বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ৭০ বছরে পা রাখলেও আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি “আবুল কালাম”

14

এম. মতিন, চট্টগ্রাম,একুশ আসে একুশ যায়, ৫২’র ভাষা আন্দোলন অতিক্রম করেছে ৬৯ বছর। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ৭০ বছরে পা রাখলেও আজো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলনের অগ্রনায়ক রাঙ্গুনিয়ার ভাষা সৈনিক সৈয়দ আবুল কালাম।
বিশ্বে আজ একুশে ফেব্রুয়ারি আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। স্মরণ করা হয় আমাদের ভাষা শহীদদের, আলোচিত হয় ভাষা শহীদদের গল্পগাঁথা। অথচ রাঙ্গুনিয়ার ভাষা আন্দোলনের অগ্রনায়ক আবুল কালামের ভাষা আন্দোলনের গল্পগাঁথা আজো অনালোচিত। ৭০ বছরেও পাননি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ৫২’র ভাষা আন্দোলনের এই অগ্রনায়ক।তথ্য সূত্রে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে প্রথম মিছিল বের হয় রাঙ্গুনিয়ার মরিয়ম নগর থেকে। আর ভাষা আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ভাষা সৈনিক আবুল কালাম। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে তাঁর নেতৃত্বে ৭০/৭৫ জন লোকের একটি মিছিল মরিয়ম নগর (বেয়ান) বাজার থেকে বের হয়ে কাপ্তাই সড়কের চৌমুহনি পৌঁছলে তৎকালীন পাকিস্তানের অনুগতরা রাষ্ট্র ভাষা উর্দু চাই শ্লোগান দিয়ে পাল্টা একটি মিছিল নিয়ে তাদের উপর হামলা চালায়। হামলায় গুরুতর আহত হন ভাষা সৈনিক সৈয়দ আবুল কালাম। তখন তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হামলার খবর পেয়ে বাংলা ভাষা বাস্তবায়নের পক্ষের শতাধিক লোক মরিয়ম নগর, মাইজ পাড়া থেকে নুর জাহান বালিকা বিদ্যালয়ে প্রতিবাদ সভা করেন। প্রতিবাদ সভায় আহত সৈয়দ আবুল কালামের পিতা মাওলানা সৈয়দ আবদুল হক তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন।যেভাবে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন তিনি :
ভাষা সৈনিক আবুল কালাম চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় বাম রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। ভাষা আন্দোলনের চরম মুহুর্তে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনসভা ও প্রতিবাদ সভায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। প্রতিবাদ সভায় বলিষ্ট বক্তব্যের কারণে সেসময় ভাষা আন্দোলনের নের্তৃত্ব দেয়া নেতাদের নজরে আসেন তিনি। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে উত্তর চট্টগ্রামের পটিয়া, হাটহাজারী ও চট্টগ্রামের কমিটির সাথে যুক্ত হয়ে আন্দোলনকে বেগবান করে তুলেন। এরই ধারাবাহিকতায় নিজ গ্রাম মরিয়ম নগরেও ভাষা আন্দোলন কমিটি গঠন এবং সফলভাবে নের্তৃত্ব দিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই দাবীর আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা রাখেন। তার পরিবারের দাবী ভাষা সৈনিক সৈয়দ আবুল কালামকে রাষ্ট্রীয় ভাবে ভাষা সৈনিকের মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে একুশে পদকে ভূষিত করা হোক।
ভাষা সৈনিক আবুল কালামের পরিচিতি :
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়ম নগর গ্রামে ক্ষণজন্মা বিপ্লবী পুরুষ ভাষা সৈনিক মরহুম সৈয়দ আবুল কালাম ১৯৩৩ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা সৈয়দ আবদুল হক ছিলেন একজন আলেম। তাঁর বাল্য শিক্ষা শুরু হয় রাঙ্গুনিয়ায়। তিনি ১৯৫০ সালে রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক (এস.এস.সি) এবং ১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে আই,এ ( এইচ এস সি) পাশ করেন। ১৯৫৪ সালে বোয়ালখালির কানুনগোপাড়া কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। পরে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ চট্টগ্রাম নগরের ডিআইবি অফিসে চাকরির মধ্য দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু করেন। কর্ম জীবনে সৎ ও কর্তব্যনিষ্ট এই মানুষটি ১৯৮৫ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বেচ্ছায় অবসরে যান। ১৯৯২ সালের ১৯ জুন ব্রেইন ষ্ট্রোকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সভাপতি কমান্ডার খায়রুল বশর মুন্সি বলেন, ‘ভাষা সৈনিক সৈয়দ আবুল কালামকে অবিলম্বে ভাষা সৈনিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবু স্বজন কুমার তালুকদার বলেন, ‘ভাষা সৈনিক সৈয়দ আবুল কালাম বয়সে আমাদের চেয়ে অনেক বড়। শুনেছি, তিনি ৫২’র ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ৬ দফা আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখে সৈয়দ আবুল কালাম কর্মের স্বীকৃতি পাবেন বলে আমরা আশা করি।’