ঢাকা, মঙ্গলবার, ৫ই মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

অটোরিক্সার চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঘটতে পারে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা

রাজধানীর পল্লবী এলাকায় অটোরিক্সা গ্যারেজ রয়েছে ৪ শতাধিক আর আর রুপনগর এলাকায় রয়েছে ২ শতাধিক। এসব গ্যারেজে অন্তত ৩০ হাজারে উপরে অটোরিক্সা রয়েছে। আর এসব অটোরিক্সাকে কেন্দ্র করে মাসে অন্তত অর্ধকোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এই চাঁদাবাজির নেতৃত্বে রয়েছে পল্লবী থানা যুবলীগের দুইটি গ্রুপ। আর চাঁদাবাজির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতেই দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে যুবলীগের দুইটি গ্রুপ। সংঘর্ষের মতন ঘটনাও ঘটেছে। ওই সংঘর্ষে পুলিশ আহত হলেও হয়নি মামলা। অটোরিক্সার চাঁদাবাজি নিয়ে ঘটতে পারে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা।

হাইকোর্ট কর্তৃক রাজধানীর সড়কে অটোরিক্সা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও যুবলীগের নেতাদের চাঁদা দিয়ে দেদার চলছে অবৈধ অটোরিক্সা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর পল্লবী ও রুগপনগর এলাকায় অটোরিক্সার টোকেন ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে যুবলীগের দুই গ্রুপ। ইতোমধ্যেই একাধিবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা। এতে এখন পর্যন্ত আহত হয়েছে পুলিশসহ দুই গ্রুপের বেশ কয়েকজন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় একজনকে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন মামলা নেয়নি পল্লবী থানা পুলিশ। ক্ষমতাসীন দুই রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মুখোমুখী অবস্থানের কারণে যেকোন সময় বড় ধরনের সংঘাতের শঙ্কা করছেন স্থানীয়রা অটোরিক্সা চালকরা।

জানা যায়, বিবাদধমান যুবলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে এক গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন যুবলীগ নেতা (অবাঙালী) মুগারী আড্ডু। আড্ডু যুবলীগের সরাসরি কোন পদপদবীতে নেই। তবে নিজেকে পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী বলে প্রতিবেদককে জানান। এছাড়াও আড্ডুর বড় ভাই অ্যাডভোকেট মো.সেলিম সাবেক পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।

ভাইয়ের জোরেই আড্ডু টোকেন ব্যবসা শুরু করেন বলে জানান স্থানীয়রা। বর্তমানে আড্ডুকে মহানগর যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতা শেল্টার দেন। অন্যদিকে অপর গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রান।

কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ এসেছে প্রতিবেদকের হাতে। এসব ফুটেজে দেখা যায়, গত ৩০ জানুয়ারি রাত ৯ টা ২১ মিনিট। হঠাৎ করে স্থানীয় যুবলীগ নেতা মুগারী আড্ডুর নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি দল পল্লবীর বাউনিয়াবাদ এলাকার বিভিন্ন অটোরিক্সার গ্যারেজে ঢোকেন।

এসময় তারা গ্যারেজ মালিকদের অটোরিক্সার জন্য টোকেন কিনতে চাপ দেন বলে জানান রিক্সাওয়ালারা। এক একটি টোকেনের দাম ধার্য করা হয় ২ হাজার টাকা। গ্যারেজ মালিকরা টোকেন কিনতে না চাইলে দেয়া হয় হুমকি-ধমকি। বলা হয়, পল্লবী রুপনগর এলাকায় অটোরিক্সা চালাতে হলে তার কাছ থেকে টোকেন কিনতে হবে। তবে তাতে সাড়া দেয়নি রিক্সা মালিকরা। এরপর গত ১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে আড্ডুর নেতৃত্বে পল্লবীর প্রধান সড়কের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তাণ্ডব চালায় আড্ডু বাহিনী। এসময় আড্ডু বাহিনীর সামনে যেসব রিক্সাওয়ালা পড়েছেন তাদেরই পিটিয়ে-কুপিয়ে আহত করা হয়। আড্ডু বাহিনীর এই তাণ্ডব চলে প্রায়

ঘণ্টাব্যাপী। এই তাণ্ডবে ৬ জন আহত হয়। ভাঙচুর করা হয় একাধিক রিক্সা। কেটে দেয়া হয় রিক্সার তার (এই তাণ্ডবের একাধিক ভিডিও প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে)। আড্ডু বাহিনীকে বাধা দিতে গিয়ে বেধম পিটুনির শিকার হন পল্লবী থানা পুলিশের উপপরিদর্শর মোবারক হোসেন। তিনি এখন ব্যাথার যন্ত্রণায় পিছানায় কাতরাচ্ছেন।

এই ঘটনার প্রতিবাদে গত ৩ জানুয়ারি পল্লবীতে অটোরিক্স চালকদের ব্যানারে কয়েকশ’ রিক্সাচালক বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন। এতে প্রায় কয়েকশ’ অটোরিক্সা চালক টোকেন বাণিজ্যের প্রতিবাদে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। রিক্সা চালকদের এই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা। এরপর গতকাল সোমবার ১১ নম্বরের মিল্লাত ক্যাম্পের সামনে পুনরায় মানববন্ধন করা হয় আড্ডুর নেতৃত্বে। এই মানববন্ধন থেকে অটোরিক্সা বন্ধের দাবি জানান আড্ডু বাহিনী। পরপর যুবলীগের দুই গ্রুপের নেতাদের সশস্ত্র শোডাউনে পুরো পল্লবী ও রুপনগর এলাকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

