ঢাকা, সোমবার, ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

পিঠার ধোঁয়ায় শীতের হাওয়া সন্ধ্যা হলেই ঝালকাঠিতে ফুটপাতে চলে পিঠা বিক্রির ধুম

 বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস, এর একটি স্বতন্ত্র অনুষঙ্গ পিঠাপুলি। তাইতো নবান্ন বা পৌষ-পার্বণ, সব উৎসবই হয় নতুন ধানের চালের পিঠাকে কেন্দ্র করে। আর শীত এলে বোঝা যায় পিঠা বাঙালির কতটা পছন্দের। হিমেল হাওয়া বয়ে যাওয়ার এ সময়টাই পিঠার। গ্রামের মানুষ প্রায় প্রতিদিনই পিঠার স্বাদ নেয়।

শীত মানেই পিঠা-পুলির স্বাদ। শীত মৌসুমে সন্ধ্যা হলেই ঝালকাঠির বিভিন্ন ফুটপাতে পিঠা বিক্রির ধুম পড়ে। বিকেল জেলার চার উপজেলার বিভিন্ন অলিগলি, পাড়া-মহল্লা ও হাটবাজারে পিঠাপুলির পসরা সাজিয়ে বসে যান দোকানিরা। শীতের মৌসুমে হরেক রকম পিঠা বানিয়ে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করছেন পিঠা বিক্রেতারা, আর পিঠার স্বাদ নিতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। শীতের মৌসুমে পিঠা ব্যবসা করেন অনেকেই। বাহারি সব পিঠাপুলি নজর কাড়ছে পিঠাপ্রেমীদের। আর সে পিঠা বিক্রির আয়ে চলছে তাদের সংসার।

শীতের সকালে মাটির চুলায় মায়ের হাতে বানানো ভাপা পিঠা, খেজুর রসের ম ম গন্ধ! পিঠা খেয়ে মুখ রঙিন করার এমন মধুর স্মৃতি কার-ই বা নেই! মাটির চুলায় না হোক যন্ত্রচালিত চুলায় সেই স্বাদের পিঠা খাওয়ার ধুম লেগেছে ব্যস্ত রাস্তার পাশে, পাড়ামহল্লায়। নগরীর মোড় আর অলিগলিতে এখন পিঠার ঘ্রাণ! এসব পিঠায় মায়ের আদর মাখা না থাকলেও আছে শহুরে ব্যবসার যত্ন। শহরের রাস্তায়, অলিগলি ও ফুটপাথে পছন্দের শীতের পিঠা খেতে পেরে খুশি পিঠাপ্রেমীরা। জেলার অধিকাংশ স্থানে বসেছে অস্থায়ী পিঠার দোকান।

অল্প পুঁজি ও কম পরিশ্রমে ভালো লাভ হওয়ায় শতাধিক নারী-পুরুষ পিঠা ব্যবসায় নেমেছেন। দোকানগুলোয় পিঠার পাশাপাশি রয়েছে হরেক রকমের ভর্তাও। প্রতিদিন বিকেল থেকে পিঠা বিক্রির ধুম পড়ে মোড়ের দোকানগুলোয়। সন্ধ্যা হলেই বেড়ে যায় ক্রেতা সমাগম, যা রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। রসুন-মরিচবাটা, ধনিয়াপাতাবাটা, শুঁটকি, কালোজিরা ভর্তাসহ নানা রকম উপকরণ মিলিয়ে বিক্রি হয় চিতই পিঠা। বিকেলে হিমেল হাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে অনেকেই তাই চিতই পিঠা খাওয়ায় লোভ যেন সামলাতে পারছেন না। চাইলে নতুন চাল, নারকেল ও খেঁজুরগুড়ের তৈরি গরম গরম ভাপা পিঠারও স্বাদ নেয়া যায়। রাস্তার পাশে দোকানগুলোতে দাঁড়িয়ে বা বসে লাইন দিয়ে পিঠা খেতে দেখা যায় অনেককেই।

শনিবার (০৩ ফেব্রুয়ারি ) সন্ধ্যায় শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামের সামনে এই দৃশ্যের দেখা মেলে। শীত মৌসুমে প্রতিটি বাড়িতে পিঠাপুলি বানানোর আয়োজন গ্রামবাংলার চিরাচরিত রীতি। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ঘরে ঘরে পিঠাপুলি তৈরির আয়োজন এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। ব্যস্ততা ও পারিপার্শ্বিক সমস্যায় নিজ হাতে পিঠাপুলি তৈরির আয়োজন কমে গেলেও পিঠা প্রীতি ও ভোজন কিন্তু থেমে নেই। পিঠাপ্রেমীরা এখন ভাসমান টং দোকানের পিঠার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। বাড়িতে পিঠা বানানোর ঝামেলা এড়াতে অনেকেই দোকান থেকে পিঠা ক্রয় করে সেই স্বাদ মেটাচ্ছেন। আর অনেকেই এ পিঠা বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, জ্বলন্ত চুলায় লাকড়ি দিয়ে চার-পাঁচটি মাটির খোলায় তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু চিতই পিঠা। চুলার অল্প আঁচে ধোঁয়া উঠছে তৈরি হচ্ছে ভাপা পিঠা। আর চুলা থেকে নামানোর পর মুহূর্তেই তা চলে যাচ্ছে অপেক্ষামাণ ক্রেতার হাতে।  চিতই পিঠার সঙ্গে সরিষা ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা, মরিচ ভর্তা ও ধনিয়াপাতা ভর্তা, গুড় ও নারিকেল দেওয়া হয়। ডিম দিয়েও বানানো হয় চিতই পিঠা। ক্রেতারা রাস্তার পাশে দোকানে বসে সেই পিঠা খাচ্ছেন। কেউ আবার দাঁড়িয়েই খাচ্ছেন। কেউবা আবার নিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের জন্য।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার, শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামের সামনে, প্রেস ক্লাবের সামনে, থানার মোড়, কলেজ মোড়, রূপনগর, আমতলা মোড়, পেট্রোল পাম্প, গরু দাম ব্রিজ, মধ্যে চাঁদকাঠি, চৌমাথা, উদ্বোধন স্কুলের সামনে, বান্ধাঘাট, মিনি পার্ক, গুরুধাম, বাস্টান্ড, ব্রাকমোর, মিনিপার্ক মোড়, সাধনার মোড়, পালবাড়ি, কুমার পট্টি, বাইপাস, মোড়, জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার পাশে, মোড়ে, পাড়া-মহল্লায় ও অলিগলি আর ফুটপাতে গড়ে উঠেছে কয়েকশ মৌসুমি পিঠার দোকান।

পিঠা ব্যবসায়ীরা বলছেন গত কয়েক দিনের তীব্র শীতে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতারা ভিড় জমাচ্ছেন অলিগলিতে বসা খোলা আকাশের নিচে ভ্রাম্যমাণ পিঠার দোকানগুলোতে। মাটির চুলার পিঠা বানানোর ধুম লেগেছে ঝালকাঠি জেলার চার উপজেলার বিভিন্ন আনাচেকানাচে। সন্ধ্যায় একটু ঠাণ্ডা বাতাসে পিঠার সাথে জ্বলন্ত লাকড়ির ওমও পাচ্ছেন ক্রেতারা। খুব বেশি পুঁজি লাগে না বলে সহজে এ ব্যবসা শুরু করা যায়। জ্বালানি হিসেবে খড়ি, অকেজো কাঠের টুকরা, কিংবা গাছের শুকনা ডাল ব্যবহার করছেন তারা। তবে কেউ কেউ আবার পিঠা তৈরি করতে গ্যাসের সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। কিছু গুড়, আটা, নারকেল নিয়ে এ ব্যবসা খুলে বসা যায়।

