গ্রাহক-মার্চেন্টদের টাকা আত্মসাৎই ছিল ধামাকার মূল উদ্দেশ্য: র‌্যাব

9

মোঃ দীন ইসলামঃ

র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ধামাকা শপিং ডটকম- এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘হোল্ড মানি প্রসেস প্ল্যান’ অর্থ্যাৎ গ্রাহক ও সরবরাহকারীর টাকা আটকে রেখে তা সরিয়ে ফেলা। এজন্য তারা বিশাল অফার, ছাড়ের ছড়াছড়িসহ নানাভাবে সাধারণ ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করত। এভাবে দ্রুতই প্রতিষ্ঠানটির ক্রেতা বৃদ্ধি পায়।

র‌্যাব জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছেন আর্থিক সংকটের কারণে গত কয়েক মাস ধরে প্রতিষ্ঠানের অফিস ও ডিপো ভাড়া বকেয়া রয়েছে। পাশাপাশি জুন ২০২১ থেকে কর্মচারীদের বেতন বকেয়া রয়েছে। চলতি বছরের গত এপ্রিল থেকে ধামাকা শপিং ডটকম অর্থ অন্যত্র সরিয়ে ফেলার কারণে জুলাই হতে সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।


এর আগে বুধবার ভোরে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-২ এর অভিযানে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে ধামাকার সিরাজুল ইসলাম রানা, ইমতিয়াজ হাসান সবুজ ও ইব্রাহিম স্বপন গ্রেপ্তার হয়। একজন ভুক্তভোগীর মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

ধামাকা শপিং ডটকম- এর ব্যবসায়িক অবকাঠামো সম্পর্কে র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার মঈন সাংবাদিকদের বলেন, মহাখালীতে তাদের প্রধান কার্যালয় এবং তেজগাঁও বটতলা মোড়ে একটি ডেলিভারি হাব রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৬০০টি ব্যবসায়িক চেইন রয়েছে। এরমধ্যে নামিদামি প্রতিষ্ঠানের নামও উঠে এসেছে।

ধামাকা শপিং ডট কম ছাড়াও তাদের আরও কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেমন, ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেড, মাইক্রোট্রেড ফুড এবং বেভারেজ লিমিটেড এবং মাইক্রোট্রেড আইসিক্স লিমিটেড ইত্যাদি। মূলত প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য তৈরিকারক ও গ্রাহক চেইন বা নেটওয়ার্ক থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।

কমান্ডার মঈন সাংবাদিকদের বলেন, ধামাকা শপিং ডট কম গ্রাহক সংখ্যা ৩ লক্ষাধিক। মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ, মোটরবাইক, গৃহস্থলীপণ্য ও ফার্নিচারসহ বিভিন্ন অফারে বিক্রি করা হতো। ধামাকা শপিং ডট কম -এর বিভিন্ন লোভনীয় অফারগুলো হলো, সিগনেচার কার্ড ২০ থেকে ৩০ শতাংশ, ধামাকা নাইট এ ৫০শতাংশ পর্যন্ত, রেগুলার এ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ছাড়। সিগনেচার কার্ড অফারটি গত মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালনা করা হয়। মাত্র ২০ শতাংশ পণ্য সরবরাহ করে অর্থ সরিয়ে গ্রাহকদের চেক প্রদান করা হয়। অতঃপর ধীরে ধীরে সকল অর্থ সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‍্যাব জানায়, ধামাকা শপিং ডট কম ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ইনভেনটরি জিরো মডেল এবং হোল্ড মানি প্রসেস প্লান ফলো করত। কয়েকটি দেশি-বিদেশী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় অফারের আলোকে ধামাকা শপিং ডট কম ব্যবসায়িক স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ইনভেস্টমেন্ট ছিল না।

এতো দিন ধরে ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসার বিষয়ে খন্দকার আল মঈন বলেন, গত অক্টোবর থেকে তারা এগ্রেসিভ বিজনেসে যায়। ধামাকা খুব অল্প সময়েই মোটা অঙ্কের অর্থ সরিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ১৪টি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে। সিআইডির তদন্তে অস্বচ্ছতার বিষয়টি উঠে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পাবার পর থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করছে। যাদের বিরুদ্ধেই মামলা হচ্ছে, তারা যেই হোক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

ধামাকার অ্যাকাউন্টে তিন লাখ গ্রাহকের গ্রাহকের ৭৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। অথচ এখন ধামাকার অ্যাকাউন্টে মাত্র লাখ খানেক টাকা। বাকি টাকা কোথায় গেলো জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন সাংবাদিকদের বলেন, ধামাকার ট্রেড লাইসেন্স নেই। সাধারণ গ্রাহকরা যে টাকা দিয়েছে তা গেছে ইনভেরিয়েন্ট টেলিকমের অ্যাকাউন্টে। ধামাকার আরও অনেক ব্যবসা রয়েছে। সেসব ব্যবসায় সেই টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। টাকা আসলে কোথায় গেলো তা মানি লন্ডারিং পর্যায়ে পড়েছে কিনা তা খুব শিগগিরই বেরিয়ে আসবে। মূলহোতা জসিম উদ্দিন চিশতির নিজস্ব সম্পদ রয়েছে আড়াই শ কোটি টাকার উপরে। সেখানেও ধামাকার গ্রাহকদের টাকা যেতে পারে।

ধামাকার প্রতারণার মূলহোতা জসিম উদ্দিন চিশতি কোথায় জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তিনি পলাতক। আমরা জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারদের মাধ্যমে জেনেছি তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। তাকেসহ অন্যান্য আসামিদের খুঁজছি।

আরেক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার মঈন সাংবাদিকদের বলেন, হাজারের উপরে তাদের কর্মচারী রয়েছে। তারা কেউই গত জুন থেকে বেতন পাচ্ছেন না। ধামাকায় আসলে চাকরি করার সুযোগ নেই। তাদের ট্রেড লাইসেন্স নেই। গ্রেপ্তাররা ধামাকা শপিং ডট কমের ব্যবসায়িক কারসাজি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবগত থেকে বিভিন্ন প্রতারণামূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থেকেছেন। এছাড়া তারা বিভিন্ন অপকৌশল প্রণয়নে প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ, সুপারিশসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা প্রদান করছিল। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

নিউজটি শেয়ার করুন...
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •