

মো: আনিছুর রহমান, বেনাপোল থেকে:বেনাপোল সীমান্তের কাছে ভারতের যে গ্রামটি রয়েছে সেটি হলো তেরোঘর। যা বাংলাদেশের গাতীপাড়া ও দৌলতপুর গ্রামের মাঝখানে ইছামতি নদীর পাশে অবস্থিত একটি প্রাক্তন ভারতীয় ছিটমহল; এটি এখন ভারতের অংশ এবং বাংলাদেশের পেটের ভেতর ভারতের একটি ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত।এটি বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এই অঞ্চলটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিছিন্ন এ ছিটমহলের বাসিন্দা পরিতোষ আর কালি হালদাররা পুরোপুরি মিশে গেছেন বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে। তাদের জীবনযাত্রাতেও বাংলাদেশি সমাজ-সংস্কৃতির প্রভাব স্পষ্ট থাকলেও সময়ের ব্যবধানে তারা এখন কাছে এদেশের নাগরিকদের কাছে থেকেও দুরে। ইচ্ছা করলেও আগের মত আর পাশাপাশি বাড়ি থাকা সত্বেও দেখা সাক্ষাত করতে পারে না। সার্বক্ষনিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এখন কঠোর নিরাপত্তার জন্য দায়িত্বে থাকেন এই এলাকায়।
তেরোঘর যেন বাংলাদেশের পেটের ভেতর একখণ্ড ভারত।কারণ এর তিনদিকেই বাংলাদেশ। একদিকে ভারতীয় নদী ইছামতি। ইছামতির ওপারে ভারতীয় ভূখণ্ড। কিন্তু সেখানে আগে খুব কম যাতায়াত করত এই ছিটমহল বাসিন্দারা। বিপদ-আপদে প্রতিবেশী বাংলাদেশিদের সাথে তাদের নিত্যদিনের কাজ এর সমাধান করত। এক সময় এই ছিটমহলের বিষে হালদার আর মদন হালদার বাংলাদেশি প্রতিবেশীদের সামাজিক আর পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সময় নিজেদের বাংলাদেশি বলেই মনে করেন। এ পাশে বাংলাদেশী প্রতিবেশীদের বাড়ি ভাল রান্না হলে ওপাশে ভারতের ছিটমহলের বাসিন্দাদের বাড়ি তরকারি পাঠাতো। আবার ওপারে ভাল রান্না হলেও এ পাশে পাঠাত। দুরত্ব দুই পাশের বাড়ি ঘরের সর্বচ্চ ৫০ গজ।
বেনাপোলসংলগ্ন গাতীপাড়া গ্রামের পাশে তেরোঘর নামের ভারতীয় ছিটমহলটি বাংলাদেশের পকেটে এমনভাবে ঢুকে গেছে, তাকে ভারতীয় ভূখণ্ড বলে আলাদা করা দুষ্কর।তেরোঘরের গৃহবধূ আরতি, লক্ষ্মী শেফালিদের সাথে কথা বলার সময় তারা বলে এক সময় আমাদের সময় কাটত বাংলাদেশের দৌলতপুর আর গাতিপাড়া গ্রামের গৃহবধুদের সাথে।
দীর্ঘদিন পাশাপাশি ঘরে বসবাসের ফলে ভিন দেশের অধিবাসীর পরিচয়টাই আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। আন্তর্জাতিক সীমারেখা আমরা বুঝি না। এখন কালের পরিক্রমায় সীমান্তে উভয় দেশের নিরাপত্তা বাহিনীদের দায়িত্ব থাকায় আমরা পাশাপাশি বসবাস করলেও আগের মত আর দেখা সাক্ষাত করতে পারি না।
গৃহবধু শেফালি বলে এক সময় আমরা গরু আর ছাগল বাংলাদেশের দৌলতপুর আর গাতীপাড়ার মাঠে চরাতাম। আর জ্বালানী ও বাংরাদেশের গাছ থেকে নিতাম। আবার তাদের গাছের আমও আমরা কুড়াতাম। আমরা বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতির আর প্রথাগত আচার অনুষ্ঠানের সাথে মিশে গিয়েছিলাম। আমাদের বাড়ি ভারত সীমান্তে হলেও ভারতের কোন আচার অনুষ্ঠানের সাথে আমাদের মিল ছিল না। এক সময় বাাংলাদেশি শিশুদের সঙ্গে খেলা করে সময় কাটত তেরোঘরের শিশুদের। অবুঝ ওই শিশুদের কাছে দু’দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিভাজন রেখার কোনোই অর্থ ছিল না।