রাজাপুর বাইপাস মোড় এলাকার পিঠা ব্যবসায়ী পয়তাল্লিশ বছর বয়সী আব্দুস ছালাম নামে একজন বিক্রেতা বলেন, এই বাজারে দীর্ঘ ৩-৪ বছর ধরে শীত মৌসুমে ভাপা পিঠা, সিদ্ধ ডিম বিক্রি করছি। নতুন চাল, নারকেল ও খেঁজুরের তৈরি গুড় দিয়ে ভাপা পিঠা তৈরি করছি। প্রতিদিন একসাথে ১৫-২২ পিস ভাপা পিঠা ৭-১০মিনিট ভাপ দিয়ে তৈরি করি। প্রতিদিন ৮-১০ কেজি চালের ভাপা পিঠা বিক্রি করি। প্রতিদিন ১হাজার থেকে ২হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এই টাকা দিয়ে সংসার চলে। দামে কম ও মান ভালো হওয়ায় দোকানে প্রায় ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকে।

রাজাপুর ডাকবাংলো মোড় এলাকায় পিঠা বিক্রেতা খালেদা বেগম বলেন, তিনি চিতই পিঠা বিক্রি করেন তার এক সন্তান তার দোকানের কাজে সহায়তা করে। তাদের দোকানে ভালোই বেচা-বিক্রি হয় এবং এই টাকাতে সংসার চলছে তাদের। তবে আগের তুলনায় এবছর সবকিছুর দাম বেশি হওয়া তেমন বেশি একটা লাভ হয় না বলে জানান।

রাজাপুর ডাকবাংলো মোড় এলাকায় পিঠা বিক্রেতা আঃ বারেক বলেন, প্রতিদিন বিকেল ৪টা বাজলে এখানে এসে বসি। তারপর ভাপা ও চিতই পিঠা বানিয়ে বিক্রি করি। এতে সব খরচ বাদে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১হাজার টাকা আয় হচ্ছে।

রাজাপুর ডাকবাংলো মোড় এলাকায় পিঠা কিনতে এসে কাইয়ুম নামের এক জন বলেন, পিঠা খাওয়া সকল মানুষের একটা বিশেষ সখ, ফুটপাতে পিঠা বিক্রেতার দোকান দেখলে মনের রুচিকে মানানো যায় না তাই পিঠা কিনতে আসলাম।

রাজাপুর বাইপাস মোড় এলাকার এক পিঠা ক্রেতা মো. হানিফ বলেন, শীতকালের পিঠা খাওয়া মানুষের একটা বিশেষ রুচি। বাড়িতে পিঠা তৈরির উপকরন মিলাতে না পারলে সখের বসত পিঠা দোকান থেকেই কিনে খাইতে পছন্দ করি। প্রতিদিন আব্দুস ছালাম ভাইর এখানে পিঠা খেতে আসি এবং পরিবারের সবার জন্য কিনে নিয়ে যাই।

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দোকানগুলোতে এখন চিতই ও ভাপা পিঠাই বেশি বিক্রি হচ্ছে। এসব দোকানে নারিকেল ও খেঁজুর গুড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভাপা পিঠা। দামও হাতের নাগালে। ভাপা পিঠা ১০  টাকা ও চিতইও বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা। এ দিকে শীতের শুরু থেকেই বাজারে ধুম পড়েছে খেঁজুরের গুড় ও পাটালি বিক্রিতেও। খেঁজুরের গুড়-পাটালি আসছে রাজশাহী, ফরিদপুর ও যশোর এলাকা থেকে। বাজারে মূলত এখন পাঁচ ধরনের পাটালি ও গুড় পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো হলো বাটি পাটালি, থালা পাটালি, পাটা পাটালি, চিনি পাটালি ও ঝোলা গুড়।

শেয়ার করুনঃ

স্বত্ব © ২০২৩ সকালের খবর ২৪