ভূমিদস্যুদের দৌড়াত্মে ড্রেজারের বাম্পার ফলনে ফসলী জমি উধাও, শ্রেণি পরিবর্তনের হিড়িক

33

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধিঃ
মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম প্রধান হচ্ছে খাদ্য। আর এ খাদ্য আসে কৃষিজমি থেকে। মানুষের চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যের যোগান দিন দিন লোপ পাচ্ছে। এর প্রধান কারণ অযাচিতভাবে কৃষিজমি শ্রেণি পরিবর্তন করে গৃহ নির্মাণ, কল-কারখানা নির্মাণ করে উজাড় করা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৯টি উপজেলার সবকটি উপজেলায় প্রশাসনের নাকের ডগায় ঘটনাগুলো রীতিমত ঘটছে। এমনই এক অভিযোগ উঠে এসেছে সদর উপজেলার মাছিহাতা ইউনিয়নের উত্তর জগৎসার গ্রামের। অভিযোগে রয়েছে একটি খালের চিত্র। উত্তর জগৎসার গ্রাম থেকে উৎপত্তি খালটি তিতাস নদীতে পতিত হওয়া এ খাল দিয়ে এক সময় পালের নৌকায় করে মানুষ ও মালামাল আনয়ন করার প্রধান পথ ছিল। কালের বিবর্তন ও যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার ফলে খালটি এখন প্রায় মৃত। তবে এ খালের পানি কৃষিজমিতে ৮০ ভাগ পানির সেচের ব্যবস্থা এ খাল থেকে হচ্ছে বলেই এলাকাবাসী জানান। ভূমিদস্যুদের দৌড়াত্মে খালের অধিকাংশই ভরাট করার অভিযোগ উঠে এসেছে। তারমধ্যে দ¶িণ জগৎসার গ্রামের মৃত আবদুল মালেক রাজু মিয়ার ছেলে মো. দানিছ মিয়ার বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সহকারী কমিশন (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন এলাকাবাসীর প¶ে জুলহাস মিয়া, নুর খাঁ ও মনির মিয়া। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ইউনিয়ন ভূমি অফিস আটলাধীন সাবেক জেএল ৩৮৯ হালে ২৫৭ নং মৌজা দ¶িণ জগৎসার অন্তর্গত বিএস চূড়ান্ত খতিয়ানভূক্ত বাংলাদেশ সরকার প্রশাসন মালিকানাধীন বিএস ৬৭২ দাগের অবস্থিত জলাভূমি (খাল)টি এলাকার একটি প্রাচীন ও দীর্ঘদিনের পুরাতন একটি খাল। খালের পানি দিয়ে চৈত্র মাসের খড়ায় জমিতে পানি সেচ, বৃষ্টি বাদলের পানি, টিউবলের পানি, গোসল পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু ইদানিং এলাকার ভূমিদস্যু দানিছ মিয়া খাল বাঁধ দিয়ে প্রায় ১০০০ একর ভূমির ফসল নষ্ট করার পরিকল্পনা করছে।
অভিযোগ ¯^ীকার করে দানিছ মিয়া বলেন, খালের সাথেই আমার ফসলী জমি রয়েছে। আমার জমিতে মাটি ভরাটের জন্য খালের দুই পাশে অস্থায়ী বাঁধ দিয়েছি। মাটি ভরাট হয়ে গেলে পুনরায় বাঁধ উন্মুক্ত করে দিব। ফসলী জমি ভরাট করতে হলে প্রথমেই আপনাকে শ্রেণি পরিবর্তন করতে হবে, সরকারি আমিন উপস্থিত থাকতে হবে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকতে হবে। এ সকল সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কি আপনি অবগত করেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়গুলো কোনটাই আমার জানা নেই, তবে আমার ব্যক্তিগত পরিচিত আমিন দিয়েই আমার জায়গাটি মাপিয়েছি। ড্রেজারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাশর্^বর্তী গ্রামের পরশ চৌধুরীর ড্রেজার হোসেন মিয়া নামক এক ব্যক্তি পরিচালনা করছে। তাকে দিয়েই মাটি ভরাট করছি। হোসেন মিয়ার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে পরশ চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যেহেতু খাল ভরাটের অভিযোগ উঠেছে, আর তাতে আমার নামও ব্যবহার করা হয়েছে, তাই আমি বলবো ড্রেজার ও তাদেরকে আটক করে পুলিশের সোপর্দ করার দাবি জানাই।
এ বিষয়ে নদী ও পরিবেশ সুরক্ষা সামাজিক সংগঠন নোঙর’র ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটি পরিদর্শন ও অনুসন্ধানে সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, খালটি অবৈধ দখল ও ভরাটের ফলে উল্লেখিত এলাকার হাজার হাজার একর ফসলী জমি উজাড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পুরো এলাকা জুড়ে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে ফসলী জমি থেকে মাটি উত্তোলনের দৃশ্য নিত্য দিনের! ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তার বক্তব্যেও এর সত্যতা পাওয়া যায়। তিনি প্রত্যাশা করে বলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি), পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে সিএস নকশা ধরে পুরো খালটি উদ্ধারে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মাছিহাতা ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্ভুক্ত আটলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আওতাধীন দক্ষিণ জগৎসার গ্রামে সরকারি খাল দখলের অভিযোগ এলাকাবাসীর।
আটলা ভূমি কর্মকর্তা আতাউর রহমান জানান, আমি মাছিহাতা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আল আমীন পাভেল সাহেবের থেকে জেনেছি। যদিও দাপ্তরিকভাবে এখনো আমার কাছে কোন চিঠি আসেনি। তবুও আমি লোক পাঠিয়েছি। সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি বলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সহকারী কমিশন (ভূমি) কর্মকর্তা ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইয়ামিন হোসেনকে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নূরুল আমীন সাংবাদিকদের জানান, খালে বাঁধ তৈরি করে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি ভরাট করার কোন সুযোগ নেই। যা হচ্ছে তা অবৈধ। আমাদের কাছে এখনো কোন অভিযোগ জমা পড়েনি।