
মুসলিম ও ব্রিটিশ শাসন আমলের ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে ভগ্নপ্রায় দাঁড়িয়ে আছে মোঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী দিনাজপুরের ‘ঘোড়াঘাট দুর্গ ’।বর্তমানে ঘোড়াঘাট একটি ছোট্ট উপজেলা হলেও, প্রাচীন
বাঙলার মোঘল সাম্রাজ্যের এবং পরবর্তীতে ইংরেজ শাসন আমলের নানা ইতিহাস রচিত হয়েছে এই ঘোড়াঘাটে।তবে কালের বিবর্তনে এবং রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে হারিয়ে গেছে প্রবাদ বাক্যের ৫০ বাজার ও ৫৩ গলির ঘোড়াঘাট শহর। সেই ইতিহাসের স্বাক্ষ্য বহন করতে জরাজীর্ণ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়াঘাট দুর্গ। এই নিদর্শন আজ অস্তিত্ব সংকটে। ইতিহাস সমৃদ্ধ শহরের শত শত একর জমি দখল হয়ে গেছে।ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৫ শতকে স্বাধীন সুলতানি আমলে ঘোড়াঘাট একটি সীমান্ত ফাঁড়ি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও মোঘল সরকার ব্যবস্থানয় এটি বাঙলার অন্যতম প্রশাসনিক বিভাগ ছিল। যা নবাবী আমলেও নিজের মর্যাদা টিকিয়ে রেখেছিল। মোঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ১৫৮২ সালে প্রশাসনিক সুবিধার্থে সমগ্র সুবা-ই বাঙলাকে ১৯টি সরকারে বিভক্ত করা হয়। যার মধ্যে অন্যতম একটি ছিল ‘সরকার ঘোড়াঘাট’। সেই আমলে
ঘোড়াঘাটের করতোয়া নদীর তীরে গড়ে উঠে ‘ঘোড়াঘাট দুর্গ’। বিভিন্ন সময় এই দুর্গ বিভিন্ন রাজার অধিনে ছিল। রাজারা প্রয়োজন মত যুদ্ধ কাজে ব্যবহারিত বিভিন্ন জিনিসপত্র রাখতো এই দুর্গে। ইতিহাসের বিভিন্ন বই থেকে জানা যায় সাম্রাজ্যের আকবরের সময়ে এই দুর্গে ৯০০ অশরোগী বাহিনী ছিল।তাদের সাথে ছিল অর্ধশতাধিকের অধিক হাতি এবং ৩২ হাজার ৬০০ জনের মত পদাতিক বাহিনী। মুসলিম শাসিত ঘোড়াঘাট সরকারের শেষ ফৌজদার ছিলেন মীর করম আলী খান।তার শাসন আমলে ১৭৬৫ সালে ইংরেজ সেনাপতি মি. কোট্রিলের নেতৃত্বে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছে ঘোড়াঘাট সরকারের পরাজয় ঘটে।তখন ইংরেজরা সমগ্র উত্তরবঙ্গ নিয়ে ‘ঘোড়াঘাট জেলা’ গঠন করে। মি. কোট্রিল
ঘোড়াঘাট জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক ছিলেন।ঘুরে দেখা যায়, দিনাজপুর-গোন্দিগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের ধারে সাহেবগঞ্জ মৌজায় দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়াঘাট দুর্গের একটি মসজিদের অংশ বিশেষ। দুর্গের দক্ষিণ-পূর্বকোণে এই মসজিদের অবস্থান। যা বর্তমানে লতাপাতা ও জঙ্গলে ঢেকে আছে। চারকোণা মসজিদটির তিন কোণায় তিনটি গম্বুজ ছিল। যা বর্তমানে ভগ্নপ্রায়। দুর্গের চারপাশে উচু লালমাটির টিবি বা পরিখা ছিল। যা বর্তমানে কেটে বসতবাড়ি গড়ে তুলেছে শত শত পরিবার। স্থানীয়রা ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগে জরাজীর্ণ মসজিদটি চারপাশে দেয়াল তুলে সীমানা প্রাচীর তৈরি করেছে। মসজিদের পূর্বপাশে ঈদগাঁ মাঠ তৈরি করেছেন গ্রামবাসী। ইংরেজ শাসন আমলেও কোম্পানী সৈনদের মাঝে অসংখ্য যুদ্ধ হয়েছে ঘোড়াঘাটে। ১৭৮৭ সালে ঘোড়াঘাট জেলার
বিলুপ্তি ঘটে। ঘোড়াঘাট থেকে জেলার প্রশাসনিক সকল কার্যক্রম চলে যায় বর্তমান জেলা দিনাজপুরে। পরবর্তীতে স্বানীয়রাও ঘোড়াঘাট ত্যাগ করে চলে যায় দিনাজপুরে। এরপর থেকে দিনে দিনে হারিয়ে গেছে ঘোড়াঘাট দুর্গের স্বাপনা এবং মুছে যেতে বসেছে ইতিহাস।সম্প্রতি এই প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ স্হাপনা পরিদর্শন
করেছেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) শাকিল আহমেদ এবং পুলিশ সুপার (এসপি) শাহ ইফতেখার আহমেদ সহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ। পরিদর্শন শেষে উক্ত স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষনে সব ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন ডিসি।
দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক শাকিল আহমেদ বলেন, ঘোড়াঘাট দুর্গ এবং এরসাথে সংশ্লিষ্ট সকল প্রাচীন স্থাপনা সম্পর্কে রিপোর্ট দাখিল করতে ইউএনও‘কে নির্দেশনা দিয়েছি। ইতিহাসসমৃদ্ধ এসব স্থাপনা রক্ষায় আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।