২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা  দিবস

31

২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সালাম, বরকত,রফিক,জব্বারসহ কয়েকজন। মাতৃভাষার জন্য তাদের আত্মত্যাগ ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

১৯৫২ সালের ২৭ শে জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন আবারও উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন।এর ফলে পূর্ব বাংলার জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২৯ শে জানুয়ারি সিদ্ধান্ত হয়,ঢাকা শহরে প্রতিবাদী মিছিল – সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে সমগ্র পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদ কর্মসূচি ও ধর্মঘটের আহবান করে। এই কর্মসূচি দমন করতে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে।
১৪৪ ধারা ভংগের প্রশ্নের পুরাতন কলাভবন সামনে আমতলায় ঐতিহাসিক ছাএসভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাএরা পাঁচ – সাতজন করে ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে চায়। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের উপর গুলিবর্ষণ করে গুলিতে নিহত হন রফিক, সালাম,বরকত,জব্বারসহ আরো অনেকে।শহিদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। শোকাবহ এ ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র পূর্ব বাংলায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

 

১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন ভাষাকেন্দ্রিক হলেও তা পুরো জাতিকে অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে।এর ফল হিসেবে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ব্যবধানে মুসলিম লীগকে পরাজিত করে।
২১ শে ফেব্রুয়ারির ছাএ হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। ২২শে ও ২৩শে ফেব্রুয়ারি ছাএ, শ্রমিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী শিক্ষক ও সাধারণ জনতা পূর্ণ হরতাল পালন করে এবং সভা-শোভাযাএা সহকারে ১৪৪ ধারা ভংগ করে। ২২ শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শফিউর রহমান শফিক।

তখন থেকেই দিনটি শহিদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।১৯৯৯ সালের ১৭ ই নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়।প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর ২০০০ সাল থেকে সারা বিশ্বে দিনটি °আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস° হিসেবে পালিত হচ্ছে।

২১ শে ফেব্রুয়ারিকে এভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার মধ্যে দিয়ে ভাষা-আন্দোলনের
আন্তর্জাতিক অনুমোদন হয়।এর একটি নতুন মাএাও তৈরি হয়।রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নতুন গতি লাভ করে। রচিত হয় ভাষা আন্দোলন – কেন্দ্রিক অনেক কবিতা, গান,গল্প,উপন্যাস। ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় একুশের প্রথম সাহিত্য সংকলন ‘ একুশে ফেব্রুয়ারি’ প্রকাশিত হয়।একই বছর মুনীর চৌধুরী কারাগারে বসে ‘কবর’ নাটক রচনা করেন। আবদুল গাফফার চৌধুরী লেখেন গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’।’ কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’।আরো কবিতা রচনা করেন, মাহবুব উল আলম চৌধুরী, শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, জহির রায়হান প্রমুখ।

বাঙালি জাতি তার জাতীয়তাবোধ ও অধিকার সম্পর্কে প্রথম হয়।ভাষার প্রশ্নে সকল শ্রেণি- পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এর ফলে পূর্ব বাংলায় গড়ে ওঠে একটি সচেতন মধ্যবিও শ্রেণি।ভাষা
আন্দোলনের প্রেরণায়১৯৬২-র শিক্ষা
আন্দোলন,১৯৬৬-র ছয় দফা এবং ১৯৬৯-র গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয় অর্জিত হয়েছে।

লেখক,
মোঃ এমদাদুল হক

সাংবাদিক এবং শিক্ষক (গণিত)

ময়মনসিংহ

মোবাইলঃ০১৭২২০৭২৩৮০