

ফরিদপুর সংবাদদাতা :সাবরেজিস্টার অফিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ বহুদিনের। পুরো দেশেই এসব অফিসে দলিল রেজিস্ট্রেশন, তল্লাশি, নকল উত্তোলনসহ যেকোনো কাজে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়—এ যেন ওপেন সিক্রেট। বছরের পর বছর অভিযোগ উঠছে ঘুষ, দালালি, হয়রানি ও অসহায় জনগণের সঙ্গে বাণিজ্যের। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হলেও দুর্নীতি দমনে তেমন কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থান ও হুশিয়ারির পরও মাঠপর্যায়ে অনিয়ম থামছে না।
তেমনই চিত্র এবার প্রকাশ্যে এসেছে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা সাব রেজিস্টার অফিসে। সেখানে কর্মরত পেশকার শেখ বিল্লালকে ঘিরে উঠে এসেছে বিস্ময়কর সব অভিযোগ। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে সর্বোচ্চ প্রবেশ বয়স ৩২ হলেও শেখ বিল্লাল চাকরিতে যোগ দেন ৪৫ বছর বয়সে। গ্রেড–১৬ এর পেশকার পদে তার সরকারি বেতন কাঠামো ৯,৩০০ থেকে ২২,৪৯০ টাকা। অথচ তার গ্রামের বাড়িতে রয়েছে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ডুপ্লেক্স বাড়ি। নামে–বেনামে রয়েছে জমিজমাও।
অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, শেখ বিল্লালের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের বিলমামুদপুর নতুনডাঙ্গি এলাকায়। স্থানীয়রা জানান, তিনি বিলমামুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ময়েজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। এরপর আর্থিক সংকটে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পরে আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি সাব রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে অফিস পিয়ন পদে চাকরি নেন। কিছুদিনের মধ্যেই পদোন্নতি পেয়ে হন পেশকার। স্থানীয়দের ভাষায়—“পেশকার মানেই আলাউদ্দিনের চেরাগ।”
শেখ বিল্লালের বিরুদ্ধে ফরিদপুর দুদক কার্যালয়ে নাহিয়ান ইমন নামে এক ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়—দলিল রেজিস্ট্রেশন, তল্লাশি, নকল উত্তোলন—যে কাজই হোক, সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত টাকা না দিলে কোনো ফাইল নড়াচড়া করে না। টাকা দিলে কাজ হয় মিনিট–ঘণ্টায়, না দিলে ঘুরতে হয় দিনের পর দিন।
আলফাডাঙ্গা সাব রেজিস্টার অফিসে গেলে গ্রাহকদের মুখেই শোনা যায় একই অভিযোগ। অনেকে বলেন, “৪% ঘুষ না দিলে জমির দলিল হয় না। সব নিয়ন্ত্রণ করেন পেশকার শেখ বিল্লাল।” দলিল লেখকরাও জানান, অফিসে কাজ করতে হলে বিল্লালের অনুমতি লাগে। কেউ তার নিয়মের বাইরে যেতে পারে না। টাকা দিলে রাতেও কাজ হয়, না দিলে ফাইল থেমে থাকে।
শেখ বিল্লালের গ্রামের বাড়িতে তৈরি করা আলিশান ভবনের নাম—‘কোহিনুর মঞ্জিল’। লোকজনের দাবি, বাড়িটি নির্মাণে খরচ হয়েছে তিন কোটি টাকারও বেশি। শুধু নিজের ছয় কাঠা জমিতে নয়, সরকারি দুই কাঠা জমি জবরদখল করেও বাড়িটি তৈরি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সাবেক আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর মোবারক খলিফার প্রভাব খাটিয়ে শেখ বিল্লাল দীর্ঘদিন ধরে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু তিনিই নন, তার পরিবারও এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। অনেকে বলেন, “বিল্লাল কাউকে মানুষই মনে করতেন না। তার দুই সন্তানও হয়ে উঠেছে বেপরোয়া।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ বিল্লাল সাংবাদিকদের বলেন, “আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আমার কোনো সম্পদ নেই। ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়ি করেছি।” তিনি দাবি করেন, একটি ব্যাংক তাকে ৮৪ লাখ টাকা লোন দিয়েছে। কিন্তু ২৫ হাজার টাকার বেতনে এত বড় লোন কীভাবে পাওয়া সম্ভব—এ প্রশ্নের উত্তর তিনি এড়িয়ে যান।
ঘুষের বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ বিল্লাল বলেন, “এটা ঘুষ না, সরকারি ফি নিচ্ছি।” সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, “নিউজ–টিউজ হলে আমার কিছু যায় আসে না। সাময়িক একটু ঝামেলা হবে, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।” অভিযোগ রয়েছে, কিছু সাংবাদিককে মাসিক মাসোহারা দিয়েও নিজের প্রভাব বজায় রেখেছেন তিনি।
জনগণের অভিযোগ, ধাপে ধাপে অনিয়ম এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষ দলিল করতে গেলে আতঙ্কে থাকে। অনেকেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কাজ করাতে রাজি হন। তাই স্থানীয়দের দাবি, শেখ বিল্লালসহ এ ধরনের দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। নইলে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।