মৃত্যুর পূর্বে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চান কলাপাড়ার আঃ বারেক

19

কলাপাড়া(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি স্বাধীনতার ৫০ বছরেও স্বীকৃতি পায়নি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া অনেক হতভাগা। এদের অনেকেই পাকবাহিনীর আঘাতে শরীরের যন্ত্রনা নিয়ে পার করছেন দিন। অনেকে আবার মসজিদের চাঁদা উত্তোলন কিংবা বৃদ্ধ বয়সে জেলের কাজ করে পার করছেন মানবেতর জীবন। এমনই একজন মুক্তিযোদ্ধা আবদুল বারেক খান। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউপির পাঁচজুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা। একটি পূত্র সন্তানের আশায় সাতটি কন্যার বাবা হয়েছেন তিনি। সবগুলো মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। ধানখালী এসএইচ এন্ড আশরাফ একাডেমি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন চাকরি করে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অবসরে গিয়াছেন। এ পর্যন্ত ৬টি মেয়েকে বিবাহ দিয়েছেন। বাবার জমিজমা তেমন একটা পাননি। আয়ের কোন উৎস নেই তার। যে কারণে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন চাকুরীজীবি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত মেঝ মেয়ে। শুধু বারেক খান নয় মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রনকারী বর্তমান মুক্তিযোদ্ধাদের সুপারিশপ্রাপ্ত কলাপাড়া উপজেলার ৪৪ জন মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা এখনও পাননি মুক্তিযোদ্ধা সনদ। তাদের অবিলম্বে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়ার দাবি বর্তমান মুক্তিযোদ্ধাদের। সঠিক মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করে খুব শীঘ্রই পূর্নাঙ্গ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ করবে সরকার এমন প্রত্যাশা সকলের। আবদুল বারেক জানান, ভারতে ট্রেনিংএ গিয়ে ফেনীর মহাকুমা এলাকায় পাকবাহিনীর হাতে আটক হন। সেখানে প্রায় ১৫ দিন আটকে রেখে আমাদের অমানসিক নির্যাতন করেছে। বর্তমানে সেই আঘাতের যন্ত্রনা নিয়ে বেঁচে আছি। ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারিনা। তিনি আরও জানান, ১৯৭০ সালে আট নং ধানখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিভিন্ন জায়গায় মিছিল মিটিং এ যোগদান করি। পশ্চিমা মিলিটারি স্বাধীনতার বিরুদ্ধে প্রত্যেক উপজেলায় অন্যায়-অত্যাচার আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী ধরতে শুরু করলো। তখন পশ্চিমা বাহিনীর মেজর ধানখালী ইউপির চেয়ারম্যান আশরাফ উদ্দিন গাজীকে বলল, আব্দুল বারেক খানকে ধরে দিতে হবে, তা না হলে আপনাকে গুলি দেওয়া হবে। বারেক খানকে ধরে দিতে পারলে পুরস্কার দেয়া হয় ঘোষণা করা হয়। আমি তখনই ঘর থেকে বের হই। আমার সাথে তিনজন লোক নিয়ে বিভাগীয় কমান্ডার শওকত হোসেনের সাথে ভারতের ট্রেনিং এর উদ্দেশ্যে রওনা করি। যখন ফেনী মহাকুমায় পৌঁছাই তখন রাত্র হয়ে যায়। তাই রাত্রে যাব না ভোরে বর্ডার পার হবো এই সিদ্ধান্ত নেই। তখন ফেনীর একটি হোটেলের পঞ্চম তলায় রুম রাখতে গেলে ম্যানেজার বলে বাড়ি কোথায়? বরিশাল বললে ম্যানেজার বলেন, বরিশালের ৬ জনকে গুলি করে মেরে ফেলেছে আপনারা তাড়াতাড়ি নেমে পড়েন। আমরা নোয়াখালীর ভিতরে ঢুকি সাথে সাথে আর্মি ও রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ি। তারা আমাদের নোয়াখালীর শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান বকু মিয়ার হাতে তুলে দেয়। আমাদের হাত-পা বেঁধে তার কাচাঁরীর মধ্যে আটকে রাখেন। ভোরে মেজর আমাদেরকে ফেনী মহাকুমার জেল হাজতে নিয়ে রাখে এবং অনেক নির্যাতন করে। পায়ের বুট দিয়ে লাথি মেরে আমার বুকের দুটি হাড় ভেঙে দেয়। সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য একজন লোক ছিল তিনি বলেন, ভাই আপনাদের বাঁচাইতে পারবোনা। আজ রাতে আপনাদের গুলির নির্দেশ দিয়েছে মেজর। আনুমানিক আসরের সময় শওকত হোসেনকে মেজর নিয়ে গেলে সে আর ফিরে আসে নাই। তাকে গুলি করে মেরে ফেলে। আমরা গুলির নির্দেশের খবর পেয়ে বাঁচার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা কর। রোড ঘাট, বাগান পরিষ্কার করার জন্য বের হয়ে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে জেলহাজত থেকে পালিয়ে আসি। এসে মুজিব বাহিনী চরবিশ্বাস ট্রেনিং সেন্টারে যোগদান করি। ট্রেনিং অবস্থায় গলাচিপা পানপট্টি পশ্চিমা আর্মির সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের ফাইট হয। এই গোলাগুলিতে আমরা উপস্থিত ছিলাম। মুজিব বাহিনীর কমান্ডার ছিল আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ। যুদ্ধকালীন কমান্ডার তোফায়েল আহমেদ, কোম্পানি কমান্ডার সর্দার জাহাঙ্গীর, ট্রেনিং করিয়েছে নাজমুল হুদা, সংবাদিক হাবিবুল্লাহ রানা এবং শাহ আলম তালুকদার। কলাপাড়া মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার বদিউর রহমান বন্টিন জানান, উপজেলার ৪৪জন মুক্তিযোদ্ধাদের যাছাই বাছাই করে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তালিকা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয় ১০ ভাগ পাঠাতে বলেছে। আমরা আবদুল বারেক সহ ফের ১১ জনের তালিকা পাঠিয়েছি। এরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে অংশগ্রহন করেছে। এই ৪৪ জনের সবাইকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাচ্ছি। কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম রাকিবুল আহসান জানান, বর্তমানে এসকল মুক্তিযোদ্ধারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিষয়টি আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবো। আশা করছি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয় এসব মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নিবে।