

শ্রীবাস সরকার, মাধবপুর প্রতিনিধি:হবিগঞ্জের মাধবপুরে প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আফরোজ মিয়া (১৪) দুই দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মারা গেছে। শনিবার দুপুরে রাজধানীর পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে পরিবার ও স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
আফরোজ ছিল পরিবারের বড় সন্তান—বাবা-মায়ের আদরের বড় ছেলে, দাদা-দাদী ও নানা-নানির বড় নাতি, আর বন্ধুদের কাছে ফুটবল মাঠের দুরন্ত খেলোয়াড়। তার মৃত্যুর খবরে এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। স্কুলে আফরোজের স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে তার নিজের হাতে লেখা চারটি পরীক্ষার খাতা; পরিবারের ঘরে পড়ে আছে স্কুলব্যাগ, বই-খাতা, জামাকাপড় আর কিছু স্থিরচিত্র – যা বারবার মনে করিয়ে দেবে, সে ছিল, কিন্তু আর কখনও ফিরবে না।
পরিবার সূত্র জানায়, ঘটনার সময় আফরোজের বাবা জেলার বাইরে ছিলেন। ছেলের মৃত্যুর পর থেকে লাশবাহী গাড়িটিই যেন হয়ে উঠেছে প্রতীক্ষার মঞ্চ—বাবার শেষ দেখাটুকুর অপেক্ষায় সেখানে নিথর হয়ে পড়ে আছে কিশোরের মরদেহ। এলাকাবাসীর ভাষায়, বাবার চোখে শেষ বিদায় দেখার আগেই ছেলেটা চিরবিদায়ের সড়কে।
আজ বাদ আসর আফরোজের জানাজা স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হবে বলে পরিবার ঘোষণা দিয়েছে। জানাজায় অংশ নিতে আশপাশের গ্রাম থেকেও লোকজনের ঢল নামবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর মধ্যে প্রশ্ন ঘুরছে একই জায়গায়—কিশোরের মৃত্যু কি শুধু একটি পারিবারিক ক্ষতি, নাকি সমাজের নীরবতার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি? অনেকেই মনে করছেন, সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে নিরব থাকা মানে কখনো কখনো অন্যায়কে জায়েজ করা। আর তার মূল্য দিতে হয় নিরপরাধদের জীবন দিয়ে।
হামলার আঘাতে নিহত আফরোজ মিয়ার মৃত্যুতে তার ফুফা মাধবপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি হাফেজ শাহআলম বুকফাটা আর্তনাদ ও ভারাক্রান্ত কণ্ঠে জানান, আমার ভাতিজা ছিল পুরো পরিবারের প্রাণ। ওকে যারা এমন নির্মমভাবে আঘাত করে প্রান কেড়ে নিল, আমরা তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
আফরোজের দাদী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার নাতিটারে তো আর আনতে পারমু না, কিন্তু বিচারডা যেন দেইখ্যা যাই। মা কিছুই বলতে পারছেন না—শোক যেন গলায় শব্দ আটকে দিয়েছে।
আফরোজের বাবা বলেন, বিদেশের মাটিতে হাজার কষ্ট সহ্য করেছি, সন্তানের মুখের হাসি দেখবো বলে… টাকা পাঠিয়েছি, ঘাম ঝরিয়েছি, রাত জেগেছি—সবই তাদের জন্যে।
কিন্তু কে জানত, যার জন্য জীবন উজাড় করলাম… তারই লাশ দেখার জন্য আমাকে বিমান ধরতে হবে! আমি আমার ছোট্ট ছেলেটার হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই ।
এদিকে পুলিশ জানায়, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এই মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবারের একমাত্র আকুতি—জীবিত অবস্থায় যেন এই ‘মাসুম’ সন্তানটির বিচারের ফয়সালা দেখে যেতে পারেন তাঁরা।