ঋন দেয়ার প্রলোভনে নিন্মবিত্তের পাঁচ মাসে অদ্য কোটি টাকা আত্মসাৎ!

18

মো.দীন ইসলাম,ঢাকা

ভোলার স্থানীয় একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন ফয়েজ উল্লাহ। পরে ১৯৯২ সালে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় আসেন তিনি। মিরপুরের ১৪ নম্বরে শুরু করেন কনস্ট্রাকশনের কাজ। এরপর ২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কাফরুলের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ফিল্ড অফিসার পদে চাকুরী করেন তিনি।

গত বছর (২০২১ সাল) ফয়েজ উল্লাহ “শিবপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড” প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এই সমিতির নাম বেআইনিভাবে পরিবর্তন করে “শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড” নামে শুরু করেন প্রতারণা।ফুটপাতের কাপড়, ফল বিক্রেতা, হকার, রিকশা-ভ্যান চালক এমনকি ভিক্ষুকসহ শ্রমজীবীদের টার্গেট করে গত ৫ মাসে কোম্পানীর ৩০০ সদস্যের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ৫০ লাখের বেশি টাকা আত্মসাৎ করে প্রতারক ফয়েজ উল্লাহ।

প্রতারণার জন্য খোলা এই ভুয়া সমিতির সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ নিজেই এবং সাধারণ সম্পাদক তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম। সমিতির সহ-সভাপতি ছিলেন তার বন্ধু সিরাজুল ইসলাম,যুগ্ন সম্পাদক তার শ্যালক আলাউদ্দিন, কোষাধ্যক্ষ ছেলে আরিফ হোসেন এবং তার আরও এক বন্ধু মো. জামিল হোসেন ওয়াদুদ ছিলেন সদস্য।

পারিবারিকভাবে নিন্ম আয়ের ও শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করর আসছিল প্রতারক এই চক্রটি।

তবে অভিযোগের প্রেক্ষিতে সোমবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী থানাধীন মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সে অভিযান চালিয়ে প্রতারক ফয়েজ উল্লাহ (৫০) সহ তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৪)। গ্রেফতার বাকি সদস্যরা হলেন- মুন্সীগঞ্জ
জেলার আফরিন আক্তার (২৪) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোছা.তাসলিমা বেগম (৩৩)।

মঙ্গলবার (২২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক।

তিনি বলেন,ভুক্তভোগীদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে শাহ আলী থানাধীন মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সে অভিযান চালিয়ে “শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড” এর সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ (৫০) সহ মোট ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী যেমন- ভর্তি ফরম, ঋণ প্রহীতার ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র,ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের জীবন বৃত্তান্ত,লিফলেট,সিল,বিভিন্ন নামে সঞ্চয় পাশবই,অব্যবহৃত পাশ বই,দৈনিক কিন্তি ও ঋণ বিতরণের বিভিন্ন রেজিষ্টার,ব্যাংকচেকসহ ব্যাংক ষ্ট্যাম্প, আইডি কার্ড,দৈনিক কিন্তি আদায়ের শিট,মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন এর ঋণের আবেদনপত্র, মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন এর সঞ্চয় ও ঋণ পাশ বই, মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন হিসাব খোলার আবেদন,মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের অব্যবহৃত ডেবিট ভাউচার বই,মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন সঞ্চয় আদায় শীট,সভাপতি মো.ফয়েজউল্লাহ এর নামে কমিউনিটি ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির বিভিন্ন প্রকার সার্টিফিকেট,চেক বই,মনিটর,সিপিইউ উদ্ধার করা হয়।

তিনি বলেন,শিবপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড- এর নাম পরিবর্তন করে ভুয়া সমিতির ২০ জন সদস্য অন্তর্ভুক্তির কথা উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে ৩০০ জন সদস্য রয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে আমরা জেনেছি৷ এছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানের কোনো রক্ষিত জামানত নেই।

