প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সাপের দংশনে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা

মোঃ খাইরুল ইসলাম মুন্না বেতাগী (বরগুনা)প্রতিনিধি:
গত ১৯ জুলাই সোমবার। সারাদিন ধরে আইনের সংস্পর্শে আসা দুই ভুক্তভোগী শিশু আলিফ এবং গালিফের জন্যে মনটা ভিষণ খারাপ যাচ্ছিলো। সারাদেশ থেকে অনেক ফোন রিসিভ করতে হয়েছে। এরমধ্যেই রাত ১১ টার দিকে আরেকটা ভিন্ন ফোন এলো। বিষাক্ত ফোন। যে বিষে এখনও জ্বলছি আমি। পাথরঘাটা উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের পরীঘাটা গ্রাম। খরস্রোতা নদ বলেশ্বর পারের এই গ্রাম থেকেই পরিচিত একজন জানালেন- সবুজ নামের ২২ বছরের এক যুবককে সাপে কেটেছে। বিষাক্ত সাপ। অবস্থা ভালো না। এম্বুলেন্স যোগে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে আসতে বললাম। কোনো এম্বুলেন্স পাওয়া গে না। সামনে পেছনে দু’জন, মাঝখানে মুমুর্ষু সবুজ। এভাবেই মোটর সাইকেলে রওনা হলো তারা।বড়ইতলা খেয়াঘাটে ফোন দিলাম। দ্রুত একটি খেয়া বড়ইতলার ওপারে রাখা হলো। আরেক বন্ধুর সাথে ফোনে কথা বলে একটি এম্বুলেন্স রেডি করলাম। যাতে বরগুনা আসার পরে যদি তার অবস্থা আরও অবনতি হয় তাহলে যেন তাকে দ্রুত বরিশালে পাঠানো সম্ভব হয়।মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ফোনে ফোনে এসব কাজ শেষ করে এবার ফোন করলাম বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. সোহরাব হোসেনের ফোনে। দু’বার ফোন দিলাম ধরলেন না। এবার ফোন করলাম জেনারেল হাসপাতালের আরএমও (আবাসিক মেডিকেল অফিসার) ডা. তাসকিয়া সিদ্দিকীর কাছে। দূর গ্রাম থেকে বড় একটি নদী পার হয়ে বরগুনায় আসা সাপে কাটা সবুজের কথা তাকে জানালাম। জানালাম রোগীর অবস্থা ভালো না।ডা. তাসকিয়া দুই মিনিট সময় নিলেন। এরপর ফোন ব্যাক করে বললেন, বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে এন্টিভেনম নেই। থাকলেও তার ডেইট আছে কি না তার জানা নেই। তাছাড়া পুশ করার মত অভিজ্ঞ ডাক্তারও নেই। তাই তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন সাপে কাটা ওই রোগীকে যেন আমি বরিশাল নিয়ে যাওয়ার জন্যে পরামর্শ দেই।আবার এক এক করে সকলকে ফোন দিলাম। খেয়াঘাটে বললাম খেয়া ওপারে যাওয়া লাগবে না। এম্বুলেন্সকে বললাম এম্বুলেন্স লাগবে না। এরপর রোগীর স্বজনদের বললাম- সরাসরি বরিশাল নিয়ে যেতে। আরও ঘন্টা দুয়েক পরে পথিমধ্যে রাত একটার দিকে সবুজের অবস্থার আরও অবনতি হলে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।পাথরঘাটা উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের পরিঘাটা গ্রামের দরিদ্র শ্রমিক মনোরঞ্জন কবিরাজের একমাত্র ছেলে সবুজ কবিরাজ। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগল প্রায় সবুজের বাবা-মা। এখন কথা হচ্ছে- সবুজের এই মৃত্যুর জন্যে আমরা কাকে দায়ী করবো? এ দায় শুধুই কি বিষাক্ত সাপের?দুঃখজনক হলেও সত্য পরে জানতে পেরেছি- বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে এন্টিভেনম আছে। দেয়ার মত চিকিৎসকও আছেন। ক’দিন আগে তালতলীর একজন সোপে কাটা দরিদ্র নারীকে এনটিভেনম দিয়েই এ হাসপাতাল থেকে সুস্থ করে তোলা হয়। তাহলে কেন আমাকে এমন তথ্য দেয়া হলো? আর এ ভুল তথ্যের কারণে অকালেই ঝরে গেল একটি তরতাজা প্রাণ। একমাত্র সন্তান হারিয়ে নিংস্ব হলো একটি পরিবার। যতদূর মনে পড়ে বছর কয়েক আগে বরগুনার ডিকেপি সড়কের একজন দরিদ্র রিক্সাচলককে এভাবেই সাপে কেটেছিলো। একইভাবে তখন বরগুনা হাসপাতালে যোগাযোগ করে কোন সাপোর্ট না পেয়ে পটুয়াখালী হাসপাতালের তত্বাবধায়কের সাথে যোগাযোগ করি। সাপেকাটা সেই দরিদ্র রিক্সাচালককে পটুয়াখালী হাসপাতালে পাঠাই।সেবারও বরগুনা থেকে এম্বুললেন্স ঠিক করা, গভীর রাতে আমতলীর ফেরিঘাটে যোগাযোগ করে ফেরি ছাড়ানো ইত্যাদি সকল কাজ করতে হয়েছিলো আমাদেরই। এসব কথাগুলো বললাম একারণে যে- প্রত্যেক সাংবাদিকই দেখবেন কোন না কোনভাবে প্রতিদিন নিরবে নিভৃতে এমন অনেক মানবিক কাজ করেই যান। সেসবের অধিকাংশই থাকে অপ্রকাশ্য। সাংবাদিকরা শুধুমাত্র পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না। তারা পেশাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়েও প্রতিনিয়ত এমন অনেক কাজ করে থাকেন। বরগুনা জেলায় তার অজস্র উদাহরণ রয়েছে।বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও এন টিভি জেলা প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ জানান অতি দ্রুত এর সমাধান করার দাবি জানিয়েছেন।উপরের কথাগুলো ছিল বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, ও এন টিভি জেলা প্রতিনিধি, এডভোকেট সোহেল হাফিজের এর কথা।