রাজধানীতে কোটি টাকা আত্মসাৎকারী প্রতারক চক্রের মূল হোতা গ্রেফতার ১

মোঃ দীন ইসলামঃ

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে চাকরির দেয়ার নামে জাল সনদ-সিল ব্যবহার করার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎকারী প্রতারক আব্দুল মালেক’কে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪ এসময় তার কাছ থেকে জাল কাগজপত্রাদিসহ সিল উদ্ধার করা হয়

সোমবার ( ১৯ জুলাই) রাতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্যে জানতে পারা যায় যে, একটি সংঘবদ্ধ পেশাদার চক্র সাধারণ জনগণকে চাকুরী দিয়ে এবং চাকুরী দেয়ার নামে প্রতারণার মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। উক্ত সংবাদে র‌্যাব-৪ এর একটি আভিযানিক দল রাজধানীর তেজগাঁও থানার মনিপুরীপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রতারক চক্রের মূল হোতা মোঃ আব্দুল মালেক (৪২) নামের একজন কে গ্রেফতার করে।

র‍্যাবের অধিনায়ক মোঃ মোজাম্মেল হক জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আসামী তার কৃত অপকর্মের বিষয়টি স্বীকার করেছে। পলাতক আসামী আব্দুর রাজ্জাক (৫০), আল-আমিন (২৫) এবং অবিনাষ (৩২)সহ তার অন্যান্য সহযোগীদের সহায়তায় তার এই প্রতারণার কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।

কুখ্যাত প্রতারক মালেকের উত্থান ও প্রতারণার কৌশল

মোঃ মোজাম্মেল হক জানায়, মালেকের উত্থানঃ মোঃ আব্দুল মালেক ১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়া জেলায় জম্মগ্রহন করে। সে ১৯৯৩ সালে দাখিল এবং ১৯৯৫ সালে আলিম পাশ করে, স্থানীয় একটি কলেজ থেকে বি.কম এবং এম.কম ডিগ্রী লাভ করে। সে শিক্ষাজীবন শেষ করে ২০০৪ সালে “বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর” খামারবাড়ী, ফার্মগেট এ “অফিস সহাকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর” পদে চাকরী পায়। মূলত চাকুরী লাভের পর থেকে চাকুরীপ্রার্থীদের সাথে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতে থাকে। এক পর্যায়ে ২০১০ সালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার কারণে তাকে চাকুরী থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রাপ্তি সাপেক্ষে তাকে ২০১৫ সালে চাকুরীচ্যুত করে।

প্রতারণার জগতে প্রবেশ ও প্রতারণার কৌশল

কৌশল ১ঃ নিজ এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সে এজেন্ট নিয়োগ করে চাকরিপ্রার্থীদের সংগ্রহের কাজ শুরু করে।
কৌশল ২ সরকারী চাকুরীর প্রলোভন দেখিয়ে সে অধিক সংখ্যক চাকুরীপ্রার্থী সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালে “এমভিশন” নামে একটি কোচিং সেন্টার চালু করে।
কৌশল ৩ চাকরীপ্রার্থীদের মধ্য থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কোটা যেমন জেলা কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা, এতিম কোটা, আনসার কোটা প্রভৃতি শ্রেণিকরণ করে। উক্ত তালিকা করে প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি যাচাই-বাছাই করে।
কৌশল ৪ স্ট্যাম্পে চুক্তির মাধ্যমে টাকা অথবা জমির দলিল জমা রাখার শর্তে চাকরীপ্রার্থীদের সাথে সে চুক্তিবদ্ধ হয়।
কৌশল ৫ চুক্তিশেষে বিভিন্ন মাধ্যম যেমন-লিখিত পরীক্ষায় প্রার্থীর ছবি পরিবর্তন/প্রশ্নফাস/প্রার্থীকে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে পাশ করানো হয়।
কৌশল ৬ নাগরিক সনদপত্র পরিবর্তন, জন্মসনদ পরিবর্তন, চারিত্রিক সনদপত্র, এতিমখানার সনদপত্র, প্রতিবন্ধী সনদপত্র, চেয়ারম্যান প্রত্যয়নপত্র পরিবর্তনসহ যে সব জেলায় অধিক সংখ্যক জনবল নিয়োগে উল্লেখ থাকে জাতীয় পরিচয়পত্রে সে সকল জেলার প্রার্থীর ভুয়া নাম ঠিকানা ব্যবহার করা হতো। কোন চাকুরীপ্রার্থী চুক্তিবদ্ধকৃত টাকা দিতে না পারলে জমাকৃত জমির দলিলের মাধ্যমে প্রার্থীর জমি দখল করতো।
কৌশল ৭ যারা এই প্রক্রিয়ায় চাকুরী পেত তাদের’কে জিম্মি করার উদ্দেশ্যে তাদের সব ধরণের কাগজপত্র জমা রাখতো যাতে পরবর্তীতে তাদের কেউ ঝামেলা করলেই তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ভ‚য়া নাম ঠিকানা ব্যবহার করে চাকুরী পাওয়ার অভিযোগ দিতে পারে।

প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণঃ তার নামে বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক একাউন্টে ৫০ লক্ষাধিক টাকার এফডিআর রয়েছে। এছাড়া ঢাকা জেলার ধামরাই থানাধীন ফোর্ডনগর এলাকায় ৮.২৫ শতাংশ জমি রয়েছে। রাজধানীর ঢাকায় মনিপুরী এবং ৬০ ফিট এলাকায় তার তিনটি ফ্লাট রয়েছে যার আনুমানিক মূল্য ১ কোটি টাকা এবং নিজ জেলা কুষ্টিয়ায় সদর থানাধীন বড়িয়া এলাকায় জাহান সুপার মার্কেট ছাড়াও নিজ গ্রামে ২৫ বিঘা জমি এবং একটি পাকা বাড়ি রয়েছে। কুষ্টিয়ায় তার জাহান গ্রুপ নামে একটি কনজ্যুমার প্রোডাক্ট কারখানা রয়েছে। তার কুষ্টিয়া এক্সপ্রেস নামে একটি বাস ও ৪ টি ট্রাক রয়েছে।

গ্রেফতারকৃত আসামী কৃত অপকর্মের বিষয়টি স্বীকার করেছে এবং এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন।