মাতৃভাষা দিবসে পিরোজপুরের পৌর মেয়রের প্রাপ্তী ও প্রত্যাশা

25

যখনই ফেব্রুয়ারি মাস আসে তখনই কানে বাজে গীতিকার আব্দুল গফফার চৌধুরীরর লেখা ও পরবর্তিতে আলতাফ মাহমুদের সুরকরা প্রান ও মন কাঁপানো সেই হৃদয়গ্রাহী গান- ”
আমার ভাইয়ের
রক্তে রাঙ্গানো
একুশেফেব্রুয়ারি –
আমি কি ভুলিতে পারি”-
একই সঙ্গে শুরু হয় বাঙালির প্রানের স্পন্দন “একুশের বই মেলা”! ফেব্রুয়ারী মানেই একুশ, একুশ মানেই বাঙালির প্রানের নতুন এক উদ্দীপণা, এক ভিন্নতর শিহরণ ! সেই । ফেব্রুয়ারি এলেই মনে পরে সালাম, বরকত, জব্বার, শফিকদের কথা। ইতিহাসের পাতায় তারা রয়েছেন – ভাষার রাজা, মাতৃ ভাষা রক্ষার সংগ্রামের রাজা হয়ে। বাঙালি ও বাংলা ভাষা ভাষী মানুষের হৃদয়েপটে ।প্রকৃত পক্যাষে যারা এই দেশকে ভালোবেসে বিদেশী ভাষার আক্রমণ থেকে নিজেদের দেশ ও মাতৃভাষাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, রাজপথে নিজেদের বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে পবিত্র ইতিহাস রচনা করেছিলেন-তারাইতো আমাদের প্রকৃত রাজা ! এই ভাষার রাজাদের মধ্যে অনেকেই আজ আমাদের মাঝে নেই । কেউ কেউ এখনও আছেন সেই ‘৫২-এর ভাষা সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে-তাঁদের জানাই সালাম । আজ এ কথা স্পষ্টভাবেই বলা যায় যে, একুশে ফেব্রুয়ারিই হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার সমুজ্জ্বল ও সুদৃঢ় সোপান । স্বাধীনতার স্বর্ণতোরণ । বাঙালীর সত্যিকার মন ও মানসকে, চিন্তা ও চেতনাকে জাগরিত করার তুফানী হাওয়ার মাসই হচ্ছে ফেব্রুয়ারী মাস। এই রক্তচ্ছাটা একুশে ফেব্রুয়ারি এসেছিল বলেই আমরা ২৬ মার্চ আমাদের রঞ্জিত স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করতে পারছি । তাই একুশই হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিউগল । এই বিউগল শুনেই দেশের আপামর কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র জনতা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ প্রান আর মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয়েছিল মহান বিজয় । আমরা অবশ্যই রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেয়েছি । আজ বৃটিশ বেনিয়া নেই । পাকিস্তানী শোসকরাও নেই । লুণ্ঠনকারীরা সব চলে গেছে । এখনতো সব আমরা আমরাই । স্বাধীনতার একান্ন বছরে অবশ্যই আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে । অনেক ক্ষেত্রেই আমরা সাফল্য অর্জন করেছি । সামনে আর কি ই বা বাকি আছে ? শুধু ঘুরে দাড়ালেই সফলকাম হবো। তবে ভাষার জন্য যে সকল দামাল ছেলেরা জীবণ আত্মাহুতি দিয়েছেন পৃথিবীর অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে এ আত্মত্যাগ করতে হয়নি। বাঙ্গালীর এ আত্মত্যাগের উদাহরণ পৃথিবীতে সত্যিই বিরল । এ আন্দোলন আমাদের শিক্ষা দিয়েছে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হতে । এ আন্দোলন প্রেরণা যোগায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বিপ্লবের । এ আন্দোলন শিক্ষা দেয় অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করবার । ধন, সম্পদ, বিদ্যা, বুদ্ধি -কোন কিছুই শুধু অর্জনের জন্য নয়, গচ্ছিত রাখার জন্যও নয় ,বিতরণের জন্য। আমাদের মধ্যে অনেক বুদ্ধিজীবী আছেন । আবার অনেক বুদ্ধির পুঁজিপতিও আছেন । পুঁজিবাদ যেমন আমাদের জন্য ক্ষতিকর, বিদ্যা-বুদ্ধির পুঁজিবাদও তেমনি আমাদের জন্য অনিষ্টকর ।তেমনিভাবে আজও বাংলাদেশে থেকেও ভুলতে পারেনি সেই পাক – পতাকা, পাকস্তানী কৃষ্টি কালচার। আমাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে তারা কারা ? স্বাধীনতার ৫১ তে পদার্পণ করা এ দেশটির নাগরীক হিসেবে আমাদেরকে নেতৃত্ব দিতে হবে দেশে ও দেশের মানুষের কল্যাণকামী কাজগুলোর প্রতি। যদি না পারি তাহলে আমরা লক্ষ লক্ষ শহীদের আত্মার সাথে, বেঁচে থাকা প্রায় ১৭ কোটি মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার সাথে বিশ্বাসঘাতকতারই শামিল হবো ।
১৯৫২ ভাষা শহীদদের রক্তস্নাত পথ ধরে লক্ষ লক্ষ শহীদের প্রানের বিনিময়ে আমরা মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব অর্জন করেছি । কিন্তু আমরা কি এই অর্জনের জন্য আমাদের যা যা বর্জন করার কথা ছিল সে সব বর্জন করতে পেরেছি ? সত্যিকার শিক্ষা, উন্নত রুচি ও নান্দনিকতার আলোকে আমরা কি নিজেদের আলোকিত করতে পেরেছি ? আমরা কি একত্রিত হচ্ছি ? কিন্তু দেশ গড়ার জন্য একতাবদ্ধ কি হতে পারছি, উদার মন নিয়ে কোন মুক্ত সামিয়ানার নিচে ? আমরা কি পারছি-আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য, জাতীয় চেতনাবোধে সমুন্নত রেখে নাগরিক কর্তব্য পালন করতে ?
স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বিবেকের স্বাধীনতা । আসুন, আমরা সবাই আজ সত্যিকারের বিবেকবান হয়ে আমাদের রাজনীতিকে, আমাদের অর্থনীতিকে নিজের-নিজের ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করে সুবিধাভোগের রাজনীতি, লোভ আর লালসার অর্থনীতিকে দূরে সরিয়ে রেখে পাবার ও প্রত্যাশার সব উলঙ্গ উল্লাসকে পরিহার করে একুশের মহান চেতনায় ও মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র প্রেরণায় জনগণের কল্যাণে কাজ করি এবং সর্বোক্ষেতে বাঙলা ব্যাবহার নিশ্চিত করি ।
একুশের আন্দোলন এক গৌরবের উপাখ্যান এর প্রেরণা সৃষ্টি, ধ্বংসের নয় । এর প্রেরণা নিজস্ব সংস্কৃতি ও কৃষ্টির বিকাশের প্রেরণা । এর প্রেরণা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার প্রেরণা । একুশের প্রেরণা অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার প্রেরণা
সর্বোপরি, শ্রদ্ধা জানাই ভাষা সৈনিকদের ও তাদেরকে ,যাদের মেধা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে আজ আমাদের এ ভাষা দিবসটিকে আন্তর্জাতিক ভাবে পালনের ব্যবস্হা করে দিয়েছেন , ধন্যবাদ জানাই জাতিসংঘের ইউনেস্কোকো নামক প্রতিষ্ঠানকে , যারা আমাদের বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন ।