

আল আমীন , নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি: ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর। দীর্ঘ দুই দিন দুই রাতের রণাঙ্গনের ভয়াল ইতিহাস পার করে এদিন শেরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদ নালিতাবাড়ী পাকহানাদার বাহিনীর কবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। জীবন বাজি রেখে সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে বীর মুক্তিযোদ্ধারা দখলদার বাহিনীকে পরাস্ত করে মুক্ত করেন নালিতাবাড়ী উপজেলাকে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও সেই রক্তঝরা দিনের স্মৃতি আজো গর্বের সাথে লালন করে এখানকার মানুষ।
মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, যুদ্ধ চলাকালে রামচন্দ্রকুড়া ফরেস্ট অফিস, বর্তমান উপজেলা পরিষদ এলাকা, হাতিপাড়া বিজিবি ক্যাম্প, ঝিনাইগাতীর তিনআনী ও আহাম্মদনগরসহ কয়েকটি স্থানে শক্তিশালী ক্যাম্প গড়ে তোলে পাক হানাদার বাহিনী। সেখান থেকেই তারা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালাত এবং বিভিন্ন স্থানে নির্মম হত্যাযজ্ঞ ঘটাত।
২৫ মে ১৯৭১—ভোরে নাকুগাঁও-ঢালু সীমান্তে অতর্কিত হামলা চালিয়ে পাক সেনারা ৯ জন ভারতীয় বিএসএফ সদস্যসহ কয়েকশ নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করে ভোগাই নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
৩০ জুন ১৯৭১—রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের তন্তর গ্রামে হত্যা করা হয় ৭ জন গ্রামবাসীকে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার অভিযোগে আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে গুলি করে হত্যা করে হানাদার বাহিনী।
একইদিন নন্নী–বারমারী সড়কে মাইন বিস্ফোরণে ১ জন ক্যাপ্টেনসহ ৬ সেনা নিহত হলে আতঙ্কে হানাদার বাহিনী কৌশল পরিবর্তন করে।
২৫ জুলাই ১৯৭১—কাকরকান্দি ইউনিয়নের সোহাগপুর গ্রামে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ১৮৭ জন নিরীহ পুরুষকে হত্যা করে পাক সেনারা। অসংখ্য নারী-পুরুষকে হত্যা করে গ্রামটিকে পরিণত করে ‘সোহাগপুর বিধবা পল্লী’তে।
১ ডিসেম্বর ১৯৭১—উপজেলা ঘাঁটি মুক্ত করতে গিয়ে জীবন দেন দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা হাছেন আলী মুন্সি ও আয়াত আলী। তাদের লাশ নিয়ে রাজাকার-আলবদররা পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠে।
৪ থেকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১—মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর তীব্র আক্রমণে দুর্বল হতে থাকে পাক বাহিনী। গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে মুক্তিযোদ্ধারা সাময়িকভাবে আক্রমণ শিথিল করে। ৬ ডিসেম্বর রাতেই ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যায় রাজাকার-আলবদর ও পাক সেনারা।
৭ ডিসেম্বর ১৯৭১—পূর্ব আকাশে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে “জয় বাংলা” স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে নালিতাবাড়ীর আকাশে ।মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ের পতাকা হাতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রবেশ করলে এলাকাবাসীর দীর্ঘ শঙ্কা কাটে। শুরু হয় উল্লাস, আনন্দ, মুক্তির উৎসব। পতন ঘটে হানাদার বাহিনীর। শত্রুমুক্ত হয় নালিতাবাড়ী।