
দীর্ঘদিন অবৈধ কষ্টিপাথরের মূর্তি ও বিভিন্ন ধাতব মুদ্রার ব্যবসায় সহযোগিতা করার দরুণ খোকন হাজীর সাথে মোস্তফাহাওলাদারের সাথে সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। ২০১৭ সালে ভারতীয় নাগরিক মিলন চক্রবর্তী খোকন হাজীকে বিশেষ কষ্টিপাথরের মূর্তি ও পিতলের ধাতব মুদ্রা ক্রয়ের প্রস্তাব দেন। যার বিনিময় মূল্য ৪০০ কোটি টাকা। খোকন হাজীর বিশ্বস্ত মোস্তফাহাওলাদার দুষ্প্রাপ্য মূর্তি ও ধাতব মুদ্রা প্রদানের কথা বলে ঝালকাঠিতে নকল মূর্তি ও একটি প্লাস্টিকের বাক্সে নকল ধাতব মুদ্রা প্রদান করে খোকন হাজীর কাছ থেকে ৯৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। নকল মূর্তি ও নকল মুদ্রা পেয়ে খোকন হাজী অত্যন্ত ক্ষিপ্র হয়ে যান। মোস্তফা হাওলাদারকে পাগলের মতো ঝালকাঠির বিভিন্ন রাস্তায় রাস্তায় খুঁজতে থাকেন। কিন্তু নিরুদ্দেশ মোস্তফা হাওলাদারের কোন সন্ধান সে পায় না। উল্লেখ্য মোস্তফা হাওলাদার ভিকটিম আনোয়ারের ভায়রা-ভাই।
৯৫ লাখ টাকা আদায় করতেই ভিকটিম হোসেন খান (৪৪) নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানাধীন তুষারধারা এলাকা থেকে অপহরণ করে অপহরণ চক্র। অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়কারী চক্রের মূলহোতা খোকন হাজী(৬৫)সহ মোট সাত জনকে গ্রেফতারসহ ভিকটিম উদ্ধার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৩)।
বৃহস্পতিবার (২ মে) রাতে অভিযান ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার হলো,মুক্তিপণ আদায়কারী চক্রের মূলহোতা হাজী ওয়াজী উল্লাহ্ খোকন (৬৫),মো.আরিফ হোসেন (৫৫),সাইফ উদ্দিন আহমেদ মিলন (৬২),সিরাতুল মোস্তাকিম (৫৮),মো.রুহুল আমিন (৬০),মো. জাকির হোসেন (৩০), ও মো. স্বাধীন (৫২)। অপহৃত ভিকটিমকে আসামিদের হেফাজত হতে উদ্ধার করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে রিভলবার,৮ রাউন্ড রিভলবারের গুলি ও শটগান জব্দ করা হয়।
শুক্রবার (৩ মে) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে.কর্নেল মো.ফিরোজ কবীর এসব তথ্য জানান।
লে.কর্নেল মো.ফিরোজ কবীর বলেন,গত ১ মে রাত ৮ টার দিকে ঘটিকায় ফতুল্লা থানাধীন তুষারধারা এলাকায় একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে খোকন হাজীর নেতৃত্বে ৮-৯ জনের একটি অপহরণকারী চক্র ভিকটিম আনোয়ারকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে জিম্মি করে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। কেরানীগঞ্জ থানাধীন চুনকুটিয়া এলাকায় খোকন হাজীর মালিকানাধীন ‘‘চুনকুটিয়া রিয়েল এস্টেট লিমিটেড’’অফিসের ভিতরে আটকে রাখে। পরবর্তীতে অপহরণকারীরা ভিকটিমের উপর লোহার রড,পাইপ ও লাঠি দিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালায়। পরে মোবাইলে তার পরিবারের কাছে মুক্তিপণ বাবদ ৯৫ লাখ টাকা দাবি করে। ভিকটিমের ছোটভাই তার ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা জোগাড় করে অপহরণকারী চক্রের দেওয়া একটি ব্যাংক হিসাব নাম্বারে প্রেরণ করে। ওই টাকা প্রদানের পরও অপহরণকারীরা ভিকটিমের ওপর নির্যাতন অব্যাহত রাখে এবং তার পরিবারকে বাকি টাকা প্রদানের জন্য হুমকি প্রদান করতে থাকে। বাকি