ঘটনার বিষয়ে জানতে মোবারক হোসেনকে ফোন দেয়া হলে তার স্ত্রী ধরেন। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, মোবারক মাথায় এবং পিঠে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। এছাড়াও মাথার আঘাত গুরুতর। ডাক্তার রেস্টে থাকতে বলেছেন। কোন মামলা করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি এখনো কিছু জানি না। এই বিষয়ে থান পুলিশ বলতে পারবে।’

জানতে চাইলে করিম হোসেন নামের এক রিক্সাগ্যারেজের মালিক প্রতিবেদককে বলেন, ‘গত ৩০ জানুয়ারি রাতে আড্ডু ও তার লোকজন গ্যারেজে আসে। এসময় আমি গ্যারেজে ছিলাম না, আমার ম্যানেজার ছিল। আড্ডু ম্যানেজারকে বলেন, একদিনের মধ্যে টোকেন কিনতে হবে। পরে আমরা তাতে রাজি না হলে আড্ডু বাহিনী আমাদের রিক্সা চালকদের ওপর হামলা চালায়। রিক্সা চালকদের পিটিয়ে-কুপিয়ে আহত করা হয়। রিক্সার ভাঙচুর করা হয় ও তার কেটে দেয়া হয়। জানতে চাইলে শিবলু নামের আহত এক রিক্সা ড্রাইভার প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদেরকে আড্ডু বাহিনীর লোকজন টোকেন কিনতে বলে- আমরা টোকেন না কেনায় তারা পিটিয়ে আহত করে। তিনি আরও বলেন, মিরপুর এগোরো নম্বর স্ট্যান্ডে ব্রাক ব্যংকের নিচে- আড্ডুর একজন লাইনম্যান রয়েছে। ওখানে কেউ রিক্সা নিয়ে গেলেই আড্ডুর লাইনম্যানকে ২০-৩০ টাকা করে দিতে হয়।’ মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘মারধরের পরে আমরা থানায় মামলার জন্য গেছিলাম। ওসি মামলা নেয় নাই, বলছে- এখন ব্যস্ত আছি। পরে দেখছি। পরে আমরা হুমকি-ধমকির বিষয়ে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে একটি অভিযোগ দেই।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পল্লবী ও মিরপুর এলাকায় ২০১৩ সালের দিকে রিক্সার টোকেন ব্যবসার শুরু করেন মুগারী আড্ডু। ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি এককভাবে এই ব্যবসা পরিচালনা করেন। তবে ২০২১ সালের ১৬ মে ব্যবসায়ী শাহিন উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের পরে। আত্মগোপনে চলে যায় মুগারী আড্ডু। ফলে বন্ধ হয়ে যায় টোকেন ব্যবসা।

জানা যায়, আড্ডু আত্মগোপনে গেলে স্থানীয় বাউনিয়াবাদের প্রায় ১১৭টি গ্যারেজের মলিকরা মিলে ‘শ্রমিক কল্যাণ’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ আলী ও সাধারণ সম্পাদক মো. আলম। আর তাদের পেছন থেকে সহায়তা করেন পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা এবং স্থানীয় ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী জহির উদ্দিন মানিক। তাদের নেতৃত্বে টোকেন বাণিজ্য বন্ধ হয়।

আর শ্রমিক কল্যাণ সমিতির নামে রিক্সাপ্রতি প্রথমে ৩০০ টাকা করে তোলা হয়। পরে ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৪০০ টাকা করে তোলা হয়। টাকা তোলার দায়িত্ব পালন করেন জুয়েল সোহাগ নামের দুই ব্যাক্তি। এরপর এই টাকা দিয়ে প্রশাসন থেকে শুরু করে সবাইকে ম্যানেজ করে এতদিন অটোরিক্সা চলছিল। যদিও শ্রমিক কল্যাণ সমিতির নেতারা ৪০০ টাকা করে তোলার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তারা বলেন, আমরা ৪০০ টাকা নয় বরং রিক্সার গ্যারেজ মালিকদের কাছ থেকে ১০০ টাতা করে তুলেছি। এই টাকা দিয়ে সবার বিপদে-আপদে সাহায্য করা হয়। তারা জানান, বর্তমানে আহত রিক্সাড্রাইভারদের চিকিৎসাও এই ফান্ড থেকে হচ্ছে।

জানা যায়, সদ্য সমাপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই পল্লবী এলাকায় টোকেন ব্যবসা শুরু করার পায়তারা করছিলেন আড্ডু ও তার দলবল। তবে রিক্সাচালকরা তাদে সাড়া না দেয়ায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে রিক্সা চালকদের টোকেন ক্রয়ে বাধ্য করার চেষ্টা করেন আড্ডু। আর আধিপত্য হারানোর ভয়ে এসময় বাঁধা দিয়ে রিক্সাচালকদের নিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মুগারী আড্ডু প্রতিবেদককে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। হাইকোর্ট কর্তৃক অটোরিক্সা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাই আমরা এই অটোরিক্সা বন্ধের দাবি জানাই। বন্ধের দাবিতে মানববন্ধ করায় যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। জুয়েল রানার লোকজন অটোরিক্সার থেকে মাসে ৪০০ থেকে ৫০০ করে চাঁদা নেয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে যুবলীগ নেতা জুয়েল রানাকে একাধিকবার ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি। এরপর ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও তিনি কোন উত্তর দেননি।

জানতে চাইলে পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) অপূর্ব হাসান প্রতিবেদককে বলেন, ‘রিক্সাওয়ালারা গরীব মানুষ। তাদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়া কোনভাবেই সমর্থন করা যায় না। কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, উপপরিদর্শক মোবারক হোসেনের কোথাও কাটে নাই। তাছাড়া তিনি নিজেও বলতে পারছেন না- কোথায়, কীভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।

শেয়ার করুনঃ

স্বত্ব © ২০২৩ সকালের খবর ২৪