তিনি বলেন,প্রতারণার কৌশল হিসেব সদস্য সংগ্রহ করা হতো। এই চক্রের মাঠ পর্যায়ের কর্মী/সদস্যদের মাধ্যমে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন বস্তি এলাকার প্রতিবন্ধী, ভিক্ষুক,সেলুনের কর্মচারী,মনোহারী ও ফুটপাতের দোকানদার,গৃহকর্মী ও নিম্নআয়ের মানুষদের টার্গেট করে ঋণের লোভ দেখিয়ে সঞ্চয়ের নামে তাদের কোম্পানী’তে বিনিয়োগ/ডিপিএস করতে উদ্বুদ্ধ করে। পরে তারা ভুক্তভোগীদের প্রলুব্ধ ও বিভিন্ন তথ্যাদি সংগ্রহ করে নানান কৌশলে ভুলিয়ে প্রতারক চক্রের অফিস কার্যালয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে। “শিবপুর ক্ষদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড”প্রতিদিন আনুমানিক ৩০০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করে। পরে শ্রমজীবী মানুষদের ভুল বুঝিয়ে ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্প প্রচার করে যেমন-১। মুদারাবা ডিপোজিট স্কিম,২। মুদারাবা কোটিপতি বিশেষ সঞ্চয়, ৩। মুদারাবা লাখপতি ডিপোজিট স্কিম,৪। মুদারাবা মিলিওনিয়ার ডিপোজিট স্কিম,৫। মুদারাবা পেনশন ডিপোজিট ইত্যাদির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ দিনমজুর,খেটে খাওয়া মানুষ, প্রতিবন্ধী,ভিক্ষুকদের কাছ থেকে প্রতারনামূলকভাবে নগদ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আসছিলো।

তিনি আরও বলেন,প্রতারক ফয়েজ উল্লাহ ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে অল্প সময়ে ঋণ দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে “শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড” এ সঞ্চয়/বিনিয়োগ/ডিপিএস করতে আগ্রহী করে আসছিলো। ভুক্তভোগীদের বলা হতো ১০-১৫ দিন ঠিকমত নির্দিষ্ট হারে সঞ্চয় প্রদান করলে তাদেরকে ঋণ দেয়া হবে। যাতে করে তারা সুন্দরভাবে ব্যবসা করতে পারেন। কিন্তু ভূক্তভোগীদের দু’একজনকে ঋণ দিলেও কেউ সঞ্চয় থেকে ঋণ পেতো না।

এ কোম্পানীর কিছু সদস্য দৈনিক ভিত্তিতে ভূক্তভোগীদের কাছ থেকে সঞ্চয়/ডিপিএস এর টাকা সংগ্রহ করতো। ভুক্তভোগীদেরকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হতো তারা যদি সময়মত সঞ্চয়/ডিপিএস এর টাকা না পরিশোধ করে তাহলে তাদেরকে সঠিক সময়ে ঋণ দেয়া হবে না। অথবা মেয়াদ শেষে তারা মুনাফা কম পাবে এবং জরিমানাও করা হবে।

চক্রটি ফ্ল্যাট/জমি দেয়ার আশ্বাস দিয়েও প্রতারণা করে আসছিলো বলে জানান র‍্যাবের এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন,প্রতারণার আর একটি কৌশল হিসেবে ভূক্তভোগীদেরকে বুঝানো হতো যে দৈনিক মাত্র ২০০/৩০০ টাকা করে জমা করলে একসময় ঢাকা শহরে তাদের একটি করে ফ্ল্যাট বা জমি দেওয়া হবে। এছাড়াও প্রতারক চক্রটি “শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড” এবং ভুয়া ও অনুমোদনবিহীন “মাইসার ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন”কে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বলে মিথ্যা আশ্বাস প্রদান করতো।

এই চক্রের পলাতক বাকি সদস্যদের গ্রেফতার করতে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।