ডাক্তার পরিচয়ে দিত করোনার ভুয়া রেজাল্ট!

24

মো.দীন ইসলাম,ঢাকা

প্রাইমারীর গণ্ডি পার না হলেও সুকৌশলে করত প্রতারণা। কখনও ডাক্তার আবার কখনও হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ পরিচয় দিয়ে দিত করোনার নেগেটিভ রেজাল্ট। এভাবেই বিদেশগামী যাত্রীদের থেকে হাতিয়ে নিত কোটি টাকা।এই প্রতারক চক্রের ১৪ সদস্যকে আত্মসাৎকৃত বিপুল পরিমান অর্থ ও প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমান অবৈধ সীমসহ গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

বৃহস্পতিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) কাওরান বাজার র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এ তথ্য জানান।

এর আগে গতকাল (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-১১ এর একাধিক আভিযানিক দল কুমিল্লা, বাহ্মনবাড়িয়া ও রাজধানী ঢাকা হতে তাদের গ্রেফতার করেন।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মো.জসিম উদ্দিন (২২),মো. সুলতান মিয়া (১৯) কে প্রথমে কুমিল্লা জেলা কোতয়ালী থানায় অভিযান করে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও রাজধানী ঢাকার সায়দাবাদ,রমনা ও মতিঝিল এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে মো.বেলাল হোসেন (৩১)কে গ্রেফতার করে। বেলাল এর দেয়া তথ্যে ঢাকার মতিঝিল হতে চক্রের সক্রিয় সদস্য মো.আবুল হোসেন (২৪), মো.আবদুল নুর (২১),মো. আলফাজ মিয়া (১৯), মো.শামিম (৩২) এবং মো আহাম্মদ হোসেন (১৯) গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যে মোবাইল সীমের যোগানদাতা মো.ইমরান উদ্দিন মিলন (১৯)কে নোয়াখালী থেকে গ্রেফতার করা হয়।

পরবর্তীতে বি-বাড়িয়া জেলায় অভিযান পরিচালনা করে চক্রের অন্যতম হোতা মো.সবুজ মিয়া(২৭),মো.আব্দুর রশিদ (২৮),আব্দুল করিম চৌধুরী (৩২),মো.আঙ্গুর মিয়া (২৫),এবং মো.আলমগীর হোসেন (২০)কে গ্রেফতার করা হয়।

এসময় তাদের থেকে প্রায় সাত লাখ টাকা,প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ১২০টি সীমকার্ড,সিম এ্যক্টিভেট করার ১টি ফিঙ্গার প্রিন্ট মেশিন,১টি ট্যাব,৩২টি মোবাইল,১টি পাসপোর্ট,নোটবুক এবং চক্রের সদস্যদের বেতনের হিসাব বিবরণী জব্দ করা হয় বলে জানান কমান্ডার মঈন।

মঈন বলেন,করোনাকালীন সময়ে বিভিন্ন প্রতারক চক্র বিভিন্ন প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। তারা বিভিন্ন সময়ে সাধারণ জনগণকে ঠকিয়েছে এবং ভূক্তভোগীদেরকে করোনার ভূয়া রিপোর্ট ও এসএমএস প্রদান করে হাতিয়ে নিয়েছে বিপুল পরিমান অর্থ। সরকার নির্ধারিত হাসপাতালে নির্দিষ্ট ফি প্রদানের মাধ্যমে বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা টেস্ট করানোর আদেশ জারি করা হয়। যার প্রেক্ষিতে বিদেশগামী যাত্রীরা সরকার নির্ধারিত হাসপাতালে নির্দিষ্ট ফি প্রদানের মাধ্যমে করোনা টেস্ট করে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিদেশগামী ব্যক্তিদের টার্গেট করে করোনা টেস্টের ভূয়া পজেটিভ রিপোর্ট এর কথা বলে মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আসছে কয়েকটি চক্র। বেশকিছু ভূক্তভোগী প্রতারক চক্রকে অর্থ প্রদানের পরেও তাদের করোনা রিপোর্ট পজেটিভ আসার প্রেক্ষিতে তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে প্রতারণার বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞাত হয়। সাধারণ বিদেশগামী যাত্রী,বিভিন্ন হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ,সিভিল সার্জন অফিস ও মিডিয়াকর্মী বিভিন্ন সময়ে র‌্যাবের নিকট এহেন প্রতারাণা সংক্রান্ত লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দায়ের করেন। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রতারকদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য র‌্যাব গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে।

এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে র‌্যাব-১১ এর একাধিক আভিযানিক দল কুমিল্লা, বাহ্মনবাড়িয়া ও রাজধানী ঢাকা হতে চক্রের ১৪ সদস্যকে গ্রেফতার করেন।

প্রতারক চক্রের মূলহোতা গ্রেফতারকৃত বেলাল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়,সে গেল বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য কুমিল্লা জেলার একটি হাসপাতালে করোনা টেস্ট করার পর অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ওই হাসপাতালের ডাক্তার পরিচয় দিয়ে তার করোনা টেস্টের ফলাফল পজেটিভ এসেছে বলে জানায়। ওই অজ্ঞাত ব্যক্তি দশ হাজার টাকার বিনিময়ে বেলালের করোনা টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ করার প্রতিশ্রুতি দিলে,সে চড়া মূল্যের টিকেট নষ্ট না করে ওই অজ্ঞাত ব্যক্তিকে বিশ্বাস করে দশ হাজার টাকা দেয়। পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মোবাইলে এসএমএস এর মাধ্যমে করোনা পজেটিভ ফলাফল প্রেরণ করে। পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে ওই অজ্ঞাত পরিচয়ধারী কেউ উক্ত হাসপাতালে কর্মরত নেই বলে জানতে পারে এবং সে বুঝতে পারে সে প্রতারিত হয়েছে।

পুনরায় গেল বছরের এপ্রিলে করোনা টেস্ট নেগেটিভ আসার পর বেলাল ওমানের উদ্দেশ্যে গমণ করে। তবে মার্চ হতে এপ্রিল এই সময়ে বেলাল প্রতারণার এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে ব্যাপক বিচার বিশ্লেষণ করে এবং প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশগামী যাত্রীদের নিকট হতে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার রুপ রেখা তৈরী করে বলে জানায় র‌্যাব।

তার বিদেশে গমণের নির্ধারিত তারিখ চলে আসায় সে তার এই পরিকল্পনা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সবুজকে জানায়। সবুজকে প্রতারণার একটি টিম তৈরী করে দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত টাকা সমানভাগে বন্টনের প্রতিশ্রুতিতে সে বিদেশ যায়। সবুজ প্রতারণা চালিয়ে যেতে থাকে তবে বেলালকে যে অর্থ দেয়া হত তা নিয়ে বেলালের সবসময় সংশয় থেকে যায়। এই সংশয় থেকেই মূলত বেলাল ৪ মাস বিদেশে অবস্থান করে ২০২১ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে দেশে চলে আসে। এবার সে তার আরেকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু জসিমকে এই প্রতারণার কাজে যোগ করে। যেহেতু প্রতারণার এই প্রক্রিয়াটি খুবুই ঝুঁকিপূর্ণ তাই সে তার মধ্যপ্রাচ্যের ভিসা সচল রাখার জন্য পুনরায় ডিসেম্বর মাসে বিদেশ গমণ করে এবং জানুয়ারি মাসে প্রতারণার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য পুনরায় দেশে চলে আসে।

