

নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি: দেড় যুগের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার উৎসবে মেতেছে সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ সময় পর এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসা কেবল একটি নির্বাচন নয়, বরং জনমতের প্রতিফলনের এক নতুন অধ্যায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই দীর্ঘ সময়ে একটি পুরো প্রজন্ম প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে, যারা আগে কখনো ব্যালটে সিল মারার অভিজ্ঞতা পায়নি। তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এই ফিরে আসাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে।
দীর্ঘ বিরতির পর আজ ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনে সরাসরি অংশ করছেন। এ নির্বাচনে নতুন ভোটারদেরও অংশগ্রহণ বেড়েছে। যারা গত দুই দশকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, তাদের জন্যও এটি জীবনের প্রথম ব্যালট অভিজ্ঞতা।
আধুরিয়া স্কুলে ভোট দিতে এসেছেন সুমন মিয়া।
তিনি বলেন, আমি এক্সাইটেড, জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। ভালো একটা অভিজ্ঞতা হলো, পরিবেশটা ভালো, আগামীতেও এই রকম পরিবেশ থাকুক, এমনটাই প্রত্যাশা করি।
৭০ বছর বয়সী সুজিত রায় ধীরে ধীরে ঢুকলেন গোলাকান্দাইল স্কুল প্রাঙ্গণে। এক আত্মীয়ের কাঁধে হাত রেখে এগিয়ে এলেন।
ভিড় বাড়ার আগেই এসে পৌঁছেছিলেন– উদ্দেশ্য একটাই, ভোট দেবেন।
রিতা বলেন, সর্বশেষ ভোট দিয়েছি ২০০৮ সালে। এরপর যখনই কেন্দ্রে এসেছি, শুনেছি আমার ভোট নাকি হয়ে গেছে। আজ নিজের হাতে ভোট দিতে পেরেছি, খুব ভালো লাগছে।
এলাকার বেশ কয়েকটি কেন্দ্রের একটি এটি। সকাল থেকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের কথা জানান কর্মকর্তারা।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকেই স্কুলের সামনে দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন প্রায় ৫০০ ভোটার। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়তে থাকে।
কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পরিদর্শক মো. হারুন আল রশিদ বলেন, সময়মতো ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে এবং গেট খোলার পরপরই ভোটাররা আসতে শুরু করেন। এখন পর্যন্ত কোনো নিরাপত্তা সমস্যা হয়নি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
প্রিজাইডিং অফিসার আলামিন মিয়া বলেন, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। দিন শেষে ভোটার উপস্থিতি ৬০ শতাংশ ছাড়াবে বলে আশা করছি।
পরিবেশটা উৎসবমুখর মনে হচ্ছে। মানুষ আগ্রহ নিয়ে আসছেন। নির্বাচন কমিশন এবার ভালো পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছেন বলে তিনি জানান,
সকাল থেকে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রের আশপাশে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
একাধিক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশই এবারের পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট। অনেক তরুণ জানান, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ তাদের আস্থা বাড়িয়েছে।
তরুণ ভোটার শাহজাদা বলেন, ভোট দেওয়া আমাদের অধিকার, আবার দায়িত্বও। আগের মতো পরিবেশ থাকলে হয়ত অনেকেই আসত না।
২৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ শামীমও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। ২০২২ সালে ভোটার হলেও ২০২৪ সালে ভোট দিতে পারেননি। তিনি বলেন, আজ প্রথমবার ভোট দিতে পারলাম। ভালো লাগছে।
এসময় আয়মান নামে এক ভোটার বলেন, গতবার ভোটের পরিবেশ ছিল না, তাই আসিনি। এবার পরিবেশ ভালো লেগেছে, তাই ভোট দিলাম। পরিবর্তনের বার্তা যেন বাস্তব কাজেও দেখা যায়।
জেনিয়া বলেন, এটাই আমার প্রথম ভোট। আমি খুবই এক্সাইটেড, সুন্দর পরিবেশে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছি।
নিজের হাতে একটি ব্যালট বাক্সে ফেলে আসার অভিজ্ঞতাই দিনটিকে স্মরণীয় করে তুলেছে ভোটারদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যালট পেপারে ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের একটি চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের দীর্ঘ সারি এবং স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে কতটা আগ্রহী। ভোট কেবল একটি নাগরিক দায়িত্ব নয়, এটি পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে এই নির্বাচনী আমেজ দেশের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ১৮ বছরের এই ব্যবধান ঘুচিয়ে মানুষ এখন চায় একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ আগামী।উল্লেখ্য রূপগঞ্জে মোট ভোটার রয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৮২৯ টি।