তেরোঘর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমার পেট্রাপোল মৌজায় অবস্থিত। এ ছিটমহলে জমির পরিমাণ মাত্র ৫ একর। বাংলাদেশের পকেটে হওয়ায় দৌলতপুর আর গাতীপাড়া গ্রামের লোকজন ছিটমহলের ওপর দিয়ে যাওয়া-আসা করে। জনপদের অধিবাসীদের সবাই দরিদ্র।
সরজমিন গিয়ে তেরোঘরের অধিবাসী তারক হালদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের সুখ-দুঃখ আর সমস্যার কথা।
ছিটমহলবাসীদের পেশা কৃষিকাজ আর মাছ ধরা। তারা ভারত সরকারের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত এবং চরম অবহেলিত। তাদের ভারতের মুল ভুখন্ডে পৌছাতে লাগে অনেক সময়। নদী পার হয়ে প্রায় এক কিলোমিটার গিয়ে সেখানকার বাজার স্কুল কলেজ । তেরঘরের অধিবাসিদের এখন নদী পার হয়ে তাদের দৈনন্দিন কাজ সারতে হয়।দারিদ্র্য ছিটমহলবাসীর নিত্যসঙ্গী হতাশা আর অভাব অনটন। নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। বিছিন্ন এ জনপদে বিদ্যুৎ এর ও নেই কোন ব্যবস্থা।
অসুখ-বিসুখ হলে কষ্টের শেষ থাকে না। তেরোঘরের শিশুরা গাতীপাড়ার শিশুদের সঙ্গে খেলা করে, একসঙ্গে নদীতে সাঁতার কাটে, গান গায়। তারপরও হাতের কাছে বাংলাদেশের ওষুধ তাদের জন্য নিষিদ্ধ।এখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ভারতীয় মূল জীবনধারা আর সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের একীভূত করার কোনো উদ্যোগই নেই ভারত সরকারের।
তারক হালদার তাই আক্ষেপ করে বলেন, ‘বছরের পর বছর এখানে অনেকটা বন্দি জীবন কাটাচ্ছি। পঞ্চায়েত বা রাজনৈতিক নেতারা আমাদের কখনো খোঁজ নেন না। শুধু ভোটের সময় আমাদের কদর বাড়ে।’অতুল হালদার বলেন, ‘ইছামতি নদীই আমাদের ভাগ্যকে দ্বি-খণ্ডিত করেছে।’মদন হালদার বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটে ছাড়তে মন চায় না, নইলে এখান থেকে ভারতের মূল ভূখণ্ডে চলে যেতাম।’
তেরোঘর নাম হলো কীভাবে জানতে চাইলে বৃদ্ধা আরতি রানী জানান, ‘১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় এখানে ১৩টি পরিবার বসবাস করতো, তাই এর নাম হয় তেরোঘর।’
তবে এখন মাত্র ৭টি পরিবার বসবাস করছে এখানে। এরা সবাই হালদার গোত্রীয়। পরিতোষ হালদার, কালি হালদার, বিষে হালদার, গৌরচন্দ্র হালদার, শান্তি হালদার, মদন ও অতুল হালদারসহ তাদের স্ত্রী-সন্তান মিলে ছিটমহলের মোট অধিবাসী ৬০ জন।
দৌলতপুর গাতিপাড়া সীমান্তের নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, তেরঘরের বাসিন্দারা কালের পরিক্রমায় এখান থেকে চলে গেলেও এর কিছু বসতি রয়ে গেছে এখানে ব্যবসা করার জন্য। এদের প্রত্যেকে ভারতের মুল ভুখন্ডে বাড়ি ঘর করেছে। আর যারা রয়েছে তারা বিশেষ করে বাংলাদেশের কিছু দুর্বৃত্তর সাথে মাদক ব্যবসা করে থাকে। এরা সহজে বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যাক্তিদের চোখ ফাকি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদস সহ অন্যান্য পণ্য এ পথে প্রবেশ করে বাংলাদেশে।