গ্রেফতারকৃত আবুল হোসেন নারায়ণগঞ্জ ও বি-বাড়িয়া জেলায়; আব্দুর নূর নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা জেলায়; আহাম্মেদ হোসেন চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ জেলায়, আব্দুর রশিদ রাজধানী ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ জেলায়; আব্দুল করিম কুমিল্লা,নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা জেলায়; আলমগীর সিলেট,মৌলভি বাজার এবং হবিগঞ্জ জেলায়; আঙ্গুর মিয়া কুমিল্লা,মৌলভিবাজার এবং হবিগঞ্জ জেলায় সরকার নির্ধারিত বিদেশগামীদের করোনা টেস্ট হাসপাতালসমূহে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিদেশগামী যাত্রী ছদ্মবেশে অবস্থান করে এবং অত্যন্ত কৌশলে অন্যান্য সাধারণ যাত্রীদের নম্বরগুলো সংগ্রহ করে।

নম্বরগুলো সংগ্রহ করে বেলাল ও সবুজকে দিত। বিদেশগামী যাত্রীরা তাদের প্রকৃত করোনা টেস্টের ফলাফল হাতে পাওয়ার পূর্বেই বেলাল ও সবুজ সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের করোনা বিভাগের ডাক্তার/হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিচয় দিয়ে ভূক্তভোগীদের নম্বরে কল দিয়ে করোনা টেস্টের ফলাফল পজেটিভ আসছে বলে মিথ্যা তথ্য প্রদান করত।

পরে পজেটিভ রেজাল্ট নেগেটিভ করে দেওয়ার কথা বলে প্রতি ভূক্তভোগীর নিকট থেকে জন প্রতি মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে পাঁচ থেকে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিত। আলফাজ,জসিম, শামিম ও সুলতান একই সময়ে বেলাল ও সবুজকে বিভিন্ন জায়গার মোবাইল ব্যাংকিং এর নাম্বার প্রদান করতো এবং ভূক্তভোগীরা বেলাল ও সবুজ এর কথা অনুযায়ী ওই সমস্ত নম্বরে মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে টাকা প্রেরণ করলে আলফাজ,জসিম,শামিম ও সুলতান স্ব-শরীরে উপস্থিত থেকে তা সংগ্রহ করতো।

ভূক্তভোগীর অবস্থান ও টাকা সংগ্রহের অবস্থান সব সময় ভিন্ন ভিন্ন জেলায় নির্ধারন করা হতো,যাতে কেউ কোন কিছু আঁচ করতে না পারে। গ্রেফতারকৃত আসামীরা একটি সিম একদিন ব্যবহার করে তা কিছুদিন বন্ধ রেখে পুনরায় ব্যবহার করতো এবং কোন নাম্বার নিয়ে সন্দেহ হলে তা ফেলে দিত। প্রতারণার এই পদ্ধতিটি সম্পন্ন করার নিমিত্তে মো.মিলন খোলা বাজারের একশত বিশ টাকার সিম ভূয়া রেজিষ্ট্রেশনের মাধ্যমে এক হাজার টাকার বিনিময়ে বেলাল ও সবুজকে প্রদান করতো। তাদের এহেন কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোন সম্পৃক্ততা নেই বলে গ্রেফতারকৃত আসামীরা জানায়।

জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়,প্রতারক চক্রের সদস্যরা কেউ প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডী পার হয়নি। অত্যন্ত নিখুতভাবে সু-কৌশলে শত শত মোবাইল সিম নামে বেনামে উত্তোলন করে প্রতারণা করে আসছে। প্রতারণার মাধ্যমে মো. সবুজ মিয়া জানায় গত দশ মাসে সে প্রায় হাজারের অধিক বিদেশগামী যাত্রীর নিকট হতে জনপ্রতি ১০-১৫ হাজার করে প্রায় এক কোটি টাকা আয় করেছে এবং উক্ত টাকা দিয়ে সে তার গ্রামের বাড়িতে একটি অট্টালিকা তৈরী করেছে।

অন্যদিকে কাজী মো.বেলাল হোসেন সে বিদেশ থেকে এসে এই অভিনব প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৬ শতাধিক বিদেশগামী যাত্রীদের নিকট হতে জনপ্রতি ১০-১৫ হাজার করে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা আয় করে। বাকি সদস্যরা এই প্রতারণার মাধ্যমে প্রতি মাসে ২৫/৩০ হাজার টাকা আয় করে বলে জানায় র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।