টাকা প্রদান না করলে তাকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিবে বলে হুমকি দেয়। এপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে র্যাব-৩ এর গোয়েন্দা দল দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকায় ওই অপহরণকারী চক্র ও ভিকটিমের অবস্থান সনাক্ত করে। ভিকটিমকে উদ্ধার এবং অপহরণকারী চক্রকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের অফিসের ভেতরে অভিযান চালিয়ে অপহরণকারী চক্রের ৭ জনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়।
আসামিদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক জানান,আসামি খোকন হাজী ২০১৫ সাল থেকে দেশের মূল্যবান কষ্টিপাথরের মূর্তি ও দুষ্প্রাপ্য পিতলের ধাতব মুদ্রা ভারতে পাচার করে আসছিল। তার এ দুষ্কর্মে সহযোগী ছিল ভারতীয় নাগরিক জনৈক মিলন চক্রবর্তী। যিনি নিজেকে একটি বিখ্যাত ভারতীয় কোম্পানীর এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দিতো। কষ্টিপাথরের মূর্তি ও দুষ্প্রাপ্য পিতলের ধাতব মুদ্রার মূল ক্রেতা ছিল মিলন চক্রবর্তী। গ্রেফতার খোকন হাজী ২০১৫ হতে ২০১৭ সালের মধ্যে কষ্টিপাথরের মূর্তি ও ধাতব মুদ্রার ৭টি চালান ভারতে পাচার করেছিল। খোকন হাজীর কষ্টিপাথরের মূর্তি ও ধাতবমুদ্রা সংগ্রহের কাজে জনৈক নাঈম (৩৫),মোস্তফা হাওলাদার(৫০) ও রবি বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দেশব্যাপী কাজ করতো। বিনিময়ে এদরেকে মাসিক ৩০ হাজার টাকা করে বেতন দিতো।
তিনি আরও জানান,গত ১ মে মোস্তফাহাওলাদার ও নাঈমের একজন সহযোগী মোবাইল ফোনে খোকন হাজীকে বলেন,মোস্তফাহাওলাদারের ভায়রা-ভাই ভিকটিম আনোয়ার ফতুল্লা থানাধীন তুষারধারা এলাকায় একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করে এবং তাকে ধরতে পারলে মোস্তফাহাওলাদারের সন্ধান পাওয়া যাবে। এপ্রেক্ষিতে গ্রেফতার খোকন হাজী তার অপরাপর সহযোগী আরিফ হোসেন,মিলন,মোস্তাকিম,রুহুল,জাকির এবং স্বাধীনকে নিয়ে ভিকটিম আনোয়ারকে অপহরণের পরিকল্পনা করে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রেফতার খোকন হাজীর নেতৃত্বে অন্যান্য আসামিরা একটি সাদা মাইক্রো বাসে করে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ভিকটিমকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকায় নিয়ে এসে মুক্তিপণ দাবি করে।
র্যাব-৩ এর সিও আরও জানান, খোকন হাজী একজন ঠিকাদার ও মতিঝিল এলাকায় তার একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। গ্রেফতার খোকন হাজী ১৯৭৫ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে। তার ২ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। ঠিকাদারী ব্যবসার আড়ালে খোকন হাজী দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ কষ্টিপাথরের মূর্তি ও দুষ্প্রাপ্য ধাতব মুদ্রার কারবার করে আসছিল। এই অপহরণের ঘটনার সাথে জড়িত তার অপরাপর সহযোগীরা সকলেই তার অবৈধ কষ্টিপাথর ও ধাতব মুদ্রার কারবারের অন্যতম সহযোগী। ভিকটিমকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানান র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে.কর্নেল মো.ফিরোজ কবীর।
ডিআই/এসকে