মেগা প্রকল্পে আরো বদলে যাবে নারায়ণগঞ্জ

0

আব্দুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ:
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নজর আছে বলেই শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ হচ্ছে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যবসা বাণিজ্যে বহু আগে থেকেই সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ জেলা। মসলিন, জামদানি, সোনালী আশঁ পাট এবং তৈরী পোশাক রপ্তানীতে নারায়ণগঞ্জের রয়েছে বিশ্বব্যাপী সুনাম। তাই দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে আয়তনে তুলনামূলক ছোট হলেও, রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী এই জেলাটি যুগ যুগ ধরেই অর্থনীতি ও বিভিন্ন দিক থেকে বেশ উন্নত। তবে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে চলমান বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কারনে আরো বদলে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সার্বিক চিত্র। সেই সঙ্গে এসব উন্নয়ণ প্রকল্পগুলো পুরোদমে চালু হলে আর্থ-সামাজিক দিক দিয়েও ব্যাপক পরিবর্তন আসবে ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ খ্যাত এই জেলার।
নারায়ণগঞ্জে এই মূহুর্তে শেখ রাসেল নগর পার্ক, বাবুরাইল খাল, তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেললাইন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ এবং আড়াইহাজারে ইকোনামিক জোন নির্মাণের মতো বেশ কয়েকটি বড় বড় উন্নয়ণ প্রকল্পের কাজ চলমান আছে। শত শত কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মাণাধীন এই মেগা প্রকল্পগুলো পুরোদমে চালু হলে অবকাঠামো ও অর্থনৈতীক দিক দিয়ে আরো সমৃদ্ধি অর্জন করবে নারায়ণগঞ্জ জেলা। পাশাপাশি অনেক নতুন নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে এখানে।বাবুরাইল খাল ও শেখ রাসেল নগর পার্ক-নারায়ণগঞ্জের বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অধীনে নির্মাণাধীন শেখ রাসেল নগর পার্ক ও বাবুরাইল খাল অন্যতম। ২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া দৃষ্টিনন্দন এ দুটি উন্নয়ণ প্রকল্পের কাজ এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। প্রকল্পের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন প্রায় ২’শ ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে প্রকল্প দুটি। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় বাবুরাইল খালের ৮০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। বাবুরাইল খাল নারায়ণগঞ্জের শীতললক্ষ্যা বং ধলেশ্বরী নদীর মধ্যকার সংযোগ হিসেবে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ নগরীর উপকণ্ঠে অবস্থিত শেখ রাসেল নগর পার্কের কাজও অনেকটা শেষের পর্যায়ে আছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চোখ ধাঁধানো জলাশয় ও চারিদিকে গাছপালায় ঘেরা ছায়া সুনিবিড় পরিবেশের জন্য এই পার্ক ও এর আশেপাশের পুরো এলাকা জুঁড়েই তৈরী হয়েছে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ। স্থানীয়রা জানান, প্রকল্প দুটির কাজ শেষ হলে, এটি বিশাল বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হবে।
চলছে তৃতীয় শীতল সেতুর কাজ-
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সৈয়দপুর ও বন্দর উপজেলার মদনগঞ্জ প্রান্তে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর নির্মাণ করা হচ্ছে, মেগা প্রজেক্ট তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু। বাংলাদেশ এবং সৌদি সরকারের যৌথ অর্থায়ণে নির্মাণাধীন এই সেতুটি তৈরীতে কাজ করছে একটি চীনা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে এই প্রকল্পটি হাতে নিলেও, ঠিকাদার নিয়োগসহ বেশ কিছু জটিলতার জন্যে মূলত এর কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। তাই প্রায় ৫’শ ৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই সেতুটি তৈরীতে ইতিমধ্যেই অনেক সময় নিয়ে ফেলেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেতুটির সহকারী প্রকল্প পরিচালক সিদ্দীকুর রহমান জানিয়েছেন, এ-পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ৭৭ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর পুরো কাজ শেষ হলে, বন্দর এবং নারায়ণগঞ্জ শহরের সাথে সরাসরি সড়ক পথে যোগাযোগ অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে। সেই সাথে ফরিদপুর ও মুন্সিগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম ও সিলেটগামী সড়কে যোগাযোগের দুর্ভোগও অনেকটাই কমবে।ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেললাইন প্রকল্প-
রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজটের চাপ কমাতে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ণে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়েল গেজ রেললাইন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ৩’শ ৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এই মেগা প্রকল্পটির প্রায় ৭৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পাওয়ার চায়না কন্সট্রাকশন নামে একটি বিদেশী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলমান এই প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ট্রেন চলাচল ব্যবস্থায় ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন হবে। সেই সঙ্গে এই রুটে আগের চেয়ে অধিক যাত্রী এবং মালামাল পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।ঢাকা-ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ (ডিএনডি) প্রকল্প-নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জসহ ঢাকার ডেমরা এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা বহু পুরনো। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিতে ডুবে যায় এসব এলাকা। তাই এই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ২০১৬ সালে একনেকের সভায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকায় বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এরপর ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহীনির অধীনে এই মেগা প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। বর্তমানে এই উন্নয়ণ প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি কাজ শেষ হয়ে গেছে। জানা গেছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ সম্পূর্ণ হলে ডিএনডি এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি এসব অঞ্চলের সার্বিক চিত্র অনেকটাই পাল্টে যাবে। অন্যদিকে ডিএনডি এলাকায় যাতায়ত ব্যবস্থায়ও অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসবে।আড়াইহাজারে ইকোনামিক জোন-নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় চলছে জেলার সবচেয়ে বড় উন্নয়ণ প্রকল্পের কাজ। সেখানে প্রায় ১ হাজার একর জমির মধ্যে গড়ে তোলা হচ্ছে জাপান অর্থনৈতীক অঞ্চল। প্রায় ২ হাজার ৫’শ ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই মেগা প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে, জাপান এই অর্থনৈতীক অঞ্চলে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ করবে বলে জানা গেছে। এতে এখানে হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরীর পাশাপাশি পুরো আড়াইহাজার উপজেলায় একটি বড় অর্থনৈতীক বিপ­ব হবে। এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অর্থনৈতীক অঞ্চলের জন্য শুধু আড়াইহাজার নয়, এই উপজেলার আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের সার্বিক চিত্রও অনেকটা পালটে যাবে।
তাই এই মেগা প্রজেক্ট’র কাজের অগ্রগতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে খবর রাখছে বলেও জানা গেছে।এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক আরিফুর রহমান বলেন, ‘ মূলত সরকারের প্রতিটি উন্নয়ণ প্রকল্পই অর্থনীতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিবর্তন নিয়ে আসে। তাই এ মূহুর্তে নারায়ণগঞ্জে যেসব মেগা প্রজেক্টের কাজ চলছে, এগুলো চালু হলে স্বাভাবিক ভাবেই নারায়ণগঞ্জ অর্থনৈতীক দিক দিয়ে আরো এগিয়ে যাবে। এছাড়া সরকারি এই প্রকল্পগুলো শুধু নারায়ণগঞ্জই নয় সারা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক চিত্র পালটে দেবে।’নারায়ণগঞ্জের নাসিক মেয়র ডাক্তার সেলিনা হায়াৎ আইভী এ বিষয়ে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নজর আছে বলেই আজকে এই জেলা শত শত কোটি টাকা উন্নয়ণ প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি মানুষের জীবন যাপনের ধরন অনেকটা বদলে যাবে। একই সাথে অর্থনৈতীক দিক দিয়েও আমার দেশের অন্যতম ধনী জেলাতে পরিণত হবো।

নিউজটি শেয়ার করুন...
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •