ঢাকা, সোমবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

হাসপাতালে চেম্বারে চিকিৎসকের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত

রাজধানীর উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বিরুদ্ধে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ওই কর্মকর্তা সাথে এক নারী অন্তরঙ্গ শোয়া এক ঘন্টা ভিডিও এসেছে প্রতিবেদকের কাছে। যেখানে সিসিটিভি ফুটেজ ওই কর্মকর্তা নিজ অফিস কক্ষে নারীর সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ধরা পড়ে। অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তা নাম ডাঃ দেবাশীষ ঘোষ। তিনি উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্টার বর্তমানে একই ডিপার্টমেন্টের মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিষয়টি স্বীকার করে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিডিঃ জেনাঃ (অব) ডাঃ মিজানুর রহমান প্রতিবেদক কে জানান, এ বিষয় তদন্ত চলমান, অভিযোগটি ইসি কমিটিতে উঠলেই কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

চলতি বছরে দেবাশীষের বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ, রোগীদের কাছ থেকে অধিক মুনাফা আদায়, ভুয়া বিল ভাউচার, নারীর সংক্রান্ত নানা ধরনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরেও দায়িত্বে বহাল রয়েছে এ কর্মকর্তা।

উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত মার্চ মাসে উত্তরার বাসিন্দা মিজানুর রহমান নামে এক রোগীর কাছ থেকে টাইটেনিয়াম প্লেটের দাম দ্বিগুণের বেশি রাখে দেবাশীষ। এপ্রিল মাসে ঝন্টু কুমার দাসের কাছ থেকে হাতের অপারেশন প্লেটের দাম তিনগুণ ও ফারজানা চৌধুরীর কাছ থেকে হাড় জোড়া লাগানোর জন্য ব্যবহৃত প্লেট/পাতের অতিরিক্ত দাম নেয় এবং মে মাসে একই প্রতিষ্ঠানের সহকর্মী ফারজানা আক্তার শান্তা কাছ থেকে হাড় জোড়া লাগানোর জন্য ব্যবহৃত প্লেট/পাতের অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ গুণ দাম নেয় দেবাশীষ। এবিষয় তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএমএসআরআই। তদন্তে উঠে আসে ডাঃ দেবাশীষ ঘোষ তপু, দীর্ঘ ১১ বছর যাবৎ এপ্লায়েন্স ক্রয় বিক্রয়ের সংগে নিজেকে জড়িত রাখে। হাসপাতালে প্রতিমাসে গড়ে ১৪/১৫ টি করে ORIF (Open Reduction and Internal Fixation) অপারেশন করা হলে সেক্ষেত্রে প্রতিমাসে কমবেশী ১৫×১৫=২ লাখ ২৫ হাজার টাকা, বছরে ২৪ লাখ টাকা থেকে ৩০ লাখ টাকা এবং বিগত ১১ বছরে ২ কোটি ৬৪ লাখ থেকে তিন কোটি ৩০ লাখ টাকার মতো আর্থিক লাভ হয়। (সূত্র: হাসপাতালের গত আনুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ORIF অপারেশনের পরিসংখ্যান এবং অভিযোগকারী চারজন রোগীর কাছ থেকে প্রান্ত লভ্যাংশ ১৮,৬৪০ টাকা+১৭,৪৪০টাকা+১৭,৪৪০ টাকা+১০,৬০০ টাকা= মোট চারজন রোগীর থেকে লভ্যাংশ ৬৪,১২০ টাকা)।

এছাড়া তদন্ত পর্ষদের সুপারিশ উদঘাটিত তথ্যাবলি ও মতামতের উপর ভিত্তি করে তদন্ত সুপারিশমালা প্রদান করা হয়। ডাঃ দেবাশীষ ঘোষ উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকুরীরত থেকে একই হাসপাতালে অর্থপেডিক আপ্লায়েন্সের ব্যবসা করে এবং তা থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হয়। গুরুতর শৃংখলা ভঙ্গ করে। তদন্ত পর্ষদ অর্থপেডিক এপ্লায়েন্সের এর বিক্রয়মূল্য এর ক্রয়মূল্যের চেয়ে তিনগুনেরও বেশি রেখে অতিরিক্ত মুনাফা করে হাসপাতালের সুনাম ক্ষুন্ন হয়। এতে তার বিরুদ্ধে বিএমএসআরআই এর বিধি মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ প্রদান করে।

এর আগে হাসপাতালের রোগীদের কন্ট্রাক্টে অপারেশন, বিলের কপি দেখতে চাইলে রোগী বিলের কাগজ না দেয়া। রোগীদের কোড বদল করে ভুয়া বিল তৈরি করা। ডিসচার্জ এবং বিল ডাঃ তপুর নিজ হাতে লেখা ইত্যাদি তদন্ত কমিটিতে উঠে আসে। সেখানে ২টি রোগীর বিল পর্যালোচনা করে তদন্ত কমিটি এ ধরনের অনৈতিক ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমান অর্থ আত্মসাৎ করেছে তপু। BMSRI প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিগত বছরগুলোর অপারেশনকৃত রোগীর বিল পর্যালোচনা করলে আরও ব্যাপক দূর্নীতি ও জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে।

অন্যদিকে আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত চলাকালীন দেবাশীষ ঘোষ তপু আপত্তিকর ভিডিওর সন্ধান পায় কর্তৃপক্ষ। ওই ভিডিওটি তদন্তের জন্য তিনজন বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। ঘটনার বিবরণ, জবানবন্দী, ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ ও সাক্ষ্য প্রমাণে ডাঃ দেবাশীষ ঘোষ তপু বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হয়। গত ২৮/০৩/২০২৩ ইং তারিখে (পবিত্র মাহে রমযান মাসে) অর্থোপেডিক্স বিভাগে কর্মরত মেডিকেল অফিসার ডাঃ দেবাশীষ ঘোষ তার কক্ষে বিকেলে অবস্থান করছিলেন। এমতাবস্থায়, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় তার কক্ষে আনুমানিক বিকেল ৬:১০ ঘটিকায় একজন মহিলা প্রবেশ করেন। ডাঃ দেবাশীষ ঘোষ এর দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী ঐ মহিলার তার পূর্ব পরিচিত, একসাথে মেডিকেল ভর্তি কোচিং করেছিলেন এবং ঐ দিন ইফতারী করতে তার কক্ষে এসেছিলেন। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজে ঐ মহিলার সহিত অত্যন্ত আপত্তিকরভাবে ডাঃ দেবাশীষকে ঘনিষ্ঠ হতে দেখা যায়। এমতাবস্থায়, অর্থোপেডিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ বীজন কুমার সাহা আনুমানিক ৬,১২ ঘটিকায় উক্ত কক্ষের সামনে আসেন এবং দরজা নক করা মাত্রই সিসিটিভিতে দেখা যায় তারা খুব দ্রুত তাদের ঘনিষ্ঠ অবস্থান থেকে সরে যান। পরবর্তীতে ডাঃ বীজন কুমার, মেডিকেল অফিসার ডাঃ দেবাশীষ থেকে চাবি নিয়ে ঐ স্থান ত্যাগ করেন। সহকারী অধ্যাপক ডাঃ বীজনের স্থান ত্যাগ করার পর পুনরায় তাদের মধ্যে মেলামেশা শুরু হয় এবং সেটা চলমান থাকতে দেখা যায়। অতঃপর ডাঃ বীজন কুমার সাহা পুনরায় ঐ কক্ষের সামনে আসেন এবং ডাঃ দেবাশীষকে চাবি দিয়ে আনুমানিক সন্ধ্যা ৬:২৭ ঘটিকায় ঐ স্থান পুরোপুরি ত্যাগ করেন। এরপর তারা আবার ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেন এবং বেশ সময় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, এমনকি একটা পর্যায়ে দেখা যায় উল্লেখিত মহিলা তার পরিধেয় অগোছালো এলোমেলো কাপড় ঠিকঠাক করছেন। পরবর্তীতে দেখা যায় ডাঃ দেবাশীষ ঘোষ আনুমানিক সন্ধ্যা ৭:১১ ঘটিকার সময় তার কক্ষ থেকে বের হন এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে পুনরায় তার কক্ষে প্রবেশ করেন। অতঃপর উক্ত মহিলা সন্ধ্যা ৭:১৩ ঘটিকায় ডিপার্টমেন্ট থেকে পুরোপুরি বের হয়ে যান এবং মেডিকেল অফিসার ডাঃ দেবাশীষ ঘোষ তার কক্ষ গুছিয়ে ঠিক রাত ৭:৫৬ ঘটিকার সময় অর্থোপেডিক্স ডিপার্টমেন্ট ত্যাগ করেন।

এছাড়া মেডিকেল অফিসার ডাঃ দেবাশীষ ঘোষের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে মাহফুজা আক্তার নামে একজন মহিলা রুগী তার বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানার শ্লীলতাহানি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। এবিষয় হাসপাতালে সাবেক পরিচালক ডাঃ খাদেমুল ইনসান একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। এছাড়া দেবাশীষের বিরুদ্ধে তার নারী সহকর্মীদের সাথে সোশ্যাল মিডিয়ায় নোংরা মেসেজ প্রদান করে অভিযোগ রয়েছে।

গত ২৫ জুন তদন্ত কমিটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করে যেখানে প্রাপ্ত সিসিটিভি ফুটেজের আলোকে এবং বিভিন্ন বক্তব্য, তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী এটাই প্রতীয়মান হয় যে, অর্থোপেডিক্স বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডাঃ দেবাশীষ ঘোষ অনৈতিক কার্যকলাপের সহিত লিপ্ত ছিল এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো জায়গায় এই ধরনের ঘটনা পুরোপুরি লজ্জাজনক, অগ্রহণযোগ্য এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হয়।

দেবাশীষের বিরুদ্ধে অভিযোগ কারি মিজানুর রহমানের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি প্রতিবেদককে জানান, দেবাশীষ ঘোষ তপুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে প্রতিকার না পেয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকারী সংরক্ষণ অধিদপ্তর কারওয়ান বাজারে অফিসে অভিযোগ করেছি। গত ২০/১১/২৩ তারিখে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষকে শুনানির জন্য ঠেকেছিল। তারা স্পষ্ট কোন উত্তর দিতে পারেনি। এছাড়া একই হাসপাতালে কর্মরত ফারজানা আক্তার শান্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আমরা একই সাথে কাজ করি, একসাথে থাকি, কিন্তু আমরাই আমাদের স্যারের কাছ থেকে প্রতারিত হয়েছি। অভিযোগ করেছিলাম কিন্তু কোন লাভ হয়নি।

যার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ সে দেবাশীষ ঘোষ তপুকে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্টার থেকে একই ডিপার্টমেন্টের মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্বে রাখা হয়েছে। তা এই হাসপাতালের বেশিরভাগ চিকিৎসক মেনে নিতে পারছেনা। কর্তৃপক্ষের কেন এমন সিদ্ধান্ত এবিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডাঃ সাব্বির আহমেদ খান কে মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেয়া হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এছাড়া ডাঃ দেবাশীষ ঘোষ তপু কে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি। অফিসে তার চেম্বারে দেখা হয়। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত চলমান আমি কোন ধরনের বক্তব্য দিতে পারবো না ‌সাম্প্রতিক সময় রুহুল আমিন নামে এক ওটি সহকারিকে নারীর মৌখিক অভিযোগে চাকরিচ্যুত করে প্রতিষ্ঠানটি। দেবাশীষের এমন কর্মকান্ড কোন শাস্তি না হওয়ায় এ বিষয়টি নিয়ে অনেকে হতাশা ও খুব প্রকাশ করেছে।

ডিআই/এসকে

শেয়ার করুনঃ

স্বত্ব © ২০২৩ সকালের খবর ২৪