রে মেশিন নষ্ট থাকায় বাড়তি টাকা দিয়ে বাইরে করাতে হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকায় রোগ নির্ণয়ের অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষাই বাইরে থেকে করাতে হয়, যা অসচ্ছল রোগী ও তার স্বজনদের বহন করা সম্ভব হয় না। রয়েছে প্রয়োজনীয় ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরও অভাব। তাই দ্রুত হাসপাতালের অচল যন্ত্রগুলো সচলের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসকসহ লোকবল নিয়োগের দাবি জানাচ্ছি।’
আব্দুস সোবাহান নামে পৌরশহরের এক বাসিন্দা বলেন, ‘প্রায় দেড় লাখ মানুষের একমাত্র সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ এখানকার এক্স-রে মেশিনটি প্রায় ১০ বছর ধরে বিকল। নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। একটু সমস্যা হলেই দৌড়াতে হয় আশপাশের বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে। অথবা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে যেতে হয় বিভাগীয় শহর বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এতে রোগীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আর এত অর্থ খরচ করে উপজেলার গরিব ও অসহায় রোগীদের কোনোভাবেই চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। তাই তারা চিকিৎসার বাইরেই থেকে যায়।’
উপজেলার হোসনাবাদ গ্রামের খলিলুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি আমার স্ত্রীকে এই হাসপাতালে নিয়েছিলাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের অভাবে তাকে চিকিৎসা করাতে পারিনি। অবশেষে বরিশালে গিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হয়েছে, যা ব্যয়সাধ্য ছিল।’ চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগীর অভিযোগ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নারী সংবেদনশীল পরিবেশেরও অভাব রয়েছে। এ ছাড়া চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির অভাবে প্রসূতি নারীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা জিয়াউল হক লিখন বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহে ৬০ থেকে ৬৫ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত থাকি। এতে খুব কষ্ট হয়। দুয়েক জন চিকিৎসক দিয়ে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ মানুষের সঠিক সেবা দেওয়া যায় না। আমাদের ওপর চাপ পড়ে।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফাহামিদা লস্কর বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতালে চিকিৎসক-কর্মচারীর সংকট চলছে। সর্বশেষ গত ৩০ নভেম্বর চিঠি লিখে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শূন্যপদের চাহিদাও পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সমাধান হবে। আমরা সক্ষমতা অনুযায়ী রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
জানতে চাইলে বরগুনার সিভিল সার্জন ফজলুর হক বলেন, ‘চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। প্রতি মাসেই সমস্যাগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। ভবন পরিত্যক্ত হওয়ার কারণে তা ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই কারণে এক্স-রে মেশিনটি সরিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা সমস্যা সমাধানে কাজ করছি।’